এপস্টিনের ছায়া ও ইউরোপের রাজতন্ত্র: নৈতিক সংকটে কি প্রতিষ্ঠানগুলো
ইউরোপের রাজতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীলতা, ঐতিহ্য ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ?
নরওয়ের রাজপরিবারকে ঘিরে চলমান বিচার এবং একই সময়ে জেফরি এপস্টিন সংযোগ নিয়ে নতুন নথি প্রকাশ এই প্রশ্নকে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক বিতর্কে পরিণত করেছে।
নরওয়ে: জনপ্রিয় রাজতন্ত্রের ওপর চাপ
নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে মারিতের ছেলে মারিউস বর্গ হইবি বর্তমানে একাধিক অভিযোগের মুখে বিচারাধীন। তিনি ৩৮টি অভিযোগের সম্মুখীন, যার মধ্যে ধর্ষণ, সহিংসতা ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধও রয়েছে। আদালতে তিনি চারটি ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন সম্পর্কগুলো তিনি সম্মতিপূর্ণ মনে করেছিলেন।
এ বিচার এমন এক সময় শুরু হয়েছে, যখন রাজপরিবার ইতিমধ্যেই চাপে ছিল। একজন প্রসিকিউটর আদালতে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আইনের সামনে সবাই সমান,’ যদিও তিনি ক্রাউন প্রিন্সেসের ছেলে। এ বক্তব্য শুধু একটি আইনি নীতি নয়, বরং রাজতন্ত্রের আধুনিক অস্তিত্বের ভিত্তি।
এপস্টিন সংযোগ: নৈতিক প্রশ্নের দ্বিতীয় স্তর
মেটে মারিতের অতীত যোগাযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, তিনি বহু বছর ধরে জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। পরে তিনি এ সম্পর্কের জন্য ‘খারাপ বিচারবোধ’ দেখানোর কথা স্বীকার করে গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব নথিতে কারও নাম থাকা অপরাধ প্রমাণ করে না; তবে ক্ষমতার নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত ছিল তা স্পষ্ট করে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ব্রিটেন: পুরোনো সংকটের নতুন প্রতিধ্বনি
এপস্টিন বিতর্ক শুধু নরওয়ের নয়; নতুন নথিতে ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছবি ও ই–মেইলের কথাও উঠে এসেছে, যা আবারও সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় একটি মৌলিক বাস্তবতা—রাজতন্ত্র যতই প্রতীকী হোক, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনো কখনো পুরো প্রতিষ্ঠানকে সংকটে ফেলতে পারে।
তুলনাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
নরওয়ে ও ব্রিটেন দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেশ। তবু এক জায়গায় তারা একত্র—একজন অপরাধী হিসেবে দণ্ডিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে রাজপরিবারের নৈতিক অবস্থান। এখানে মূল সংকটটি ব্যক্তির নয়, প্রতিষ্ঠানের। কারণ, আধুনিক গণতন্ত্রে রাজতন্ত্রের বৈধতা তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—জনবিশ্বাস, নৈতিক মর্যাদা ও স্বচ্ছতা। এই তিনটির যেকোনো একটি দুর্বল হলে প্রতীকী ক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
আইনের শাসন বনাম প্রতীকী ক্ষমতা
নরওয়ের মামলায় প্রসিকিউটরের বক্তব্য যে ‘আইনের সামনে সবাই সমান,’ সেটি আসলে ইউরোপীয় গণতন্ত্রের আত্মপরিচয়। যদি রাজপরিবারের সদস্য বা তাদের ঘনিষ্ঠরা আইনের বাইরে অবস্থান করে বলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়, তাহলে সমস্যা শুধু বিচারব্যবস্থার নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিরও।
একটি বড় প্রশ্ন: রাজতন্ত্র কি নতুন সামাজিক চুক্তির মুখোমুখি
আজকের ইউরোপ ১৯ শতকের ইউরোপ নয়। সামাজিক মাধ্যম, তথ্যপ্রবাহ এবং বৈশ্বিক সাংবাদিকতার যুগে কোনো সম্পর্ক, ছবি বা ই–মেইল গোপন থাকে না। ফলে রাজতন্ত্রকে এখন আর শুধু ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; তাদের নৈতিক নেতৃত্বও দেখাতে হবে।
নইলে প্রশ্ন উঠবে, রাজতন্ত্র কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা, নাকি এখনো নৈতিক দিকনির্দেশনার প্রতীক?
বাংলাদেশের জন্য কেন এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক
প্রথম দেখায় এটি ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সংকট মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি বৈশ্বিক শিক্ষা। প্রতিষ্ঠানের প্রতি অন্ধ আস্থা বিপজ্জনক। স্বচ্ছতা ছাড়া সম্মান টিকে না। ক্ষমতা যত উঁচুতে যায়, জবাবদিহির মান তত বেশি হওয়া উচিত।
বাংলাদেশসহ যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক—প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় তখনই, যখন তারা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে ভয় পায় না।
নরওয়ের আদালতকক্ষ থেকে ব্রিটিশ রাজপরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত এই ঘটনাগুলো আমাদের একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি সত্যের সামনে দাঁড় করায়। রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তাদের ঐতিহ্যের ওপর নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
কারণ, শেষ পর্যন্ত জনগণ শুধু জানতে চায় একটাই বিষয়—ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষেরা কি একই নৈতিক মানদণ্ডে বিচারিত হন, যেটি সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য?
এ প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ইউরোপের রাজতন্ত্র আগামী প্রজন্মের কাছে প্রতীক থাকবে, নাকি ইতিহাস।
লেখক: রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন