অণুর ভাষায় লেখা জীবন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলপ্রথম আলো ফাইল ছবি

সময় বহমান—দ্রুত, নিরবচ্ছিন্ন, অদম্য তার গতি। ১৯৮৮-৮৯ সাল—মনে হয় যেন এই তো সেদিনের কথা। অথচ আজ থেকে প্রায় ৩৬-৩৭ বছর আগের সেই সময়, যখন প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন আমার পৃথিবী ছিল ছোট, সীমাবদ্ধ—লর্ড কার্জন হল, শহীদুল্লাহ হল, বন্ধুদের সঙ্গে নিরুদ্বেগ আড্ডা, আর কিছু ভাবগম্ভীর বইয়ের পাতা—মরিসন এন্ড বয়েড, আই এল ফাইনার, সলোমন্সের অর্গানিক কেমিস্ট্রি, অ্যাটকিনস, হক এন্ড নওয়াব স্যারের ভৌত রসায়ন, কিংবা এস জেড হায়দার স্যারের অজৈব রসায়নের টেক্সট বুক। পাতার পর পাতা উল্টে শিখছিলাম রসায়নের সূত্র, বিক্রিয়া, আণবিক গঠন—কিন্তু তখনো বুঝিনি, রসায়ন শুধু কার্জন হলের পরীক্ষাগারের লাল ইটের দেয়ালের মধ্যে বন্দী নয়; রসায়ন আসলে জীবনেরই নিজস্ব ভাষা।

তখন রসায়ন মানে ছিল equations, reagents, yield—আর মাঝে মাঝে সফল বা ব্যর্থ experiment-এর গল্প। কিন্তু আজ ফিরে তাকালে স্পষ্ট বুঝি—সেই সময়ে শেখা প্রতিটি ধারণাই ছিল জীবনের গভীরতর এক reaction mechanism-এর প্রাথমিক পরিচয়। জীবন নিজেই এক বিশাল, জটিল, self-regulated chemical system—যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে synthesis, degradation, transformation আর equilibrium-এর সূক্ষ্ম খেলা চলছে।

ছাত্রজীবনে ‘nucleic acid’ শব্দটি হয়তো শুনেছি, কিন্তু তার ভেতরের বিস্ময় তখন অনুভব করিনি। বুঝিনি, ডিএনএ আর আরএনএ নামের এই অণুগুলোই জীবনের মৌলিক নকশা বহন করে। জিনোমিক ডিএনএর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র base—adenine, thymine, cytosine, guanine—তিনটি করে সাজিয়ে তৈরি করে genetic code, যা নির্ধারণ করে amino acid আর সেই code-ই গড়ে তোলে আমাদের শারীরিক গঠন, বৈশিষ্ট্য, এমনকি আচরণের গভীর প্রবণতাও।

আজ বুঝি, ডিএনএ থেকে transcription প্রক্রিয়ায় messenger আরএনএ তৈরি হয়, আর সেই mRNA translation-এর মাধ্যমে protein-এ রূপান্তরিত হয়—এই প্রোটিনই আমাদের জীবনের মৌলিক ভিত্তি। তখন এসব জানা ছিল না। জানতাম না, প্রতিটি কোষে মা ও বাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত জিন পাশাপাশি বিরাজ করে তাদের সম্মিলিত বিন্যাসেই তৈরি হয় সেই অনন্য ডিএনএ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জীবনের ধারাবাহিকতা বহন করে চলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে হেঁটে বেড়ানোর সময় এসব গভীরতা অনুভব করিনি। কিন্তু জীবন ধীরে ধীরে তার নিজস্ব গোপন সূত্র উন্মোচন করেছে। বুঝতে শিখেছি—DNA replication, transcription, translation—এসব শুধু পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয়, এগুলো আমাদের প্রতিটি কোষে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা জীবনের মৌলিক প্রতিক্রিয়া। প্রতি সেকেন্ডে, প্রতি মুহূর্তে, আমাদের দেহে অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়া চলমান—নিশ্বাসে, রক্তপ্রবাহে, চিন্তায়, এমনকি স্মৃতির গঠনে।

