শিক্ষিত
ক্লাস ছুটির পর অমৃতপুর মহাবিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক মোজাম্মেল স্যার সচরাচর রিকশায় চড়ে বাসায় ফিরেন। আজ তিনি কোনো রিকশা পাননি। রাস্তায় নেমে এদিক–ওদিক তাকিয়ে দেখলেন। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলেন, কোনো খালি রিকশা যদি আসে। না রিকশা নেই। এই সময়ে যানবাহনগুলো খুবই ব্যস্ত থাকে। অফিসের কর্মচারী, স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা উদ্ভ্রান্ত হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। আজকের চিত্র অন্যদিনের মতো নয়। আজ রিকশা-যানবাহন অন্য দিনের কমই মনে হচ্ছে তাঁর কাছে। পুরোটা পথ আজ হেঁটেই যেতে হবে। বাসায় পৌঁছাতে আধা ঘণ্টার ওপরে লাগবে তাঁর। আজ ছাতাও আনা হয়নি। এখনো চনমনে রোদ। তীব্র গরমে প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে আছে। সাতপাঁচ ভেবে তিনি হাঁটা শুরু করেন।
প্রায় এক ঘণ্টার মতো হেঁটে একেবারে ঘেমে-নেয়ে বাসার মূল দরজার সামনে উপস্থিত হলেন মোজাম্মেল স্যার। দরজায় আঘাত করলেন তিনি। অনেকক্ষণ পর তাঁর ১২ বছর বয়সী কন্যা আম্বিয়া দরজা খুলে দিয়ে খাবারের ঘরের দিকে ছুটে গেল।
মোজাম্মেল স্যার জামা পাল্টে বসার ঘরে বসলেন। গলা ছেড়ে ডাকলেন, ‘মা আম্বিয়া …!’ কোনো সাড়া নেই।
স্যার আবার ডাকলেন, ‘মা আকলিমা …!’
এবারও সাড়া নেই।
তৃতীয় বার তিনি ডাকলেন, ‘বাবা মোজাফ্ফর …!’
একই অবস্থা এবারও।
স্যার তাঁর স্ত্রীকে ডাকলেন, ‘আম্বিয়া-আকলিমা-মোজাফফরের আম্মু, পরী বানু …!’
খাবারের ঘর থেকে আম্বিয়ার গলা শোনা গেল, ‘আমাদের আম্মু গোসল করে।’
মোজাম্মেল স্যার উঠে খাবারের ঘরের দিকে যান। তাঁর দুই চোখ কপালে উঠে গেল! তিনি তাঁর তিন সন্তানকে দেখে বললেন, ‘এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন? করছ কী তোমরা তিনজনে মিলে?’
স্যার দেখলেন আম্বিয়া, আকলিমা ও মোজাফফর হাতে মাছি মারার ব্যাট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবার দৃষ্টি খাবার টেবিলে।
আম্বিয়া বলল, ‘আব্বু আমরা খাবার পাহারা দিচ্ছি!’
‘পাহারা? কেন?’ ১১ বছরের কন্যা আকলিমা বলল, ‘মাছি বসে, তা–ই!’
তার দুই বছরের ছোট মোজাফফর বলে, ‘ওরা খুব দুষ্টু আর চালাক!’
মোজাম্মেল স্যার ‘ও আচ্ছা। বুঝেছি। তোমরা সরে যাও। আমি ব্যবস্থা করছি।’
রান্নাঘর থেকে কয়েকটি থালা এনে টেবিলে রাখা খাবারের সব কয়টি পাত্র ঢেকে দিলেন। ‘এবার হয়েছে। যাও তোমরা’ বলে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে গেলেন তিনি। এর মধ্যে তাঁর স্ত্রী পরী বানু স্নান সেরে খাবার ঘরে আসেন। ইত্যবসরে মোজাম্মেল স্যার স্নানঘরে প্রবেশ করেন।
পরী বানু দেখলেন তাঁর তিন সন্তান টেবিলের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের হাতে মাছি মারার হাতিয়ার নেই। ‘খাবার কে ঢেকেছে?’ গলা চড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি।
‘আব্বু!’ মোজাফফর বলল।
‘তোদের আব্বু আমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত হয়ে গেছে …!’ বলে পরী বানু খাবারের সব কটি পাত্র উন্মুক্ত করে দিলেন।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
‘এই তোরা দেখ, মাছি আসে কি না। আসলেই মেরে ফেলবি। একটি মাছিও যেন খাবারে না বসে। বসলে খবর আছে কিন্তু…!’
এবার আম্বিয়া বলে, ‘আম্মু তুমি নাকি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছ। আর আব্বু কলেজে অঙ্ক পড়ায়। পরী বানু কপালে দুই চোখ তুলে বললেন, ‘তা পড়াক! কিন্তু আমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত হয়নি তোদের আব্বু। তাতে হয়েছেটা কী? আমি তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত। হ্যাঁ স্কুল-কলেজের শিক্ষার বিষয়টা অন্য জিনিস!’
