বনলতা সেন—জীবনানন্দ দাশের জীবন ও জিজ্ঞাসা

ছবি:লেখক

‘বনলতা সেন’। এই একটা নামই যথেষ্ট। এই নাম দিয়ে কী বোঝানো হয়, এটা আর কাউকে আলাদা করে বলে দিতে হয় না। বলে দিতে হয় না এর স্রষ্টা জীবনানন্দ দাশের কথাও। জীবনানন্দের ক্ষণস্থায়ী জীবন এবং অকালমৃত্যু এখনো সচেতন পাঠকের চিন্তার খোরাক জোগায়। মহীয়সী মা কুসুমকুমারী দাশের সন্তান ছিলেন। সেই স্বাচ্ছন্দ্যের সংসার থেকে একসময় অভাবের সংসারে হাবুডুবু খেয়েছেন। অবাক দৃষ্টিতে জীবন ও প্রকৃতিকে দেখা জীবনানন্দ যেন খেই হারিয়ে ফেলা একজন মানুষ। পৃথিবীর বুকে বর্তমান থেকেও যেন নেই। আর কোথায় আছেন, সেটাও যেন ঠিক জানেন না। একটা বিহ্বল জীবন কাটিয়ে গেছেন।

জীবনের নৌকার একমাত্র নাবিক হয়ে পৃথিবীর সাগরে, মহাসাগরে চড়ে বেড়িয়েছেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত।

জীবনানন্দ বাস্তবে তেমন ভ্রমণ না করলেও তাঁর পড়াশোনার পরিধি ছিল বিশাল। তাঁর কবিতার শব্দচয়ন থেকে শুরু করে তুলনামূলক বিশেষ্য ও বিশেষণগুলো এখনো আগ্রহের জন্ম দেয়। সেই মানুষটাই মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যান। কেউ কেউ এটাকে বলেন দুর্ঘটনা। আবার কেউ কেউ বলেন আত্মহত্যা।

‘বনলতা সেন’ ছবিতে জীবনানন্দ দাশের জীবনের ওপর আলো ফেলার পাশাপাশি এই মৃত্যুর সলুকসন্ধান করা হয়েছে। কেন এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটাও বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল সুনিপুণ দক্ষতায় নির্মাণ করেছেন এই চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র জীবনানন্দ এবং তাঁর অমর সৃষ্টি বনলতা সেন। যার গল্প মোটামুটি সবারই জানা। তবু প্রায় আড়াই ঘণ্টা আপনি সবকিছু ভুলে আটকে থাকবেন পর্দায়। অসাধারণ চিত্রায়ণ। মনে কাঁপন ধরানো আবহসংগীত। নিখুঁত অভিনয়। জিজ্ঞাসু সংলাপ। সর্বোপরি চোখজুড়ানো সব দৃশ্যের নির্মাণ। তাই এই ছবির পার্শ্বচরিত্র মহীনের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও যেন ফিরে যাই জীবনানন্দ দাশের জীবনকালে।

সেই সময়টাকে এতটাই জীবন্ত করে তোলা হয়েছে, যেন আপনার মনে হবে আপনি সত্যি সত্যিই ওই সময়ে ফিরে গেছেন। জীবনানন্দ দাশের জীবনের চড়াই–উতরাইগুলোয় আপনিও যেন চাইবেন কবিকে সামান্য হলেও একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে। আমরা সবাই জানি, জীবনানন্দ দাশ সংসার জীবনে সুখী ছিলেন না। তাই যখন জীবনানন্দ দাশের জীবনে লাবণ্য দাশের আগমন হতে যাচ্ছে, মহীনের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও যেন কবিকে বলছি, আপনি বিয়ের দিকে এগোবেন না। সংসার জীবনে সুখী না থাকলেও লাবণ্য দাশের লেখা থেকে জানা যায়, বাবা হিসেবে ছিলেন আর্দ্র হৃদয়ের অধিকারী।

এই পর্যায়ে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে পরিচয় এবং তাঁকে যৎসামান্য নিজের মধ্য ধারণ করার কথা লেখার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। একজন সাধারণ মানের পাঠক হিসেবে হয়তোবা এটা অনেকের সঙ্গেই মিলে যেতে পারে। কবিতার প্রথম আট লাইন মুখস্থ লেখার প্রশ্ন আমার জন্য ছিল বিভীষিকার মতো। শুধু এই কারণে কবিতার পাশাপাশি কবিদের প্রতি আমার ছিল বিশাল অব্যক্ত ক্ষোভ। আর মফস্‌সলের আমরা বন্দে আলী মিঞার ‘আমাদের গ্রাম’ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমাদের ছোট নদী’র সঙ্গে নিজেদের যতটা রিলেট করতে পারতাম, অন্য বিষয়গুলোর সঙ্গে নিজেকে অতটা রিলেট করতে পারতাম না।