অধ্যাপক এম এ জব্বার এবং এম মসিহুজ্জামান স্যার যখন ব্ল্যাকবোর্ডে cis এবং trans structure এঁকে বোঝাতেন, তখন সেটি ছিল স্টেরিওকেমিস্ট্রির একটি পাঠ মাত্র। কিন্তু আজ মনে হয়—জীবনের পথও যেন কখনো cis, কখনো trans—কখনো সরল, কখনো বক্র, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট স্থিতির দিকে ধাবিত।

নীলুফার ম্যাডাম যখন enantiomer ও diastereomer-এর পার্থক্য বোঝাতেন, তখন তা মনে হতো এক বিস্ময়কর জ্যামিতিক খেলা। আজ উপলব্ধি করি, মানুষের জীবনও অনেকটা enantiomer-এর মতো—দেখতে মিল, কিন্তু অনুভবে ভিন্ন আবার কখনো diastereomer—আংশিক মিল, আংশিক অমিল, তবু নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যে অনন্য।

অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ স্যার যখন sugar chemistry পড়াতেন, তখন ribose বা deoxyribose ছিল কেবল একটি structure। আজ জানি, এই sugar-ই DNA ও RNA-র backbone—জীবনের কাঠামোগত স্তম্ভ। অধ্যাপক আবদুল আজিজ স্যার যখন heterocyclic chemistry পড়াতেন, তখনো ভাবিনি যে—adenine, guanine, cytosine আর thymine-এর মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র heterocyclic base-গুলোর ওপরই গড়ে উঠেছে আমাদের অস্তিত্বের সমগ্র কোড। বিস্ময় তখন ছিল বিষয়ের মধ্যে আজ তা জীবনের মধ্যে—অনেক গভীরে।

আমার আরেক প্রিয় শিক্ষিকা রাহিনা মাহতাব ম্যাডাম। তাঁর reaction mechanism বোঝানোর ভঙ্গি ছিল সত্যিই অনন্য। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম—ইলেকট্রনের সূক্ষ্ম গতিপথ তিনি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতেন, যেন প্রতিটি বিক্রিয়ার পেছনে একটি সুস্পষ্ট নীতি কাজ করছে। তখন কতটুকু বুঝতাম জানি না, কিন্তু আজ উপলব্ধি করি—রসায়ন আসলে নিয়মতান্ত্রিক সৌন্দর্যের এক অসাধারণ প্রকাশ। এ রকম কত স্মৃতিই না এখনো মনের ভেতরে জীবন্ত হয়ে আছে।

আমাদের সময় কোষের ভেতরের জগৎ—নিউক্লিয়াস, সাইটোপ্লাজম, এন্ডোসোম, লাইসোসোম—এসব নিয়ে খুব গভীরে আলোচনা হতো না। ফলে কোষের ভেতরের সূক্ষ্ম রসায়ন অনেকটাই অজানা ছিল। আজ জানি, ‘endosomal escape’ হলো nucleic acid delivery-এর এক জটিল কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যার সমাধান আসে রসায়নের হাত ধরেই—molecular design, lipid nanoparticle বা smart delivery system-এর মাধ্যমে।

আধুনিক বিজ্ঞানের এক অসাধারণ আবিষ্কার হচ্ছে CRISPR-Cas9 সিস্টেম—যেখানে একটি এনজাইম জিনোমের নির্দিষ্ট স্থানে DNA কেটে দেয়, আর কোষের নিজস্ব repair mechanism সেটিকে পুনর্গঠন করে। এটি যেন জীবনের নিজস্ব chemical editing tool। Genetic disease-এর উৎপত্তি ও নিরাময়ের পথ—সবকিছুর গভীরে এই molecular chemistry নীরবে কাজ করে চলেছে।