‘কী ভাবে?’ আম্বিয়া মুখ টিপে হাসে।
‘এই ভাবে হাসছিস ক্যান? শুনিসনি উকিলের বাড়ির বিড়ালও ওকালতি জানে! আমি তো মাস্টারের বউ। তোদের মাস্টার আব্বুর চেয়ে বড় মাস্টার এই আমি! বুঝেছিস?’ সবার হাতে মাছি মারার ব্যাট তুলে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই তোরা দাঁড়িয়ে থাক। আমি দেখি তোদের মাষ্টার আব্বু করছে কী।’
মোজাম্মেল স্যার এগিয়ে এলেন। এতক্ষণ বসার ঘরেই ছিলেন। তিনি হেসে বললেন, ‘আমাদের বাড়ির মাছিরাও জানে তুমি অনেক শিক্ষিত। তাই ওরাও শিক্ষিত হয়ে গেছে! একই সঙ্গে ওরা আরও বেশি চালাক হয়েছে! নতুন নতুন বুদ্ধি এঁটে ওরা তোমার খাবারে ভাগ বসায়।’ তিনি বললেন, ‘এবার আমরা সবাই একসঙ্গে খেতে পারি নিশ্চয়।’
আকলিমা বলল, ‘আব্বু, আম্মু বলেছ, সে নাকি তোমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত!’
মোজাম্মেল স্যার চেয়ার টেনে বসলেন। তিনি বললেন, ‘আমি সব শুনেছি। এ কথা তোমাদের আম্মু সব সময়ই বলে। বাকি জীবন তাই বলে যাবে।’
মোজাফফর জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কিছু বল না?’
‘কী বলব? ঠিকই তো বলে তোমাদের আম্মু।’ মোজাম্মেল স্যার নিজের থালায় ভাত নিয়ে যোগ করেন, ‘দুনিয়ার সব আম্মুরা আব্বুদের চেয়ে বেশি শিক্ষিতই হয়। তাই হতে হয় তাদের।’
পরী বানু খুশি হয়ে স্বামীর থালায় মাছের মাথাটা তুলে দেন। ‘না না পরী! তুমিই খাও ওটা। মাছের মাথা তোমারই খাওয়া দরকার।’ মোজাম্মেল স্যার মাছের মাথা বাটিতে রেখে বলেন, ‘তবে সবটুকু নয়। কিছু খেয়ে বাকিটা তিন সন্তানদের ভাগ করে দাও। আমাকে বাটির ওই ছোট টুকরাটা দিলেই খুশি হবো আমি। মাছের মাথা খাওয়া দরকার নেই আমার!’
‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।’ পরী বানু বলেন, ‘আমি ছোটো বেলায় যা করেছি, ওদের দিয়ে তা–ই করাই। তুমি মাস্টার মানুষ। আমি তোমার ছাত্রী। এক সময় ছাত্রছাত্রী তাদের মাস্টারের চেয়ে বেশি শিক্ষিত হয়ে ওঠে। আমার বেলায়ও তা–ই হয়েছে!’
আম্বিয়া তার আব্বুকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আচ্ছা আব্বু, তুমি আমাদের এত শিক্ষিত আম্মুকে বিয়ে করেছ কী ভাবে?’ মুচকি হেসে হাত দিয়ে মুখ ঢাকে সে। অন্য দুই ভাই-বোন তার দিকে তাকিয়ে হাসে। আম্বিয়াকে দেখে তারাও হাত দিয়ে মুখ ঢাকে।
মোজাম্মেল স্যার হেসে বললেন, ‘সেটাই তো বিষয়! আমার আম্মু আর তোমার মায়ের আম্মু তাঁরা দুই বোন। অর্থাৎ তোমাদের দাদি ও নানি সম্পর্কে একই মায়ের সন্তান। তোমাদের নানি তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর বোন, অর্থাৎ তোমাদের দাদিকে বলেছিল, মোজাম্মেলের সঙ্গে যেন তাঁর মেয়ে পরী বানুর বিয়ে দেয়। আমার মা তোমাদের নানিকে কথা দিয়েছিলেন। সন্তানদের ছোটো রেখে তোমাদের নানা, অনেক আগে মারা যান। তাই তোমাদের বিধবা নানি তাঁর চার সন্তানকে ঠিক মতো লেখাপড়া করাতে পারেননি। তোমাদের একটাই মামা। পরিবারের বড় হলেও, তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য তেমন ভালো ছিল না। তিনি অনেক কষ্টে তোমাদের মা ও দুই খালাদের বড় করেন। তবে তোমাদের আম্মুর চেহারা ছিল ঠিক পরীর মতোই! অন্য বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফর্সা ও সুন্দরী! তখন এলাকায় এক ‘পরী’ নামেই সবাই তাকে চিনত। বাস লেখাপড়া শেষ করে আমি তাকে বিয়ে করলাম! দেখেছো, এখনো কিন্তু কম নয় তোমাদের আম্মু!’
