প্রথম পরিচয়ে বালি-প্রথম পর্ব

কনফারেন্সে লেখকছবি: লেখকের পাঠানো

একটি দেশের বিমানবন্দরের অভ্যর্থনার ধরন দেখে সে দেশের মানুষের আচরণ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের রাজধানী ডেনপাসারের প্রধান বিমানবন্দরে নামার পর সেখানকার ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের বিনয়ী আচরণ দেখে মন ভালো হয়ে গেল। আমার সরকারি পাসপোর্ট থাকায় আগে থেকে ভিসা নিতে হয়নি।

ইমিগ্রেশনে গিয়ে দেখলাম, যাত্রীরা তিনটি আলাদা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। একটি ভিসাধারী যাত্রীদের জন্য, একটি আগমনী ভিসা বা ভিসা অন অ্যারাইভাল নেওয়ার জন্য এবং অন্যটি অফিশিয়াল ও কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের জন্য। এই চমৎকার ব্যবস্থাপনার কারণে ম্যানচেস্টার থেকে প্রায় ২২ ঘণ্টার বিমানযাত্রার পরও কোনো ভোগান্তি ছাড়াই ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলাম।

দেশটির বিমানবন্দরে কাস্টমস ডিক্লারেশন জমা দিতে হয়। কিউআর কোড স্ক্যান করে ফরম পূরণ করলাম। এরপর কাস্টমসের দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে মানি এক্সচেঞ্জে গিয়ে পাউন্ড ভাঙিয়ে ইন্দোনেশীয় রুপিয়াহ হাতে পেতেই হঠাৎ মিলিয়নিয়ার হয়ে গেলাম! প্রতি পাউন্ডের বিপরীতে ২৩ হাজার ২০০ ইন্দোনেশীয় রুপিয়াহ পেলে ধনী হতে আর কতক্ষণ লাগে! তাই যাঁদের অল্প কষ্টে, অল্প দিনে মিলিয়নিয়ার হওয়ার ইচ্ছা, তাঁরা বালি ভ্রমণে আসতে পারেন।

বালির বাড়িগুলোর নিজস্ব একটি ধরন আছে। সকালে ঘোরার সময় প্রত্যক্ষ করলাম, প্রতিটি বাড়ির সামনে মেয়েরা প্রার্থনা করে ভোগ নিবেদন করছেন। আবার এক জায়গায় চোখে পড়ল, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নামযজ্ঞের মতো একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সব বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। এসব দৃশ্য জানান দেয়, বালিতে ১৯৯০-এর দশকে পর্যটনের সঙ্গে উন্নয়নের ডামাডোল হাজির হলেও এখানকার মানুষ তাঁদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরম্পরাকে পরম যত্নে আগলে রেখেছেন।

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এবার হোটেলে যাওয়ার পালা। এর জন্য ট্যাক্সি নিতে হবে। এখানে অ্যাপের মাধ্যমে ট্যাক্সি ভাড়া করা যায়, সেটি আমার জানা ছিল না। ফলে দর-কষাকষিতে অপটু হওয়ার খেসারত হিসেবে আমাকে প্রায় দুই লাখ ইন্দোনেশীয় রুপিয়াহ বেশি দিয়ে ট্যাক্সিতে হোটেলে যেতে হলো।

বালির রাজধানী ডেনপাসারের রাস্তাঘাট যথেষ্ট প্রশস্ত ও পরিপাটি। রাস্তার দুই পাশেই চমৎকার গাছের সারি। ফলে আলো-আঁধারের মূর্ছনায় বালির সঙ্গে প্রথম পরিচয়টি যথেষ্ট ভালোই হলো।

বালির ঐতিহ্যবাহী নৃত্য
ছবি: লেখকের পাঠানো

আমার বালিতে যাওয়ার মূল কারণ ছিল ইলেভেন্থ ওয়ার্ল্ড ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন কনফারেন্সে আমার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা। এই সম্মেলনে আমার গবেষণাপত্র গৃহীত হওয়ার পর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার আমার বিমানভাড়া, হোটেল বুকিংসহ প্রয়োজনীয় সব আয়োজন সম্পন্ন করে দিয়েছিল। ফলে এগুলো নিয়ে আমাকে তেমন মাথা ঘামাতে হয়নি।

বালিতে বেশির ভাগ মানুষ সনাতন ধর্মের অনুসারী, বিষয়টি বালিতে নামলেই অনুভব করা যায়। বিমানবন্দরে বিভিন্ন দেবদেবীর উপস্থিতি হিন্দু সংস্কৃতির সরব অস্তিত্ব জানান দেয়। এর মধ্যে গণেশ দেবতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল। পাশাপাশি বিষ্ণু, গরুড় ও সরস্বতীর প্রতিমাও দেখলাম।

সম্মেলনে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা গবেষকদের মিলনমেলা বসেছিল। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রিয় বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করতে পারার আনন্দ সত্যিই অন্য রকম। একজন নবীন গবেষক হিসেবে বিষয়টি আমার কাছে অন্য রকম ভালো লাগার আবেশ নিয়ে হাজির হয়েছিল। উপরন্তু আমার উপস্থাপনা শেষে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপক যখন আমাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, ‘তোমার পিএইচডি শেষে অবশ্যই পোস্টডক করা উচিত’, তখন পিএইচডির মানসিক চাপ যেন একমুহূর্তে উধাও হয়ে গেল এবং চারপাশে তৈরি হলো এক অন্য রকম ভালো লাগার আবহ।