আমি কখনোই নিজেকে খুব ভালো ছাত্রের কাতারে ধরে রাখতে পারিনি। তবু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ আমাকে শিখিয়েছে—কীভাবে অণুর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কল্যাণে নতুন পথ খুঁজে নেওয়া যায়—ড্রাগ ডিসকোভারি। রসায়ন আমাকে শিখিয়েছে প্রশ্ন করতে, experiment করতে, পর্যবেক্ষণ করতে—আর অদৃশ্যের মধ্যে সত্য খুঁজে নিতে।

আজ ভাবলে হাসি পায়—প্রিয় শিক্ষক মসিহুজ্জামান স্যারের ল্যাবরেটরিতে কতবার যে test tube বা beaker ভেঙেছি, কতবার স্যারের চোখ ফাঁকি দিয়ে টিএসসিতে আড্ডা দিয়েছি, বন্ধুদের সঙ্গে টাংকি মেরেছি! কিন্তু হয়তো সেই ভুলগুলোও ছিল learning curve-এর অংশ—reaction pathway-এর অপরিহার্য intermediate, যাকে পেরিয়ে না গেলে চূড়ান্ত product-এ পৌঁছানো যায় না।

আমার অনেক সহপাঠী আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রসায়নের হাত ধরেই এগিয়ে চলেছে। আমিও সেই ধারারই একটি অংশ। রসায়ন শুধু পেশা দেয়নি দিয়েছে চিন্তার একটি কাঠামো—যেখানে প্রতিটি সমস্যা একটি reaction, প্রতিটি সমাধান একটি product, আর প্রতিটি ব্যর্থতা একটি incomplete reaction, যা আবার নতুন করে শুরু করা যায়।

কিছুদিন আগে নিউইয়র্কে মসিহুজ্জামান স্যারের সঙ্গে দেখা হলো। বয়স আশির কোঠায়, তবু চোখের দৃষ্টি ও কথার উদ্দীপনায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। স্যারের সহধর্মিণীও সঙ্গে ছিলেন। আমরা কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্র মিলে জ্যাকসন হাইটসে তাঁর সঙ্গে শ্রেষ্ঠ এক সময় কাটালাম। মনে হলো, কিছু bond কখনো ছেঁড়ে না, ভাঙে না—সময় বা দূরত্ব তাদের disrupt করতে পারে না। এগুলো যেন স্থায়ী covalent bond-এর মতোই অটুট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে আজও মনে পড়ে। তাঁরা হয়তো সামনে নেই, কিন্তু তাঁদের প্রভাব এখনো আমার ভেতরে active catalyst-এর মতো কাজ করে—নীরবে, অদৃশ্যভাবে, কিন্তু গভীর ও স্থায়ীভাবে।

আজ যখন জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, দেখি—এটি কোনো স্থির কাঠামো নয়, এটি এক চলমান বিক্রিয়া। কোথাও bond তৈরি হচ্ছে, কোথাও ভাঙছে কোথাও mutation, কোথাও repair কোথাও instability, কোথাও নতুন equilibrium-এর সন্ধান।

রসায়নের করিডর পেরিয়ে সেই টগবগে লিকলিকে তরুণ আমি আজ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সূর্যোদয়ের দেশ জাপান হয়ে সূর্যাস্তের দেশ আমেরিকার গবেষণাগারে এসে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু আমার ভেতরের বিস্ময় এখনো অক্ষত। কারণ, শেষ পর্যন্ত রসায়ন আমাকে শিখিয়েছে—জীবনকে বুঝতে হলে, তার অণুর ভাষা বুঝতে হয়।

আর একবার সেই ভাষা শিখে গেলে—জীবন, মানুষ, সম্পর্ক, এমনকি দূরদেশের অভিজ্ঞতাও—সবকিছুই নতুন করে পড়া যায়, নতুন করে বোঝা যায়।

লেখক: কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]