আকলিমা বলে, ‘হ্যাঁ আব্বু আমাদের আম্মু অনেক সুন্দর! তাঁর মতো সুন্দরী এখানে আর কেউ নেই!’ আম্বিয়া ও মোজাফফর সায় দেয়, ‘হ্যাঁ আম্মু অনেক সুন্দর!’
পরী বানুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, কে এই পরী বানুকে দেখতে হবে না! দেখতে শুনতে আমি ছিলাম এলাকার সবার ওপরে! সে সময় অনেকেই এই পরীকে বিয়ে করতে পাগল হয়ে গিয়েছিল! দূরদূরান্ত থেকেও বহু সম্বন্ধ এসেছে! ঠিক কি না মাস্টার সাহেব?’
মোজাম্মেল স্যারের মুখে হাসি। তিনি বলেন, ‘তা ঠিক। তবে মানুষের চেহারার সৌন্দর্যের চেয়ে মনের সৌন্দর্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ পরী বানু দুই চোখ বড় করে বলেন, ‘কী আমার মন কি সুন্দর না?’
মোজাম্মেল স্যার বলেন, ‘আমি সেই কথা বলিনি পরী। আমি বলতে চেয়েছি সব মানুষের কথা। অনেক মানুষ আছে, তাদের স্বাস্থ্য-সৌন্দর্য নিয়ে বড়াই করে। অহংকারী হয়ে ওঠে। শুধু স্বাস্থ্য-সৌন্দর্য নিয়ে নয়। মানুষের ধন-সম্পত্তি, শিক্ষা-পদমর্যাদা নিয়েও তা করা উচিত নয়।’
আম্বিয়া বলল, ‘আম্মু তুমি আবার স্কুলে যাও। আগে এসএসসি পাস কর।’ আম্বিয়ার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আকলিমা বলে, ‘আম্মু তুমি কাল থেকেই আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়ে যাও।’ মোজাফফর বলে, ‘আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে স্কুলে যাব শিক্ষা নিতে।’ আম্বিয়া যোগ করে, ‘আর আব্বু যাবে তাঁর কলেজে শিক্ষা দিতে!’ পরী বানু শব্দ করে হাসেন। ‘এই বয়সে আমি কি আবার পাঠশালায় যাব? মানুষে বলবে কী? শরমের কথা!’
মোজাম্মেল স্যার বললেন, ‘মানুষে ভালোই বলবে। এতে শরমের কী দেখছ তুমি? আমাদের সন্তানরা তো ঠিকই বলেছে! তুমি তাই কর। আমিও চাই তুমি আরও শিক্ষিত হও! এসএসসি কমপ্লিট করে আমার কলেজে ভর্তি হও! পরী বানু বললেন, ‘আচ্ছা! তবে সেই ব্যবস্থাই কর। সত্যি বলছি, আমারও ইচ্ছা, অন্তত এসএসসি পাস করি আগে …! আরও শিক্ষিত হয়ে উঠি আমি! এ যুগে এত কম শিক্ষা নিয়ে জীবন চালানো যায় না!’
মোজাম্মেল স্যার উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘তা মিথ্যা বলনি। চাইলে এখনই তা করতে পারো। আজই শুরু কর তুমি। তোমার পড়াশোনার সব ব্যবস্থা আমি করে দেব। একে একে আমরা সবাই প্রাতিষ্ঠানিক এবং স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠব! অন্যদের মধ্যেও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেব! সত্যি এখন আমি নিজেকে খুবই সুখী ও গর্বিত মনে করছি। আজকের এই দিন আমাদের পরিবারের জন্য আলাদা আনন্দে মুখরিত এবং স্মরণীয় একটি দিন! তোমাদের জন্য আমার থাকবে আন্তরিক চেষ্টা, দোয়া-প্রার্থনা ও শুভকামনা! চল আমরা হাতে হাত রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাই! মহান আল্লাহ্ আছেন আমাদের ওপরে!’
এ সময় মোজাম্মেল স্যারের পরিবারে অমিয় আনন্দের আলো সবাইকে উদ্ভাসিত করে তোলে। খাবার সামনে নিয়ে মোজাম্মেল স্যার, পরী বানু, আম্বিয়া, আকলিমা ও মোজাফফর পরস্পর এক সমান্তরালে নিজেদের কল্পনা করে সম্মোহিত হয়ে পড়ে। নীরবতা ভেঙে মোজাম্মেল স্যার বলেন, ‘আগে আমাদের খাবার খাই। আজই একসঙ্গে বসে, পরিকল্পনা করব।’ পরী বানু বললেন, ‘আজই কথা পাকা করতে হবে। ধন্যবাদ জানাই তোমাদের! নিশ্চয় আমরা এগিয়ে যাব!’ আম্মুর কথা শুনে বেশি খুশি হয় আম্বিয়া, আকলিমা ও মোজাফফর।