২১ জানুয়ারি এ বছরের বসন্ত উৎসবের প্রথম দিন। জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রাস্তায় অনেক ট্র্যাফিক জ্যাম হয়। তখন গাড়ি চালিয়ে অফিসে আসতে আধা ঘণ্টার পথ দেড় ঘণ্টায় অতিক্রম করতে হয়। তবে এখন অবস্থা ধীরে ধীরে ভালো হয়েছে, রাস্তার কোনো কোনো ছোট দোকান ও রেস্তোরাঁও ছুটির কারণে বন্ধ। আমার ধারণা, অনেকে ইতিমধ্যে জন্মস্থানে ফিরে যাওয়ার পথে। তাই বেইজিংও আমার ছোটবেলার মতো একটু শান্ত হয়ে যাবে। বাংলাদেশে ঈদের সময় প্রায় একই দৃশ্য দেখেছি। ঈদ উৎসবের জন্য সবাই গ্রামের বাড়িতে ফিরে যায়। তখন ঢাকা শহরের ট্র্যাফিক জ্যামও অনেক কমে যায়।

২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে কোভিড মহামারি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তিন বছর হয়ে গেছে। মহামারি প্রতিরোধের জন্য চীনের অনেক লোক এত দিন জন্মস্থানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। তবে ৮ জানুয়ারি থেকে চলমান কোভিড পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে চীন সরকার নতুন শিথিল ব্যবস্থা নিয়েছে। ফলে, এ বছরের বসন্ত উৎসবে অনেক চীনা নিজ নিজ জন্মস্থানে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। বড় শহরের লোকদের বসন্ত উৎসবের সময় জন্মস্থানে ফিরে যাওয়ার একটি বিশেষ নাম আছে, আর সেটি হচ্ছে ‘ছুন ইয়ুন’। এর অর্থ হলো বসন্ত উৎসবের জন্য যাতায়াত। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, চলতি বছর প্রায় ২১০ কোটি পার্সনটাইমস যাত্রী বিমান, ট্রেন, জাহাজ ও মহাসড়ক ব্যবহার করে জন্মস্থানে ফিরে যাবেন। এত যাত্রী বহন করা চীনের পরিবহনব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

চীনা চান্দ্রপঞ্জিকা অনুসারে প্রতিবছরের বসন্ত উৎসবের তারিখ নির্দিষ্ট নয়। তবে সাধারণত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দিনটি পড়ে। এ উৎসব চীনাদের জন্য নতুন বছরের প্রতীক। উৎসবের পর কৃষকদের কৃষিকাজ ধীরে ধীরে শুরু হবে, অনেকটা বাংলাদেশের পয়লা বৈশাখের মতো। চীনাদের ১২টি রাশিচক্র রয়েছে। চীনা ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে ইঁদুর, গরু, বাঘ, খরগোশসহ ১২টি পশুর নামে বছরের নামকরণ করা হয়। ১২ বছরে প্রতিটি পশুর নামে বছর একবার করে আসে এবং এভাবেই চলতে থাকে। তাই প্রত্যেক চীনার জন্য নিজের জন্মবর্ষের পশু আছে। চলতি বছর হলো খরগোশবর্ষ। চীনা ঐতিহ্যিক সংস্কৃতিতে যারা খরগোশবর্ষে জন্মগ্রহণ করে, তারা হয় শান্ত, নরম, সরল ও দায়িত্বশীল। তারা কাজ করলে খুব ভালোভাবে তা শেষ করে।

চীনের বড় শহরের নাগরিকেরা বসন্ত উৎসবের সময় সিনেমা হলে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখে, শপিং মলে সুন্দর উপহার কেনে, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় গিয়ে গল্প ও খাওয়াদাওয়া করে এবং বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলায় অংশ নেয়। উত্তর চীনের লোকেরা ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে স্পা করা বেশ পছন্দ করে। কয়েক বছর ধরে অনেক প্রচলিত বিনোদনের পদ্ধতি এটি। এটি দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানেও বেশ জনপ্রিয়। চীনের স্পা দোকান এখন সহজে পাওয়া যায়।

স্পার দোকানগুলোয় নারী ও পুরুষদের আলাদা ব্যবস্থা আছে। তবে ডাইনিং এলাকা ও বই পড়ার কোণ, কারাওকেসহ বিভিন্ন বিনোদন এলাকা সবার জন্য খোলা থাকে। যাঁরা বাচ্চাদের নিয়ে স্পা দোকানে যান, সেখানে বাচ্চাদের বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণত প্রত্যেকে ৩০০ ইউয়ান দিয়ে ৬ ঘণ্টার মতো স্পা দোকানে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারেন। যদি পা ম্যাসাজ, বিশেষ খাবার অর্ডার করতে চান, তাহলে অতিরিক্ত খরচ দিতে হবে। বন্ধুদের সঙ্গে আরামে এক দিন কাটাতে পারেন এখানে। চীনা যুবকদের মধ্যে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

যদিও আমি সব সময় বেইজিংয়ে বসবাস করি, তবে অনেক নতুন বিনোদনপদ্ধতি সম্পর্কে কিছুদিন আগে মাত্র জেনেছি। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।

চলতি বছরের বসন্ত উৎসবের একটা দিন আমিও বন্ধুদের সঙ্গে স্পার দোকানে কাটানোর পরিকল্পনা করছি। নতুন বিনোদনপদ্ধতিতে সুখী ও সুন্দর বসন্ত উৎসবের ছুটি কাটাব। লেখার শেষ দিকে সবাইকে বেইজিং থেকে বসন্ত উৎসবের অগ্রিম শুভেচ্ছা জানাই, বন্ধুদের সময় পেলে চীনা বসন্ত উৎসবের আমেজ উপভোগ করতে আহ্বান জানাই।

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) বাংলা বিভাগের উপপরিচালক।