৬০ বছর বয়সে আবার স্নাতক ডিগ্রি নিলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী জহুরুল হক

স্নাতক (গ্র্যাজুয়েশন) সনদ হাতে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি সৈয়দ জহুরুল হকছবি: প্রথম আলো

শিক্ষার যে নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই, তা আরও একবার প্রমাণ করলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি সৈয়দ জহুরুল হক। দীর্ঘ কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব ও কমিউনিটির নানা কাজে সক্রিয় থাকার পরেও দমে যাননি তিনি। বরং ৬০ বছর বয়সে স্নাতক (গ্র্যাজুয়েশন) সম্পন্ন করে অদম্য আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

১৯৬৫ সালে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর গ্রামে জহুরুল হকের জন্ম। তিনি আধ্যাত্মিক সাধক ও মরমি কবি পীর সৈয়দ শাহনূর (রহ.)-এর পঞ্চম বংশধর। তাঁর বাবা সৈয়দ নূরুল হক (সুফি মিয়া মাস্টার) ছিলেন স্বনামধন্য শিক্ষক। ফলে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষানুরাগী এক পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠেন তিনি।

জহুরুল হকের শিক্ষাজীবনের শুরু জগন্নাথপুর উপজেলার উত্তর সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (স্থানীয়ভাবে যা ‘পীরবাড়ি স্কুল’ নামে পরিচিত)। পরে সৈয়দপুর মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর সৈয়দপুর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি ও বিএসসি সম্পন্ন করেন। পরে সিলেট ল কলেজে এলএলবি অধ্যয়ন শুরু করলেও যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোয় তা আর শেষ করা হয়ে ওঠেনি।

জহুরুল হকের কর্মজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। প্রথমে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নিজ এলাকার বিদ্যালয়ে পাঠদান করেন। পরে সৈয়দপুর ফাজিল মাদ্রাসা ও শাহারপাড়া শাহকামাল উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এরপর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে ছাতক ও জগন্নাথপুর উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

১৯৯৩ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান জহুরুল হক। লন্ডনে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে তাঁর নতুন জীবন শুরু হয়। শুরুর দিকে রেস্তোরাঁয় কাজ করলেও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ কখনো হারাননি। একপর্যায়ে সাংবাদিকতায় যুক্ত হন এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক সিলেটের ডাক’ পত্রিকায় কাজ করেন। পরে তিনি চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টের অধীন ‘ডিপ্লোমা ইন পাবলিক সার্ভিস ইন্টারপ্রিটিং’ সম্পন্ন করেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের আদালত, ট্রাইব্যুনাল, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সার্টিফায়েড ট্রান্সলেটর ও ইন্টারপ্রিটর (দোভাষী) হিসেবে কাজ করছেন।

ব্যস্ত পেশাজীবন, পরিবার ও কমিউনিটির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের বহুদিনের অপূর্ণ স্বপ্নটি ভুলে যাননি জহুরুল হক। মনের কোণে লালিত সেই স্বপ্ন পূরণে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। দীর্ঘ চার বছর অধ্যয়ন শেষে সম্প্রতি কেন্টারবেরি ক্রাইস্ট চার্চ ইউনিভার্সিটি থেকে ‘বিজনেস অ্যান্ড ট্যুরিজম’-এর ওপর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

পারিবারিক জীবনেও সফল এই প্রবাসী। চার কন্যা ও এক পুত্রের জনক সৈয়দ জহুরুল হক তাঁর সন্তানদেরও উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করেছেন। তাঁর বড় দুই সন্তান ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত।

নিজের এই সাফল্য প্রসঙ্গে সৈয়দ জহুরুল হক বলেন, ‘শিক্ষা আমার পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। জীবনের নানামুখী বাস্তবতায় আগে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার সুযোগ পাইনি। কিন্তু এই ইচ্ছাটাকে কখনো হারিয়ে যেতে দিইনি, সব সময়ই লালন করেছি। ষাট বছর বয়সে এসে যখন সুযোগ পেলাম, তখন আর তা হাতছাড়া করলাম না।’

জহুরুল হক মনে করেন, শিক্ষা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং শেখার যাত্রা কখনো শেষ হয় না।