আমি আমার শিশুকাল না হয় পার করলাম মা-বাবা, শিক্ষক বা পারিপার্শ্বিক সাহায্যের মধ্য দিয়ে। পরে কৈশোরে তো আমার নিজের মধ্যে নানাভাবে পরিবর্তনের ইঙ্গিত আসতে শুরু করল। সেটার বেশির ভাগই হরমোনঘটিত, যেমন যৌনতা তার মধ্যে একটি। শরীরে যৌনতার ভাব এসেছে ভাবা যাবে, কিন্তু কিছু করা যাবে না। যৌনতাকে চেপে মারা হলো, জীবন গড়তে ভবিষ্যতের চিন্তা করে বর্তমানের চাহিদার জলাঞ্জলি দেওয়া হলো। পরে ভবিষ্যতে গিয়ে অতীতে যেসব চাহিদার আবির্ভাব এসেছিল, সেগুলো করার নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলো, যেমন বিয়ে করা। যৌবনের ঢেউয়ের যে অভিজ্ঞতা, সেটা পরবর্তী সময়ে কেমন হতে পারে, তা বুঝতে হলে অভিজ্ঞতা থাকা দরকার ছিল। কিন্তু সেটা না থাকার মানে, সময়ের কাজ অসময়ে করলে যা হয়, তা-ই হলো। যেমন ধরুন, যে দই এবং ঘোল পৃথক পৃথকভাবে খেয়েছে, তাকে যদি ঘোল দিয়ে বলা হয় এটা দই, কী হবে? সে বলবে, না, এটা দই না। না না, দইয়ের সাধ ঘোল দিয়ে মেটানো যাবে না। কিন্তু যে জীবনে দই ও ঘোল এর কোনোটাই খাইনি, তার কাছে সে কী খেল আর কী পেল, কিছু যায়-আসে না। মানে কী দাঁড়াল, যখন যেটা, সেটা না করলে বা করতে না পারলে পরে যতই করি না কেন, মনে হবে ‘সাধ না মিটিল আশা না পুরিল, শুধু সময় ফুরিয়ে গেল’! আমরা মূলত যখন যেটা, সেটা না করে বা বর্তমানকে ভুলে গিয়ে অতীতের পেছনে দৌড়াই। আমরা যা নেই, তার জন্য ব্যস্ত থাকার কারণে যা আছে, তা উপভোগ করতেও ভুলে যাই।

আমরা স্মৃতি ঘাঁটতে পছন্দ করি এবং আমরা কল্পনা করতে ভালোবাসি। আমরা পুরোনো প্রেমের কথা নিয়ে বাঁচতে চাই, আমরা ব্যর্থ প্রেমে ব্যথিত হতে পছন্দ করি। আমরা জীবনে দীপ জ্বালাতে না পারলেও সমাধির পরে দীপ জ্বালাতে চেষ্টা করি।

আমার ভাবনা থেকে কিছু কথা, এ কথাগুলো হয়তো এভাবে বলা হতো না, যদি আমি বাংলাদেশে আমার জীবনটা কাটাতাম। কারণ, আমি তখন দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতাম। যেহেতু আমি ৪০ বছরের মতো পাশ্চাত্যের আলো-বাতাসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি, সেহেতু আমার এই পরিবর্তন। জানি না আমার চিন্তাচেতনা সবার কাছে ভালো লাগবে কি না! তবু এতটুকু বলব, পাশ্চাত্যের সমাজ চেষ্টা করে জীবনকে উপভোগ করতে ‘হেয়ার অ্যান্ড নাও’ কনসেপ্টের ওপর। তারা যখনকার কাজ তখনই করে, যেমন যৌবনের বিলাসিতা বার্ধক্যে করে না বা সঞ্চয়ে শুধু ভবিষ্যতের চিন্তা করে না। তারা ছুটিতে দেশ-বিদেশ ঘোরে, ভালো-মন্দের সঙ্গে নিজেদের যুগোপযোগী করে খাপ খাইয়ে নেয়। ফলে দেখা যায়, তাদের মনে দুশ্চিন্তা ততটা বাসা বাঁধে না, যতটা বাঁধে আমাদের সমাজে। দুর্নীতি বা অনীতি তাদের ততটা গ্রাস করতে পারে না।

সর্বোপরি, মরতে তো একদিন হবেই। এটা মনে করে বাকি জীবনটা ধ্বংস করে না। কারণ, এরা পুরো জীবনটাকে পজেটিভভাবে দেখে। তাদের মতে, মৃত্যুটা মাত্র এক দিনের বা এক মুহূর্তের জন্য, কিন্তু জীবনটা পুরো সময়টা নিয়ে। আমি নিজেও এখন চেষ্টা করি স্মৃতি এবং কল্পনার মাঝের সময়টুকুর সঠিক ব্যবহার করতে।
জীবন কখনোই একই রকম যায় না, জীবন বদলায়, আমিও..!