একটি ল্যাম্পপোস্টের আত্মকাহিনি
আমি আমার পূর্বজন্মের কথা মনে করতে পারি না। পূর্বের জন্মে কী ছিলাম, সেটাও আমার অজানা। তবে এই জন্মের শুরু থেকে সবকিছুই মনে পড়ে আমার। আমি ছিলাম একটা ধাতব দণ্ড। তার একটা অংশ কেটে নিয়ে আমার হাতল বানানো হয়েছিল। এরপর আমাকে রাস্তার পাশে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হলো। এরপর সেই হাতলের সঙ্গে একটা বৈদ্যুতিক বাতি ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। নতুন এলাকায় লোকবসতি শুরু হওয়ার আগে সেখানে রাস্তা বানানো হলো। আমাকে এমনই একটা রাস্তার ধারে খাড়া করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
শুরুতে খুবই ভয় ভয় করত, কারণ তখনো চারপাশে ঘন জঙ্গল। সেখানে খরগোশেরা চরে বেড়ায়। তাদের ধরার জন্য শিয়াল পিছু ধাওয়া করে। হাঁসের পাল বনের ডোবার পাশের ঝোপের আড়ালে ডিম পাড়ে। একসময় সেই ডিম ফুটে ফুটফুটে কোমল তুলতুলে একটা করে বাচ্চা বের হয়। এরপর তারা মায়ের পিছু পিছু প্যারেড করে চলাফেরা করে আর শিশুর মতো কোমল কণ্ঠে প্যাক প্যাক করে। শুনতে আমার বড্ড ভালো লাগে। এভাবেই দিনের অধিকাংশ সময় কেটে যায়।
আমার রুটিন অবশ্য মানুষের চেয়ে একেবারে উল্টো। আমি সারা দিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমাই আর সন্ধ্যা হলেই আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠি। তারপর সারা রাত নিঃসঙ্গ রাস্তা পাহারা দিই। আবার সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ি। আমার দিনগুলো তাই বিমর্ষ আর রাতগুলো নিঃসঙ্গ। মানুষগুলো সারা দিন শুধু দৌড়ায় আর দৌড়ায়। তাদের একটুও অবসর নেই। সেই দৌড় শুরু একেবারে শিশুবয়স থেকেই। শিশুদের তাদের মা–বাবারা শিশু পরিচর্যাকেন্দ্রে দিয়ে কাজে চলে যায়। এরপর একটু বড় হলেই শুরু হয় স্কুল, তারপর তারাও বড়দের মতো জীবনচক্রের ফাঁদে আটকা পড়ে যায়।
আমার দিনগুলো বিমর্ষ, কারণ আমি থাকি ক্লান্ত। আর সেই ক্লান্তি আরও বেড়ে যায় মানুষের দৌড়ঝাঁপ দেখে দেখে। রাতগুলো ভীষণ নিঃসঙ্গ, কারণ মানুষ রাতে বাড়ির বাইরে বের হয় না বিভিন্ন অজুহাতে। শীতের সময় বাইরে ঠান্ডা, গরমের সময় বাইরে গরম পড়ে, এমন শত শত অজুহাত। আবার রাতের বেলায় বাইরে বের হওয়াটা স্বাভাবিক ভদ্রতার বরখেলাপ। মা–বাবারা বসেন টিভি বা মুঠোফোন নিয়ে, আর সন্তানেরা বসে বই–খাতা নিয়ে। বাইরে বের হওয়ার কোনো দরকারও নেই। আর রাতে বাইরে বের হওয়াটা অনেকেই আবার নিরাপদ মনে করেন না।
এভাবেই আমার নিস্তরঙ্গ দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। অবশ্য মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীদের কুকুরগুলো এসে আমার পায়ের কাছে সুসু করে আমাকে কিঞ্চিৎ কাতুকুতু দেওয়ার চেষ্টা করত। এরপর আমার পেছনের বাসায় একটা নতুন পরিবার এল। তার পর থেকে আমার সময়টা বেশ কেটে যাচ্ছে। এই পরিবারের পুরুষ মানুষটার মাথায় মনে হয় ছিট আছে। তার কোনোকিছুই স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে মিলে না। সে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজে চলে যায়। যাওয়ার আগে আমাকে একবার হ্যালো বলে যায়। তখনো আমার হাতলের আলোটা জ্বলছে, কারণ সকাল হতে দেরি আছে।
এরপর সে ফেরে দিনের শেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর। এসেই আমাকে একটা হ্যালো বলে বাসায় ঢুকে পড়ে। তারপর মনে হয় গোসল আর খাওয়া–দাওয়া করে। এরপর বেরিয়ে এসে তার বারান্দায় পা মেলে বসে। বাংলাদেশের গ্রামে দাদি–নানিরা যেই ভঙ্গিমায় বসে পায়ের ওপর নাতি–নাতিনিদের শুইয়ে ঘুম পাড়ায়, অনেকটা সেই ভঙ্গিতে। আর পাশেই মুঠোফোনের পর্দায় ইউটিউবে গান ছেড়ে দেয়। চুপচাপ বসে থাকে সে। আশপাশের পরিবেশ দেখে আর মনে হয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
অস্ট্রেলিয়ার যান্ত্রিক ল্যাম্পপোস্টের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রবাসজীবনের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ও এক মানবের প্রতি তার আন্তরিক পর্যবেক্ষণ।
কখনো কোনো প্রতিবেশী হাঁটতে বের হলে তাদেরও হ্যালো বলে। তবে তার একটা কাজ আমার খুব মজার লাগে। সে বিড়াল দেখলেই তার ডাক নকল করে। সঙ্গে সঙ্গেই বিড়ালটাই বিভ্রান্ত হয়ে ফিরে তাকায়। যতবার সে ডাক দেয় বিড়ালটা ততবারই ফিরে ফিরে তাকায়। মাঝেমধ্যে সে তার মেয়েকে ডেকে নেয়, কারণ মেয়েটার বিড়াল খুবই পছন্দের প্রাণী। অনেক দিন ধরেই আবদার করে আসছে একটা পোষা বিড়ালের, কিন্তু মানুষটা রাজি হয় না কারণ সেটাকে দেখভাল করার মতো সময় কারও নেই।
অস্ট্রেলিয়ার একটি ল্যাম্পপোস্টের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রবাসজীবনের গল্প বলা হয়েছে। পুরুষের অদ্ভুত আচরণ এবং প্রবাসে মানুষদের জীবনের দৈনন্দিন নিয়মকানুনের ভিন্নতাকে তুলে ধরা হয়েছে।
পূর্ণিমা রাত এলেই মনে হয় এই মনুষটা পাগল হয়ে যায়। চাঁদের সঙ্গে তার কত যে কথা হয়, তার হিসাব নেই। সে বলে চাঁদ আর সূর্যই তো তার সবকিছুর সাক্ষী। সে একদিন থাকবে না, কিন্তু চাঁদ–সূর্য ঠিকই পৃথিবীকে এল দিয়ে যাবে। কী অদ্ভুত মানবজীবন। মহাকালের তুলনায় কতই–না ক্ষুদ্র তার ব্যাপ্তি। আর অস্তিত্বের কথা বললে সেটা তো মহাবিশ্বের তুলনায় ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম। আমি তার মনের ভাবটা এখন কিছুটা আঁচ করতে পারি।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আগেই বলেছি এই মানুষটার কর্মকাণ্ড আর দশটা মানুষের মতো নয়। সে এই যে মেঝেতে বসে থাকে, এটা নিয়েও তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। ভদ্রলোকেরা নাকি দোতলার বারান্দায় বসে। নিচতলার বারান্দায় বসাটা নাকি অভদ্রতার লক্ষণ। আমি টের পাই মানুষটার ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে না, কারণ তাকে দেখি সব সময়ই চোখ ডলতে। হয়তো নতুন একটা জায়গায় এসেছে সেই কারণেই। অথবা দোতলায় ঘুমানোর কারণে। কারণ এই মানুষটা খুবই মাটিঘেঁষা মানুষ। সে মাটির গন্ধ নেয়, ঘাসের গন্ধ নেয়, ফুলের গন্ধ নেয়, এগুলো আমার দেখা। সে আমাকে বলেছে, সে কুকুরের গায়ের গন্ধ টের পায়। সে আরও একটা মজার বিষয় বলেছে। সে নাকি প্রতিটা মানুষের শরীর থেকে আলাদা আলাদা গন্ধ পায়।
যাই হোক, সব মানুষ তো এক রকম হয় না। এই মানুষটার পাগলামোগুলো আমার নিস্তরঙ্গ জীবনে কিছুটা হলেও বৈচিত্র্য বয়ে এনেছে। আসলে সব মানুষ একই রকম হলে তো পৃথিবীটা খুবই বিরক্তিকর জায়গা হয়ে যেত। এমন কিছু উড়নচণ্ডী মানুষ ছিল বলেই হয়তো পৃথিবীটা এখনো মনুষ্য বসবাসের উপযোগী আছে। আসলে আধুনিক মানুষ তো নিয়মশৃঙ্খলার জালে বন্দী হয়ে হতাশায় ভুগে। সেখানে নিয়ম ভাঙা এই মানুষগুলো সবাইকে জীবন নিয়ে আশাবাদী করে। নিয়মশৃঙ্খলা ছাড়াও, শত শত অপূর্ণতা নিয়েও এলে বেঁচে থাকা যায়। হোক না সেটা মানুষের জীবন বা ল্যাম্পপোস্টের জীবন।