অস্ট্রেলিয়া পুলিশের ভিডিওতে একুশে ফেব্রুয়ারি

ছবি: অস্ট্রেলিয়া পুলিশের ভিডিও থেকে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণে অস্ট্রেলিয়া পুলিশের একটি বিশেষ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের আবেগাপ্লুত করেছে। ২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবস পালনে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া পুলিশ তাদের সদস্যদের নিজস্ব মাতৃভাষায় প্রিয় কিছু উক্তি শেয়ার করার আহ্বান জানায়। একুশে উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের ও ভাষার কর্মকর্তাদের ভিড়ে যখন পুলিশ সদস্যদের কণ্ঠে তাঁদের মাতৃভাষা ধ্বনিত হলো, তখন মুহূর্তেই বাংলাদেশি প্রবাসীদের হৃদয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ হয়ে আপ্লুত করে।

ভিডিওটিতে দেখা যায়, মঙ্গোলীয়, জার্মান, চীনা, ওলন্দাজ ও পাঞ্জাবি ভাষার পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত সাবলীলভাবে তাঁদের মাতৃভাষায় মনের কথা বলে যাচ্ছেন। কেউ বলছেন, মানবতার শক্তির কথা, কেউবা শৃঙ্খলার গুরুত্ব বা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কথা। বিদেশের মাটিতে পেশাদারত্বের পোশাকে নিজের শিকড়ের এই জয়গান প্রবাসীদের মধ্যে জাতিগত গর্ব ও আত্মপরিচয়ের এক নতুন আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

এই ভিডিওর নেপথ্য গল্প ও দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া পুলিশের ভাবনা জানতে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা হয় তাদের মিডিয়া সেল অফিসার জেন কালিনানের সঙ্গে। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে জেন বলেন, ‘মাতৃভাষা দিবস আমাদের সবার কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউনেসকোর প্রদত্ত তথ্য শিট থেকে আমরা জানি, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বাঙালিরা তাঁদের মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, সেই থেকে একুশে ফেব্রুয়ারির সৃষ্টি। আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার যেসব মানুষ কাজ করছেন, তাঁদের সেই বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া ও শ্রদ্ধা জানানো আমাদের দায়িত্ব।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, প্রত্যেকেরই একটি মাতৃভাষা রয়েছে এবং সেটির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাটা অত্যন্ত মর্যাদাকর।

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া পুলিশের এই চমৎকার উদ্যোগটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। ফেসবুকে ভিডিওটির নিচে মন্তব্য করতে গিয়ে সিডনিপ্রবাসী সুরজিৎ রায় লিখেছেন, ‘কমিউনিটির সঙ্গে এমন সম্পৃক্ততা সত্যিই চমৎকার। বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ এই অস্ট্রেলিয়ার সিডনির অ্যাশফিল্ড পার্কেই ২০০৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি উন্মোচন করা হয়েছিল। একুশে একাডেমি অস্ট্রেলিয়ার এই মহৎ উদ্যোগ ১৯৫২ সালের ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি ইউনেসকো ঘোষিত ২১ ফেব্রুয়ারির গুরুত্বকে বিশ্বদরবারে সমুন্নত রেখেছে।’

আরেক প্রবাসী বাংলাদেশি বোরহান খান লিমন তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ যখন আমাদের প্রাণের একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করে, তখন মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আমি সিডনিতে নেই; বরং একটুকরা বাংলাদেশের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের মাতৃভাষার চেতনা আজ বিশ্বজনীন এবং এই ভিডিও তার এক বলিষ্ঠ প্রমাণ। ভাষাশহীদদের রক্তে কেনা এই মর্যাদা যখন বিদেশের মাটিতে এভাবে সম্মানিত হয়, তখন আমাদের বুক গর্বে ভরে ওঠে।’

অস্ট্রেলিয়ার মতো বহু সংস্কৃতির দেশে বাংলা ভাষার এই উদ্‌যাপন কেবল একটি ভিডিওর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা বিশ্বমঞ্চে একুশে ফেব্রুয়ারির ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।