শারদপ্রাতে কেমব্রিজ দেখা
ছোটবেলায় সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার গল্প কে পড়েনি? লন্ডনে ফেলুদা গল্প পড়ে কেমব্রিজ শহর দেখার শখ হয়নি, এমন মানুষ পাওয়া যাবে না বোধ হয়। সেই কেমব্রিজ–যাত্রায় বইয়ের পাতার প্রতিটা লাইন যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল। ব্রিটেনের শরৎ আমার ভীষণ প্রিয়। গাছের সবুজ পাতাগুলো ধীরে ধীরে হলুদ, কমলা আর লালচে রং ধারণ করে, ঝরে পড়া পাতায় ঢেকে যায় পথঘাট—প্রকৃতির এই রংবদল আমাকে বরাবরই টানে। তাই শরতের এই সময়ে খুব সকালে কেমব্রিজ দেখতে চলে গেলাম।
সুন্দর শহর কেমব্রিজ। সেখানে ইউনিভার্সিটি দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে। পাশাপাশি অনেকগুলো কলেজ। বিখ্যাত ট্রিনিটি কলেজ, কিংস কলেজ দেখে আশ্চর্যই হতে হয়। শত শত বছরের পুরোনো কলেজগুলো কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, কিন্তু আধুনিকতার জন্য ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ভেঙে সেখানে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়নি; বরং ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার এই চেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়।
ক্যাম নদীতে পান্টিং—
রিভার ক্যামে পান্টিং করার সময় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। যদিও মনে মনে ভাবছিলাম, আমি পদ্মা–যমুনার দেশের মানুষ। আমার কাছে নদীর সংজ্ঞা আলাদা। খরস্রোতা নদী দেখে অভ্যস্ত আমি। কিন্তু ক্যাম নদী আমাকে মুগ্ধ করল অন্য কারণে। পান্টিং করতে করতে চোখে পড়ল না কোনো প্লাস্টিকের স্ট্র কিংবা চিপসের প্যাকেট। নদীর বুকে নেই ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ, নেই যান্ত্রিক কোলাহল। নৌকার দাঁড়ের মৃদু শব্দ আর চারপাশের স্নিগ্ধ পরিবেশের মধ্যে নদীটিকে যেন তার নিজের মতো করে বেঁচে থাকতে দেওয়া হয়েছে। নৌকা বাইতে বাইতে নৌকাচালক বলে চললেন কলেজগুলোর প্রাচীন ইতিহাস। একের পর এক উঠে আসছিল বিখ্যাত সব মানুষের নাম, গবেষণা, আবিষ্কার আর নোবেলজয়ীদের কথা। এই নদীর দুই ধারে শুধু ইট-পাথরের প্রাচীন ভবন দাঁড়িয়ে নেই; দাঁড়িয়ে আছে শত শত বছরের জ্ঞানচর্চা, কৌতূহল আর মানুষের অসাধারণ সব অর্জনের স্মৃতি।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ফিটজউইলিয়াম মিউজিয়াম—
কেমব্রিজের সৌন্দর্য শুধু তার ঐতিহাসিক কলেজ, পাথুরে পথ কিংবা ক্যাম নদীর শান্ত পানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। শহরটির আরেকটি পরিচয় লুকিয়ে আছে তার জাদুঘর ও শিল্পের সংগ্রহে। বাইরের স্থাপত্যের আভিজাত্য পেরিয়ে ফিটজউইলিয়াম মিউজিয়ামের ভেতরে ঢুকলে মনে হয়, যেন এক ছাদের নিচে এসে মিলেছে ইতিহাসের নানা অধ্যায়। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন থেকে শুরু করে ইউরোপীয় আর্টের কালজয়ী প্রতিটি সংগ্রহই নিয়ে যাবে অন্য এক সময়ে, ভিন্ন এক জগতে।
ইতালীয় ও উত্তর ইউরোপীয় রেনেসাঁসের শিল্পকর্ম দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ইতিহাসকে জানার জন্য সব সময় বোধ হয় বইয়ের পাতা ওলটাতে হয় না। সান্দ্রো বত্তিচেল্লি, তিতিয়ান, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলেঞ্জেলো কিংবা তিন্তোরেত্তোর মতো শিল্পীদের নাম শিল্পকর্মের ইতিহাসে যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের জন্য এমন সংগ্রহের সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে অন্য রকম। শিল্পকর্মের রংতুলি, রেখা, অবয়ব আর সূক্ষ্মতার মধ্যে ধরা পড়ে তাঁদের সময়ের মানুষের জীবন বোধ, বিশ্বাস, সৌন্দর্যচিন্তা ও কল্পনার জগৎ। ফিটজউইলিয়াম মিউজিয়ামে এসে তাই শুধু বিখ্যাত কিছু শিল্পকর্ম দেখাই হয় না, একই সঙ্গে উপলব্ধিও করা যায় যে মানুষের সৃজনশীলতা কীভাবে সময় ও ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নিজের ভাষা তৈরি করে নেয়।
হাঁটতে হাঁটতে ক্যামব্রিজকে চেনা—
ট্রিনিটি কলেজের লাইব্রেরি দেখে ভেতরটা ফাঁকা লাগছিল, কত ছোট আমাদের জীবন, অথচ জানার কত কিছু বাকি! ছোটবেলায় আপেল পড়ে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কারের গল্প শুনেছি। ট্রিনিটি কলজের সামনে দেখতে পেলাম নিউটনের সেই বিখ্যাত আপেলগাছ। এই গাছ নিউটনের শৈশবের বাড়ি উল্সথর্প ম্যানরের মূল আপেলগাছ থেকে কলমের মাধ্যমে তৈরি।