সম্মেলনের শুরুতে বালির ঐতিহ্যবাহী নাচের আয়োজন পুরো অনুষ্ঠানে অন্য মাত্রা যোগ করেছিল। এদের নাচের আলাদা একটি ধরন আছে। তাদের নৃত্যকলায় চোখ ও মুখের অভিব্যক্তির প্রকাশ বেশি, যা আসলে ধর্মীয় ঐতিহ্যের পরম্পরার সঙ্গে সঙ্গোপনে মিশে আছে।

বিমানবন্দরে সরস্বতী মূর্তি
ছবি: লেখকের পাঠানো

বালিতে বেশির ভাগ মানুষ সনাতন ধর্মের অনুসারী, বিষয়টি বালিতে নামলেই অনুভব করা যায়। বিমানবন্দরে বিভিন্ন দেবদেবীর উপস্থিতি হিন্দু সংস্কৃতির সরব অস্তিত্ব জানান দেয়। এর মধ্যে গণেশ দেবতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল। পাশাপাশি বিষ্ণু, গরুড় ও সরস্বতীর প্রতিমাও দেখলাম। এমনকি রাস্তার পাশে এক জায়গায় মহাভারতের কৃষ্ণ ও অর্জুনের কথোপকথনের দৃশ্যটি চমৎকার একটি ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কৃষ্ণকে অর্জুনের রথে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা যায়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বাসিন্দাদের বাড়িগুলোর নিজস্ব একটি ধরন আছে। সকালে ঘোরার সময় প্রত্যক্ষ করলাম, প্রতিটি বাড়ির সামনে মেয়েরা প্রার্থনা করে ভোগ নিবেদন করছেন। আবার এক জায়গায় চোখে পড়ল, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নামযজ্ঞের মতো একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সব বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি। এসব দৃশ্য জানান দেয়, বালিতে ১৯৯০-এর দশকে পর্যটনের সঙ্গে উন্নয়নের ডামাডোল হাজির হলেও এখানকার মানুষ তাঁদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরম্পরাকে পরম যত্নে আগলে রেখেছেন।

বালির রাজধানী ডেনপাসার ছিমছাম, সাজানো-গোছানো। কোথাও কোনো কোলাহল নেই, হর্নের আওয়াজ নেই, ধুলাবালুর উৎপাত নেই। মাঝেমধ্যেই রাস্তার দুই পাশে চোখে পড়ে সারি সারি নার্সারি, যেখানে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছের সমাহার। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল চমৎকার সব বনসাইয়ের উপস্থিতি।

একটি শহরের নার্সারির ধরন বলে দেয়, সেখানকার মানুষের রুচি কতটা পরিশীলিত। এদিক থেকে বালি পূর্ণ নম্বর পাওয়ার যোগ্য। বালির এমন পরিপাটি রূপ দেখেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জাভা-যাত্রীর পত্রে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন, ‘রথী, বালি দ্বীপটি ছোটো, সেই জন্যই এর মধ্যে এমন একটি সুসজ্জিত সম্পূর্ণতা। গাছে-পালায় পাহাড়ে-ঝরনায় মন্দিরে-মূর্তিতে কুটিরে-ধানখেতে হাটে-বাজারে সমস্তটা মিলিয়ে যেন এক। বেখাপ কিছু চোখে ঠেকে না...ছবির দিক থেকে দেখতে গেলে এমন জায়গা পৃথিবীতে খুব কমই আছে।’

ডেনপাসার শহরে চমৎকার মনুমেন্ট
ছবি: লেখকের পাঠানো

ডেনপাসারে একটি চমৎকার মনুমেন্ট আছে, যেটি এদের গভর্নর হাউস। হাউসটির চারপাশে অনেক খোলা জায়গা, যেখানে ছেলে–মেয়েরা খেলাধুলা করছে। দেখলাম, সবাই মহানন্দে ফুটবল খেলছে। পাশাপাশি অনেকে ব্যাডমিন্টনের অনুশীলন করছে। ব্যাডমিন্টন আসলে এদের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা।

তবে আমি ম্যানচেস্টার থেকে গেছি বলার পর অধিকাংশ তরুণের মধ্যে বেশ উচ্ছ্বাস দেখেছি। তাঁরা আনন্দিত হয়ে জানতে চাইছিলেন, আমি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাঠে গিয়েছি কি না। উত্তরে যখন বললাম, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পাশে মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটি, এই দুই ক্লাবের অবস্থান, তখন তাঁদের চোখেমুখে ফুটে ওঠা উচ্ছ্বাস দেখে একটিই কথা মনে হয়েছে: ফুটবলের আসলে কোনো দেশ-কাল বা সীমানা নেই। ফুটবল সর্বজনীন।

  • লেখক: সুব্রত মল্লিক, পিএইচডি শিক্ষার্থী (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ), ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার, যুক্তরাজ্য এবং সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ৩১তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার