আর দূর প্রবাসে তো আমি অনেক লিখেছি। এখনো লিখি। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সংবাদপত্র অন্যতম হাতিয়ার। এ জন্য সংবাদপত্রকে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। সংবাদপত্রের মূল ভূমিকাই হচ্ছে সাদাকে সাদা বলা আর কালোকে কালো বলা। তবে আমি প্রথম আলোকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বলব না। কারণ, আমি দেখেছি, প্রথম আলোও কোনো না কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করে। আর তা হচ্ছে জনগণ ও সত্যের পক্ষে। আমি প্রথম আলোকে দেখেছি ভালো কাজের প্রশংসা করতে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে।

সংবাদপত্র সম্পর্কে ইংরেজিতে একটা কথা আছে যে Newspaper is the herald of the civilization—সংবাদপত্র হলো সভ্যতার অগ্রদূত। এক দিনে গড়ে ওঠেনি আমাদের এ সম্ভ্রান্ত আধুনিক সভ্যতা। এ সভ্যতার পেছনে প্রথম আলো পরিবারসহ বহু মানুষের বহু দিনের শ্রম যেমন অবদান রেখেছে, সংবাদপত্র তথ্যের পরে তথ্য প্রদান করে তেমনি তিলে তিলে দাঁড় করিয়েছে এই সভ্যতার রূপরেখা।

প্রথম আলোর মতো সংবাদপত্রই প্রথম তৈরি করেছে সভ্যতা উন্নয়নের উত্তাল ঢেউ। পুরো বিশ্বে দুই শতাধিক দেশে প্রথম আলোর দেড় কোটির বেশি পাঠক এ ঢেউকে আবার ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ফলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে লেগেছে আমাদের সভ্যতার ছোঁয়া। ইদানীং অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যে জয়–জয়কার, তার সূতিকাগারও প্রথম আলোর মতো সংবাদপত্রগুলোই। পৃথিবীর নানান পরতে যা কিছু ঘটছে, তার সবই প্রতিফলিত হয় প্রথম আলোর পাতায়। তাই তো সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পন—Newspaper is the mirror of the society। না, শুধু ঘটনা আর দুর্ঘটনাই বাণী-চিত্র লাভ করে না প্রথম আলোর পাতায়, প্রথম আলো মানুষকে স্বপ্নও দেখায়। সে স্বপ্ন সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। সে স্বপ্ন সুখময় সমাজের স্বপ্ন। কুসংস্কারের অন্ধকার পাড়ি দিয়ে আলোকিত দিনের স্বপ্ন।

কথায় বলে, Development comes through the information। বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, চিকিৎসা, যোগাযোগ, প্রভৃতি ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন ও উৎকর্ষ সাধন এবং সর্বোপরি যে মানবিক উন্নয়ন, তার প্রথম বার্তাবাহক কিন্তু এই প্রথম আলোই।

প্রথম আলো মানুষের সামনে তুলে ধরে অতীত ইতিহাস, যে ইতিহাস থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়, জাতি পায় সামনে চলার প্রেরণা। অতীতের ভুল–ভ্রান্তিগুলোকে ফাউন্ডেশন করেই গড়ে ওঠে বর্তমানের সঠিক পথচলার প্রণোদনা। তাই তো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,
‘হে অতীত, তুমি গোপনে গোপনে
কাজ করে যাও ভুবনে।’
অতীত ইতিহাস রোমন্থনের পাশাপাশি সম্ভাবনার কথাও বলে প্রথম আলো। কোনো একটা বিষয়ে নানা জনের নানা মত উপস্থাপিত হয় প্রথম আলোয়। পরিসংখ্যানগতভাবে উপস্থাপিত হয় সেই বিষয়ের পক্ষে–বিপক্ষে নানান যুক্তি। সেই যুক্তির আলোকে পরিকল্পনা গ্রহণ করে সংশ্লিষ্টরা। আর সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী নানান তথ্য বিশ্লেষণে নেওয়া হয় সঠিক সিদ্ধান্ত।

সম্ভাবনার পাশাপাশি আশঙ্কাও প্রকাশিত হয় প্রথম আলোয়। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক নানাবিধ ঘটনার আলোকে কখনো কখনো জাতীয় স্বার্থে কোনো কার্য বা সিদ্ধান্তের বিপরীতে আশঙ্কাও লিপিবদ্ধ হয় প্রথম আলোয় কালো হরফে। ফলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের আলোকে করণীয়ও ঠিক করা যায়। প্রতিকারমূলক প্রতিষেধক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতীয় দুর্যোগ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলায় প্রথম আলোর মতো সংবাদপত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

প্রথম আলো একটি আলোকবর্তিকা। যার মাধ্যমে মানুষ, সমাজ ও দেশ আলোকিত হচ্ছে। এই দৈনিক পত্রিকা শুধু সংবাদ পরিবেশন করেই দায়িত্ব শেষ করে না, সমাজের উন্নয়নে নানা ধরনের ভূমিকা রেখে চলেছে। একটি পত্রিকা যে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের নির্ভরতার জায়গা হতে পারে, তা প্রথম আলো প্রমাণ করেছে। প্রথম আলোর এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক যুগ যুগ।

প্রথম আলো মানুষের ইতিবাচক উদ্যোগ আরও বেশি করে তুলে ধরবে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে থাকবে অবিচল। অপশক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তিকে জাগিয়ে তোলার কাজ করে যাক প্রথম আলো, এটাই প্রত্যাশা।

*লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইউরোপ বাংলাদেশ প্রেসক্লাব