ওউলুতে দুর্গোৎসব: বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে বহুসংস্কৃতির সেতুবন্ধ

সিঁদুরখেলার পূর্বমুহূর্তছবি: মো. তারেকুজ্জামান

ইউরোপের উত্তরে, ফিনল্যান্ডের ওউলু শহরে শরতের হিমেল হাওয়ায় যখন প্রকৃতি ধীরে ধীরে শীতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এক দিনের জন্য সেখানে যেন জেগে উঠেছিল বাংলার উৎসবের রং, ঢাকের ছন্দ, প্রার্থনা আর সম্প্রীতির আবহ। দেবী দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে ২৪ অক্টোবর ওউলুতে অনুষ্ঠিত হলো দুর্গাপূজা ও সাংস্কৃতিক উৎসব। তবে এই আয়োজনের তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির শিকড়কে ধরে রাখা এবং নানা দেশের, নানা ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয় ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলাই ছিল এর মূল সুর।

ফিনল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর ওউলু ২০২৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইউরোপীয় সংস্কৃতির রাজধানী’ হিসেবে নির্বাচিত শহরগুলোর একটি। এ বছর শহরটি শিল্প, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিজের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরছে। সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আবহে বাঙালির দুর্গাপূজাও হয়ে উঠেছে নিজস্ব ঐতিহ্যকে অন্য সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার একটি উপলক্ষ।

ফিনল্যান্ডের ওউলুতে দুর্গাপূজা ও সাংস্কৃতিক উৎসবে বিভিন্ন দেশের মানুষের অংশগ্রহণ
ছবি: মো. তারেকুজ্জামান

ওউলুতে প্রবাসী বাঙালি ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদ্‌যাপনের লক্ষ্যে কাজ করছে ওউলু বৈদিক কালচারাল সোসাইটি আরওয়াই (ওভিসিএস আরওয়াই)। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ছোট একটি অনলাইন কমিউনিটি হিসেবে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি পরবর্তী সময়ে দুর্গাপূজা, দীপাবলি, সরস্বতীপূজা, বাংলা নববর্ষসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্প্রীতির ক্ষেত্র তৈরি করেছে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির এবারের আয়োজন ছিল সে প্রচেষ্টারই আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

২৪ অক্টোবর ওউলুর রাতিন নিওরিসোটালোতে অনুষ্ঠিত উৎসবে প্রায় ১২০ জন অংশ নেন। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজনটি হয়ে ওঠে বহুজাতিক মিলনমেলা। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মানুষও ছিলেন। ফলে পূজামণ্ডপ শুধু ধর্মীয় আচার পালনের স্থান হয়ে থাকেনি, বরং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের কাছে বাঙালির ঐতিহ্য, শিল্প ও জীবনবোধ তুলে ধরার একটি পরিসরে পরিণত হয়েছিল।

ভাঁজপত্র
ছবি: মো. তারেকুজ্জামান

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওউলু সিটি বোর্ডের ভাইস চেয়ার জোহানা কারজুলা। পুরোহিত হিসেবে পূজা পরিচালনা করেন মনোজ দাধিচ। দুপুর ১২টায় পূজা ও অর্চনার মধ্য দিয়ে দিনের আয়োজন শুরু হয়। বেলা আড়াইটার দিকে অনুষ্ঠিত হয় অঞ্জলি। পরে বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় বাঙালির ঐতিহ্য ও উৎসবের বৈচিত্র্য। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শুরু হয় রাতের খাবার পরিবেশন, যেখানে একসঙ্গে নিজ দেশসহ ভিনদেশের মানুষদের সঙ্গে দেশীয় খাবার ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে আরও আন্তরিক হয়ে ওঠে মিলনমেলার আবহ।

শিশু ও বড়দের হাতে আঁকা চিত্রপ্রদর্শনী
ছবি: মো. তারেকুজ্জামান

ওউলু ২০২৬-এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা

এবারের দুর্গাপূজার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল ওউল ২০২৬-এর সঙ্গে ওভিসিএস আরওয়াইয়ের সহযোগিতা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইউরোপীয় সংস্কৃতির রাজধানী’ উদ্যোগের লক্ষ্য বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্যকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরা এবং মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানো। ২০২৬ সালে ওউলুকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে একত্র করা হচ্ছে।

