ফরিদপুর ভ্রমণ

বিকেলে আমি ও হাসনাত খানপুর কুমুদিনী কোয়ার্টারে নজরুলের বাসায় গেলাম। নজরুল তখন অফিসে ছিল। খালাম্মা পাটিশাপটা পিঠা বানিয়েছেন। খালাম্মা বললেন, বাবা, তোমরা বসো, পাটিশাপটা পিঠা বানাইছি, খাও। নজরুলের ঘরে ঢুকলে বাঁ দিকের দরজার পাশে একটি বড় মটকা ছিল, ওর ওপরে প্লেটে পিঠা রাখা ছিল। আমাদের ক্ষুধা লেগেছে, আমি ও হাসনাত বারো আনাই (যা বানিয়েছেন তার) খেয়ে ফেললাম। খালাম্মা হাসিমুখে বললেন, খাও বাবা, খাও। তাঁর সেই হাসি আমি আজও দেখি। আমরা দুজন যেন ওই মুহূর্তে তাঁর সন্তান হয়ে উঠেছিলাম। তিনি হাসিমুখে বসে আমাদের খাওয়া দেখলেন। এ জন্যই তাঁরা মা। ক্ষুধার্ত থাকায় অপদার্থের মতো খেলাম কারও কথা চিন্তা না করেই।

নজরুল অফিস থেকে এলে বললাম, নজরুল, সিগারেটের পয়সা দে। যাহ্ ব্যাটা, পয়সা নেই। হে হে করে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি উপহার দিল আমাদের সে। এই রকম হাসির ক্ষমতা আল্লাহ সবাইকে দেন না! নানা রকমভাবে আলীবর্দি খার আমলের যুদ্ধ শেষে আট আনা হস্তগত করা গেল। সে–ও এক বিজয়। তারপরও নজরুলের সে কী হাসি! ১৯৮০ সালে নজরুল একদিন বলল, চল ফরিদপুর যাই। কোথায় থাকবি? আমার বোন আছে ফরিদপুরে। বগল বাজাতে বাজাতে দে ছুট। খাওয়ার সময় নজরুলের বোন সামনে বসে খাবার তুলে দেন প্লেটে। মনে হয় যেন নিজের বাসায়ই আমার বড় বোনের কাছে বসে খাচ্ছি। সকাল–বিকেল রিকশা নিয়ে বেড়াতে যাই কবি জসীমউদ্‌দীনের বাড়ি। দেখি তাঁর নক্সী–কাঁথার মাঠ। ‘এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে’, এই সেই কবিতার ডালিমগাছ। ইয়াসিকা ক্যামেরায় সেসব ছবি তুলি। নজরুল রাতে বলল, চল বন্দুক নিয়ে পদ্মার চরে যাই। কী দুঃসাহস, খুব ভোরে ভগ্নিপতির বন্দুক নিয়ে দুজনে চরের বালুতে হাবুডুবু খাই। নজরুল চরের চোরাবালিতে আটকে গিয়েছিল। শুধুই বেড়ানো হলো চরে, শিকার হয়নি কিছুই। বিকেলে চা খেয়ে আবার বের হই, ব্রিজ নদীর পাড়, অলিগলি ঘুরে বেড়াই। একদিন দুপুরে হাসনাতের টেলিগ্রাম, তাড়াতাড়ি ফিরে আয়। সেলিমের জাহাজ নোঙর ফেলেছে, তাই ভ্রমণের নাটাইয়ের সুতা গুটিয়ে ফিরে আসি।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

নজরুল বয়সে বড় হয়েও বন্ধু হয়ে উঠল। ওর ছোট ভাই বাবুল ছিল আমার ক্লাসফ্রেন্ড। সবার ছোট সিরাজ মনে হয় একটু দুষ্টু ছিল। শবে বরাতের রাতে কনডেন্সড মিল্কের ব্যবহৃত কৌটার মুখের সামনের অংশ কেটে ছোট্ট জ্বলন্ত মোমবাতি ভেতরে বসিয়ে তার দিয়ে বেঁধে হাতে করে হাঁটত শিশুরা। নজরুলের বাসার কাছ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সিরাজ আমার অগোচরে শার্টে হুক করে দিয়েছে সেই লন্ঠন! দুষ্টুর হাড্ডি! স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর গেলে সিরাজ এয়ারপোর্টে আসে আমাকে নেওয়ার জন্য। সিরাজের বাসায় উঠি। সিরাজের মেয়ে আলেয়া তখন আমার মেয়ের বয়সী। দুজনে একসঙ্গে টেবিলের নিচে গিয়ে খেলা করে। অবাক হই, শিশুদের খেলায় ভাষা কোনো বাধা নয়। মনে পড়ে ফার্স্ট ইয়ারে পড়েছিলাম আকুলকা ও মালাশার গল্প। ডিজনিল্যান্ড সন্তোষা যাওয়া, বার্ড পার্কে যাওয়া—সর্বত্র ঘোরাঘুরির গাইড হিসেবে সিরাজ পথনির্দেশ দিত। ঢাকায় ফেরার দিন সিরাজের স্ত্রীর বড় বোন নিজে ড্রাইভ করে আমাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করেন। গত ২৭ বছরে সিরাজের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। করোনাকালে ফোনে কথা হয়েছে। ‘দিনে দিনে বাড়িতেছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ’।