এর চেয়ে বেশি ভালোবাসা যায় না
জ্ঞান, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ঐশ্বর্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়া এক মানবিক দেশ—দক্ষিণ কোরিয়া। আমার চাকরিজীবনের প্রায় পুরো সময়টাই কেটেছে এই দেশে। খুব কাছ থেকে দেখেছি তাদের মানুষগুলোকে—ধনসম্পদের মালিক হয়েও কতটা বিনয়ী, কতটা সৎ, কতটা মানবিক!
হিংসা নেই, অহংকার নেই—শুধুই ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ আর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা।
শিল্পসমৃদ্ধতায় জাপানের পরেই দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান। অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তির বিস্ময়, কঠোর পরিশ্রম আর সময়ের নিখুঁত মূল্যায়ন—এসবের সমন্বয়ে দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উন্নত রাষ্ট্র।
কিন্তু তাদের আসল শক্তি সম্পদে নয়, চরিত্রে।
কোনো ব্যাংক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে গেলে আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম—কেউ কারও আগে যাওয়ার চেষ্টা করে না, লাইনে দাঁড়ানো যেন তাদের রক্তে মিশে আছে। পেশিশক্তি নয়, নিয়মই সেখানে শেষ কথা।
নিজের দেশের কিছু মানুষের আচরণ তখন কষ্ট দিত—বিদেশের মাটিতেও নিয়ম ভাঙার সেই প্রবণতা দেখে মনটা ভারী হয়ে যেত।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাসে ড্রাইভার ছাড়া আর কেউ থাকে না। যাত্রী নিজে উঠে মেশিনে ভাড়া দেয়। খুচরা টাকা না থাকলেও সমস্যা নেই—মেশিন নিজেই বাকি টাকা ফেরত দেয়।
শৃঙ্খলা যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনের নীরব অভ্যাস।
হাসপাতালেও একই চিত্র। চিকিৎসকের সহকারী নেই, অপ্রয়োজনীয় ভিড় নেই। নির্দিষ্ট স্থানে ফি পরিশোধ করে চেম্বারের সামনে বসলে স্ক্রিনে নিজের নাম ও সিরিয়াল ভেসে ওঠে। সবকিছু স্বচ্ছ, সুন্দর, নিয়মতান্ত্রিক।
আমি তখন আনসান শহরে কর্মরত। হঠাৎ শারীরিক কিছু সমস্যা দেখা দিলে আনসান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হই। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি ছোট অপারেশনের পরামর্শ দিলেন। একদিন হাসপাতালে থাকতে হবে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, নীরব, সুশৃঙ্খল সেই হাসপাতালের পরিবেশ আজও চোখে ভাসে।
ভোরে নার্সরা দায়িত্ব নিয়ে ডিউটি শুরু করলেন। আমাকে হালকা খাবার দেওয়া হলো।
রাত আটটায় অপারেশন। ডাক্তার অপারেশনের ফাঁকে ফাঁকে সাবলীল ইংরেজিতে কথা বলছিলেন, আমার ভয় দূর করছিলেন—কতটা আন্তরিক হলে এমন হয়!
অপারেশনের পর আট ঘণ্টা সোজা হয়ে শুয়ে থাকতে হবে—নড়াচড়া করা যাবে না।
এর মধ্যে আর কোনো খাবার দেওয়া হয়নি। প্রচণ্ড ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছিলাম। একজন নার্সকে বললাম, কিন্তু তিনি ভীষণ ব্যস্ত। বুঝলাম, সময় লাগবে।
ঠিক তখন পাশের বেডের এক বৃদ্ধ কোরিয়ান ভদ্রলোক—যাকে তারা ‘হারাবুজি’ বলে—আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
ভাষা বুঝি না, তবু তার চোখের ভাষা বুঝেছিলাম।
তিনি নিজ হাতে ভাত তুলে আমার মুখে দিলেন।
বিদেশবিভুঁইয়ে, অচেনা এক দেশে, একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ আমাকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করলেন।
আমার চোখ ভিজে উঠেছিল।
মনে মনে ভাবছিলাম—মানুষ এত ভালো হয় কীভাবে?
আজও সেই দৃশ্য মনে পড়লে কোরিয়ানদের প্রতি আমার সম্মান বেড়ে যায়, মাথা নত হয়ে আসে কৃতজ্ঞতায়।
পৃথিবীতে উন্নত দেশ অনেক আছে, ধনী দেশও আছে—কিন্তু হৃদয়ে মানবতা ধারণ করতে পারা দেশ খুব বেশি নেই।
দক্ষিণ কোরিয়া আমার কাছে শুধু একটি দেশ নয়—এটি মানবতার এক উজ্জ্বল পাঠশালা।
সত্যিই, এর চেয়ে বেশি ভালোবাসা যায় না।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]