শিশুদের তুলিতে সংস্কৃতি, প্রজন্মের হাতে ঐতিহ্য

এবারের আয়োজনের আরেকটি আকর্ষণ ছিল চিত্রাঙ্কন ও প্রদর্শনী। শিশুদের পাশাপাশি সংগঠনের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের আঁকা ছবিও প্রদর্শিত হয়। ছোট শিশুদের রঙিন তুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠে তাদের কল্পনার জগৎ, আর বড়দের শিল্পকর্মে প্রতিফলিত হয় অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার প্রকাশ। পূজার আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে এই প্রদর্শনী যুক্ত করে শিল্পচর্চা ও প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক সংযোগের একটি ভিন্নমাত্রা।

উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় বিশেষ ভাঁজপত্র। এতে ছিল দুর্গাপূজার তাৎপর্য, ওভিসিএস আরওয়াইয়ের পথচলা, বাঙালি ঐতিহ্য ও ওউলু ২০২৬-এর সাংস্কৃতিক ভাবনা নিয়ে লেখা। পাশাপাশি বৈদিক সাহিত্য, উপনিষদ ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নির্বাচিত বাণী ধারাবাহিকভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থাও ছিল। এসব বাণীর মধ্য দিয়ে মানবিকতা, ন্যায়, আত্মোপলব্ধি ও সম্প্রীতির মতো চিরন্তন ভাবনাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। ফলে আয়োজনটি শুধু আনন্দ-উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন জ্ঞান ও দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও তৈরি করে।

শিশু ও বড়দের হাতে আঁকা চিত্রপ্রদর্শনী
ছবি: মো. তারেকুজ্জামান

প্রবাসে শিকড়ের টান, সবার জন্য উন্মুক্ত সংস্কৃতি

প্রবাসে উৎসব আয়োজনের পেছনে থাকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ। সীমিত জনবল, সময় ও সম্পদের মধ্যেও একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনকে সবার অংশগ্রহণের উপযোগী করে তোলার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। ওউলুর এই দুর্গাপূজার সাফল্যের পেছনেও ছিল আয়োজক কমিটি ও সাধারণ সদস্যদের নিরলস পরিশ্রম।

আয়োজক কমিটিতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পার্থ প্রতিম সরকার, সহসভাপতি উল্লাস চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক অনিমেষ রায়, কোষাধ্যক্ষ স্বরূপ কুমার সিংহ এবং কার্যকরী সদস্য আকাশ সিনহা বাপ্পী। তাঁদের পাশাপাশি সংগঠনের সাধারণ সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয় পুরো আয়োজন।

ওভিসিএস আরওয়াইয়ের দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার মধ্যে রয়েছে একটি সার্বজনীন হিন্দুমন্দির প্রতিষ্ঠা, যেখানে উপাসনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক শিক্ষা, উৎসব ও কমিউনিটির সম্মিলনের সুযোগ থাকবে। এমন একটি পরিসর গড়ে তোলার লক্ষ্য, যেখানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন পটভূমির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া আরও দৃঢ় হবে।

ওউলুর দুর্গাপূজা তাই প্রবাসে বাঙালির শিকড়ের টানকে নতুন করে অনুভব করার পাশাপাশি স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলারও একটি উপলক্ষ। দেবী দুর্গার আরাধনা থেকে শুরু করে শিশুদের চিত্রাঙ্কন, বৈদিক বাণীর প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও একসঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া, প্রতিটি পর্বেই ছিল মিলনের বার্তা।

ভৌগোলিক দূরত্ব একটি মানুষকে নিজের জন্মভূমি থেকে দূরে রাখতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতির বন্ধনকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। বরং সেই সংস্কৃতিকে যখন অন্য দেশের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়, তখন তা নিজস্ব পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে ওঠে সর্বজনীন। ওউলুর এই দুর্গোৎসবের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্ভবত সেখানেই: বাংলার ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে, অন্য সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তৈরি করা যায় এমন এক সেতু, যার দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষ পরস্পরকে আরও ভালোভাবে চিনতে শেখে।