কেমব্রিজ সিটি সেন্টারে ওপেন মার্কেটে অনেক রকমের দোকান রয়েছে। হালাল খাবার থেকে শুরু করে সুভ্যেনির সবকিছুই আছে। অনেক পর্যটকও দেখতে পেলাম। বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের ভিড়ে বোঝা যায়, শহরটি শুধু শিক্ষার্থী বা গবেষকদের নয়, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষেরও আকর্ষণের কেন্দ্র। বাঙালি যেখানেই যাক, বিকেলে চা তো আবশ্যক। ওপেন মার্কেটেই একটি থাই মেয়ের স্টল পেলাম। ইনস্টাগ্রামে ফ্রেশ অরগানিক মধু আর লেবু দিয়ে বানানো তাঁর চা আর লেমনেডের বেশ নাম শুনেছি। হানি লেমন-টিতে একটি চুমুক দিয়েই ক্লান্তি কিছুটা দূর হলো।
সন্ধ্যা ৬টার ভেতরে সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শহরের চেহারা বদলে যেতে থাকে। দিনের ব্যস্ততা কমে আসে, দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করে, পর্যটকের ভিড়ও কমতে থাকে। সব হট্টগোল থেমে পুরো শহর আস্তে আস্তে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কেমব্রিজের পুরো শহরটাই যতটা সম্ভব হেঁটে ঘুরে দেখার চেষ্টা করেছি। ইউরোপের শহরগুলোতে মানুষকে অনেক হাঁটতে দেখা যায়। হাঁটতে হাঁটতেই যেন শহরের অলিগলি, স্থাপত্য আর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায় আরও কাছ থেকে। সেদিন আমারও প্রায় ২৭ হাজার স্টেপ হাঁটা হয়েছিল। কখনো প্রাচীন কলেজের সামনে থেমেছি, কখনো দোকানপাটে চোখ বুলিয়েছি, আবার কখনো উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। ক্লান্তি ছিল, কিন্তু নতুন একটি শহরকে পায়ে হেঁটে আবিষ্কার করার আনন্দও ছিল।
কেমব্রিজ থেকে লন্ডন ফেরার পথে ট্রেনে বসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম, সব তো দেখা হলো না! এটাই হয়তো ভ্রমণের সৌন্দর্য। কিছুটা অজানাই রয়ে যায় আবার ফিরে আসার অজুহাত হয়ে।হাঁটতে হাঁটতে ক্যামব্রিজকে চেনা—
ট্রিনিটি কলেজের লাইব্রেরি দেখে ভেতরটা ফাঁকা লাগছিল, কত ছোট আমাদের জীবন, অথচ জানার কত কিছু বাকি! ছোটবেলায় আপেল পড়ে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কারের গল্প শুনেছি। ট্রিনিটি কলজের সামনে দেখতে পেলাম নিউটনের সেই বিখ্যাত আপেলগাছ। এই গাছ নিউটনের শৈশবের বাড়ি উল্সথর্প ম্যানরের মূল আপেলগাছ থেকে কলমের মাধ্যমে তৈরি।
কেমব্রিজ সিটি সেন্টারে ওপেন মার্কেটে অনেক রকমের দোকান রয়েছে। হালাল খাবার থেকে শুরু করে সুভ্যেনির সবকিছুই আছে। অনেক পর্যটকও দেখতে পেলাম। বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের ভিড়ে বোঝা যায়, শহরটি শুধু শিক্ষার্থী বা গবেষকদের নয়, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষেরও আকর্ষণের কেন্দ্র। বাঙালি যেখানেই যাক, বিকেলে চা তো আবশ্যক। ওপেন মার্কেটেই একটি থাই মেয়ের স্টল পেলাম। ইনস্টাগ্রামে ফ্রেশ অরগানিক মধু আর লেবু দিয়ে বানানো তাঁর চা আর লেমনেডের বেশ নাম শুনেছি। হানি লেমন-টিতে একটি চুমুক দিয়েই ক্লান্তি কিছুটা দূর হলো।
সন্ধ্যা ৬টার ভেতরে সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শহরের চেহারা বদলে যেতে থাকে। দিনের ব্যস্ততা কমে আসে, দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করে, পর্যটকের ভিড়ও কমতে থাকে। সব হট্টগোল থেমে পুরো শহর আস্তে আস্তে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কেমব্রিজের পুরো শহরটাই যতটা সম্ভব হেঁটে ঘুরে দেখার চেষ্টা করেছি। ইউরোপের শহরগুলোতে মানুষকে অনেক হাঁটতে দেখা যায়। হাঁটতে হাঁটতেই যেন শহরের অলিগলি, স্থাপত্য আর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায় আরও কাছ থেকে। সেদিন আমারও প্রায় ২৭ হাজার স্টেপ হাঁটা হয়েছিল। কখনো প্রাচীন কলেজের সামনে থেমেছি, কখনো দোকানপাটে চোখ বুলিয়েছি, আবার কখনো উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। ক্লান্তি ছিল, কিন্তু নতুন একটি শহরকে পায়ে হেঁটে আবিষ্কার করার আনন্দও ছিল।
কেমব্রিজ থেকে লন্ডন ফেরার পথে ট্রেনে বসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম, সব তো দেখা হলো না! এটাই হয়তো ভ্রমণের সৌন্দর্য। কিছুটা অজানাই রয়ে যায় আবার ফিরে আসার অজুহাত হয়ে।