জানি না, জীবনানন্দ দাশের কোনো কবিতা আমাদের কোনো পাঠ্যবইয়ে ছিল কি না। আর নুন আনতে পান্তা ফুরানোর শহরতলির সংসারে শহরে গিয়ে আউট বই কিনে আনার বিলাসিতা ছিল কল্পনার বাইরে। অবশ্য কেউ হয়তোবা বলেও দেয়নি কবির কথা। যা–ই হোক, অনেক বড় বয়সে এসে কবির সঙ্গে পরিচয় হলো প্রিয় লেখক শাহাদুজ্জামানের লেখা ‘একজন কমলালেবু’ পড়ে। এরপর ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আকবর আলী খানের লেখা ‘চাবিকাঠির খোঁজে’ পড়লাম। এরপর জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী লাবণ্য দাশের লেখা ‘মানুষ জীবনানন্দ’ পড়লাম। অনলাইনে–অফলাইনে আরও অনেক লেখা পড়লাম তাঁকে নিয়ে। ক্লিনটন বুথ সিলির লেখা জীবনানন্দ দাশের আত্মজীবনী এখনো শেষ করতে পারিনি অবশ্য।

এর মধ্যেই জেনেছি তাঁর লেখা গল্প–উপন্যাসও আছে। তারপর সেগুলোও সংগ্রহ করে রেখেছি। জানি না কবে সেগুলো পাঠ করতে পারব। জীবনানন্দের ক্ষণস্থায়ী জীবন আমার কাছে সব সময়ই বিস্ময়জাগানিয়া। যতবারই ভাবি ততবারই একইসঙ্গে অবাক ও মুগ্ধ হই। লেখালেখিটা ছিল যেন তাঁর একমাত্র জায়গা, যেখানে তিনি একটু সময়ের জন্য হলেও বুক ভরে শ্বাস নিতেন। বাংলাদেশে এমন একটা কথা প্রচলিত আছে। ব্যর্থ প্রেমিকেরাই দিন শেষে কবি হন। সেদিক দিয়ে কথাটা জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও হয়তোবা সত্য। তবে আমাকে মুগ্ধ করে জীবনানন্দের কবিতার ভাষা ও শব্দ। কত রকমের রূপক যে লুকিয়ে আছে প্রতিটা শব্দে, প্রতিটা লাইনে। অবশ্য সবাই যাতে বুঝতে না পারে সেটাও মাথায় রাখতে হতো নাহলে বিপদে পড়া সমূহ সম্ভাবনা ছিল।

সেই জন্যই সমসাময়িক সাহিত্যিকেরা জীবনানন্দের কবিতাকে হেয়ালি বলেই চালিয়ে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু জীবনানন্দের কবিতার ভাষা ছিল সময়ের তুলনায় অনেক আগানো; কারণ, তাঁর পড়াশোনা ছিল অনেক। উপমহাদেশের সমসাময়িক সব সাহিত্যের বাইরেও পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের সাহিত্যের খবর রাখতেন। আর জীবনের কশাঘাতগুলো তাঁর ভাষাকে করেছিল আরও শাণিত। যেহেতু সমসাময়িকদের কাছ থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তিরস্কার জুটতো, তাই প্রায় সব সাহিত্যই ছিল বাক্সবন্দি। জীবনানন্দের মৃত্যুর পর যেন আমরা একটা ভান্ডারের সন্ধান পেলাম। আর জীবনানন্দের বয়স আটকে গেল সেই পঞ্চান্নতেই।

জীবনানন্দের মৃত্যুর দীর্ঘ বাহাত্তর বছর পর মাসুদ হাসান উজ্জ্বল তাঁকে নিয়ে ‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তাঁর প্রতি আমাদের করা অন্যায়ের যেন কিছুটা হলেও দায় শোধ করলেন। ছবির পাত্র–পাত্রী সবাই দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। খায়রুল বাসার, নাবিলা, সোহেল মন্ডল পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। আর বাকি চরিত্রগুলোও ছিল সাবলীল। বাপ্পা মজুমদারের গানটা যেন মনের বীণায় বেজে উঠেছিল। বিভিন্ন কবিতার অংশ পাঠ ছিল বাড়তি পাওনা। ক্যামেরার কাজগুলোও দুর্দান্ত। কিছু কিছু ফ্রেম তো মনে গেঁথে আছে। মাসুদ হাসান উজ্জ্বলকে ধন্যবাদ, আমাদের হয়ে দায়টা কাঁধে নিয়ে এমন একটা ছবি নির্মাণের ঝুঁকি নেওয়ার জন্য।

পথ প্রোডাকশনকে ধন্যবাদ, ছবিটা অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]