রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ব্যাংককেও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষও আছে। তবে আমি দেখলাম, ঢাকার তুলনায় ব্যাংককে খাবারের দাম কম। যদিও থাইল্যান্ডের মানুষের মাথাপিছু আয় বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে (পিপিপি) থাইল্যান্ডের মাথাপিছু আয় ১৮ হাজার ৫৩০ ডলার।

অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষের আয় সাত হাজার ডলারের কম। যা-ই হোক, কাঁচাবাজারে ঢুঁ মারার সময় (৫ নভেম্বর) আমার সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় পাবলিক টেলিভিশন থাই পিবিএস চ্যানেলের সাংবাদিক কানালাওয়াই ওয়ায়েক্লায়হং।

ডিমের প্রসঙ্গ দিয়েই শুরু করি। বাজারে দেখলাম, ঢাকায় আমরা যে বাদামি ডিম কিনি, সেটা ব্যাংককে কেনা যায় ২৪টি সর্বনিম্ন ১২০ টাকার মতো দিয়ে। মানে হলো, বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ টাকা দিয়েই ব্যাংককে একটি ডিম কেনা যায়। বাংলাদেশে দামটি দ্বিগুণের বেশি। তবে ব্যাংককের বাজারে নানা দামের ডিম রয়েছে। বাজারে পাওয়া যায় পরিবেশবান্ধব ফার্মে উৎপাদিত নানা ধরনের পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ডিম। হাঁসের ডিম ২৪টির দাম ১২০ থেকে ৩৯২ টাকা পর্যন্ত।

জানিয়ে রাখি, (এই লেখার দিনের) বিনিময়মূল্য অনুসারে বাংলাদেশি ২ টাকা ৭০ পয়সায় ১ থাই বাথ হয়। সে অনুযায়ী বাজারদরের হিসাবটি করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে আমিষ থাকেই।

প্রতি বেলায় পাতে মাংস রাখেন তাঁরা। মুরগি ও হাঁসের মাংসের দাম প্রতি কেজি ১০৮ টাকা থেকে শুরু করে ২৯৭ টাকা পর্যন্ত। হাঁস ও মুরগি জবাই করে পরিষ্কারের পর শুধু মাংস বিক্রির জন্য রাখা হয়। বাংলাদেশের একটি অনলাইন পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে খোঁজ নিয়ে জানলাম, দেশে এ ধরনের ব্রয়লার মুরগির কেজি ২৯০ টাকা।

ঢাকার বাজারে এক কেজি গরুর মাংসের দাম যেখানে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, ব্যাংককে কেনা যায় প্রতি কেজি ২১৬ টাকা দিয়ে। তবে মাংসের ধরন ও মানভেদে প্রতি কেজি ৪৩২ টাকা পর্যন্ত দর রয়েছে। ব্যাংককে গবাদিপশুর শরীরের বিভিন্ন জায়গার মাংস বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়।

আগেই বলেছি, ব্যাংককে মানুষ রেস্তোরাঁয় বেশি খান। সেখানকার সাধারণ রেস্তোরাঁগুলোতে স্থানীয় লোকজন ১০৮ থেকে ১৩৫ টাকায় দুপুর বা রাতের খাবার খেতে পারেন। এ খাবারের মেনুতে সাধারণত মাংসের সঙ্গে ডিমভাজি ও সবজি থাকে। ঢাকায় একটি রেস্তোরাঁয় মাংস, ডিম ও সবজি দিয়ে ভাত খেতে আপনার কত টাকা লাগে?

ব্যাংককের বাজারটিতে চালের দাম ধরনভেদে প্রতি কেজি ৫৯ থেকে ১১৩ টাকা। পটোলের কেজি ৪৪ টাকা। বেবি কর্ন পাওয়া যায় ৭৪ টাকা কেজিতে। শসা প্রতি কেজি ৬৭ টাকা, বড় লাল মরিচ ৫৪, কাঁচা মরিচ ১৬২, বরবটি ৫৪ ও মুলা ৮১ টাকায় কেনা যায়। আলুর দাম অবশ্য ঢাকার চেয়ে বেশি, প্রতি কেজি ১০৮ টাকা। ঢাকায় আলু কেনা যায় ৩০ টাকা দিয়েই।

ব্যাংককে ফলের দামও কম। বড় আপেল পাওয়া যায় প্রতি কেজি ৫৪ টাকায়। কমলা কেনা যায় মানভেদে প্রতি কেজি ১৩৫ থেকে ১৬২ টাকায়। নাশপাতির কেজি ২১৬ টাকা।

বাংলাদেশে সম্প্রতি জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এখন ঢাকায় অকটেনের দাম প্রতি লিটার ১৩০ টাকা। থাইল্যান্ডে অকটেনের দাম প্রতি লিটার ৯২ টাকা।

আয় কেমন

স্থানীয় সাংবাদিক কানালাওয়াই ওয়ায়েক্লায়হং জানান, থাইল্যান্ডে সর্বনিম্ন মজুরি ধরা রয়েছে দৈনিক ৩০০ বাথ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮১০ টাকার সমান। এই মজুরি পেশাভেদে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত হয়। নির্মাণশ্রমিক, নিরাপত্তা প্রহরী ও রেস্তোরাঁশ্রমিকদের অভিজ্ঞতাভেদে এই হারে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।

যাঁরা স্নাতক সম্পন্ন করে সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে যোগ দেবেন, তাঁদের জন্য সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে মাসে ৪৮ হাজার ৬০০ টাকা। থাইল্যান্ডে সরকারি ও বেসরকারি যেকোনো চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর একজন ব্যক্তি (৬০ বছর বয়স থেকে) প্রতি মাসে ভাতা পেয়ে থাকেন ১ হাজার ৬২০ টাকা।

সঞ্চয় করেন কম

থাইল্যান্ডে আমি বহুবার গেছি। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা আছে। আমার পরিচিতি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে ভবিষ্যতের চিন্তায় অর্থ জমানোর প্রবণতা তেমন একটা দেখিনি। এর বড় কারণ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। থাইল্যান্ডে নাগরিকেরা মাত্র ৮১ টাকায় জ্বর থেকে শুরু করে ক্যানসারের চিকিৎসাও পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে হাসপাতাল খরচ, চিকিৎসকের ফি, ওষুধ ও অস্ত্রোপচারও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে থাইল্যান্ডে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশের বেশি (২০২১-২২)। থাইল্যান্ডে যে জিডিপি বাড়ল খুব সামান্য হারে, তা দিয়ে কোনো আলোচনা-সমালোচনা দেখা যায়নি।

সাংবাদিক কানালাওয়াই ওয়ায়েক্লায়হং বলেন, থাইল্যান্ডে করোনার সময় সরকারের পক্ষ থেকে সবাইকে প্রতিদিন প্রায় ৪০৫ টাকা করে দেওয়া হতো। টাকাটা মুঠোফোনে চলে আসত। তবে এটা নাগরিকদের জন্য যথেষ্ট ছিল কি না, সেটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

লেখক: বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী