বাতাসে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা
আমি ঝুম (বৃষ্টিপাগল মা নাম রাখতে চেয়েছিলেন ঝুমবৃষ্টি, কিন্তু আমেরিকানদের জন্য নামটা কঠিন হয়ে যাবে ভেবে বাবা ছোট্ট করে নাম রেখেছেন ঝুম) যাচ্ছি বাংলাদেশে বেড়াতে। দেশে আমার খালামণি আর কাজিনরা থাকে। এ সময় আমেরিকার পড়াশোনা আর খণ্ডকালীন চাকরি থেকে এক মাসের ছুটি নিয়েছি। আমার শিকড় বাংলাদেশে বেড়াতে যাচ্ছি। লস অ্যাঞ্জেলেস শহর থেকে যাব সিঙ্গাপুরে। উড়োজাহাজে উঠলাম ফেব্রুয়ারির একটা রোদেলা দিনে।
১৭ ঘণ্টা টানা উড়োজাহাজ ভ্রমণ, ভীষণ কষ্টকর। মুভি দেখে আর কতটুকু সময় কাটে? একটু ঘুমালাম। মা–বাবার জন্য মন কেমন কেমন করছে। উড়োজাহাজে খাবারগুলো তেমন সুবিধার লাগল না। কোনোরকমে সিঙ্গাপুরে পৌঁছালাম। ১৫ ঘণ্টা পর ঢাকার উড়োজাহাজ। হাতমুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে অকারণ কিছুক্ষণ বিমানবন্দরে ঘুরলাম। সময় কাটছে না। হেলথ কার্ড আগেই পূরণ করেছিলাম। ভাবলাম সিঙ্গাপুর শহরটা ঘুরে দেখি। ফ্রি সিটি ট্যুরের ব্যবস্থা আছে। গেলাম বুথে। ভারতীয় এক নারী দাঁড়ানো। আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত তিনবার দেখে বললেন, ‘একাই যাচ্ছ নাকি? সঙ্গে কেউ নেই?’ বললাম, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘এই লাগেজ জমা রেখে যেতে হবে। নয়তো উঠতেই দেব না বাসে।’ বললাম, ‘আপনি নাম লিখুন। লাগেজ রেখেই আসব আমি।’ তিনি আবার বললেন, ‘একাই যাচ্ছ? আর কেউ নেই সঙ্গে?’ মেজাজ সপ্তমে উঠল, কানে কম শোনে নাকি! পাশে তাকিয়ে দেখি, চশমা পরা চুলে ডাই করা এক ছেলে হাসছে। বয়স আমার মতোই হবে। এর কী সমস্যা?
ট্রলি ব্যাগটা স্টোরেজে রাখলাম। চায়নিজ নিউ ইয়ারের জন্য বেশ সাজিয়েছে ওরা। বিমানবন্দরের ভেতর সাজানো বাগান, সেলফি তুলতে তুলতে পাশ ফিরে দেখি ওই ছেলে। ইংরেজিতে বলল, ‘ছবি তুলে দেব?’ বাংলায় বললাম, ‘না মি. ঝামেলা।’ তারপর ইংরেজিতে বললাম, ‘নো, থ্যাংকস।’ ও চশমাটা খুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে এমন হো হো হাসি শুরু করল! বললাম, ‘হোয়াটস রং?’ ও বলল, ‘আমি বাংলাদেশি তো, নাম কাব্য। ঝামেলা নয়।’ আমার এবার অবাক হওয়ার পালা।
যাক, বলেই বসলাম, ‘ফ্রি ট্যুরের নারীর কাণ্ড দেখেছ? আমি তো জানি সিঙ্গাপুরে শতভাগ মানুষ শিক্ষিত। কেন এতবার জানতে চাইল, আমি একা কি না।’ ও হাসল, বলল, ‘উনি পাগল। বাদ দাও তো। আমি কতবার এসেছি! ওরা এমন নয়।’ ট্যুরের দুই ঘণ্টা আগে গেলাম খোঁজ নিতে, দেখি শেষ ট্যুরে আমার নাম ওয়েটিং লিস্টে। অন্য এক নারী বসা। সে বলল, ‘তোমার কিউআর কোড কই?’ আমি তর্ক করলাম, ‘আগের নারী বলেছেন, তোমাদের সিট আছে এবং আমার নাম লিখেছেন।’ এরপর একটা গলা ভেসে এল পাশ থেকে, ‘আমার নাম কেটে ঝুমকে যেতে দাও, প্লিজ!’ তাকিয়ে দেখি, কাব্য। আমি কিছু বলার আগে নারী হাসলেন। কী একটা পরখ করে বললেন, ‘একটা সিট খালি আছে, দিয়ে দিচ্ছি। তোমার সিট লাগবে না।’
ইমিগ্রেশন পার হলাম আমরা একসঙ্গে। ট্যুর গাইডের সঙ্গে ২০ জন একটা বাসে উঠলাম। কাব্য জানালার পাশে আমাকে বসতে দিয়ে পাশে বসল। বললাম, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ ও বলল, ‘ঢাকায়। বইমেলায় যাব। মায়ের জন্য বই কিনব। তুমি?’ বললাম, ‘ খালামণির কাছে যাব আর আড়ংয়ে যাব।’
বাস চলতে শুরু করল। ট্যুর গাইড জানালেন যে রিক্লেইম ল্যান্ড মানে সাগরের জমি ভরাট করে সিঙ্গাপুর শহর তৈরি করা হয়েছে। শহরে বাড়ির দাম তাই এত বেশি। দেখালেন, কোথায় নিম্নমধ্যবিত্ত আর উচ্চমধ্যবিত্তরা থাকেন। উচ্চবিত্তদের বাসাও দেখালেন। তারপর আমরা গেলাম গার্ডেন বাই দ্য বেতে। সময় ৪০ মিনিট। একটাবার ট্যুর নিলাম আমরা। ওদের বাগানগুলো অপূর্ব। সুপারট্রি দেখলাম। কাব্য ছবি তুলে দিল অনেক।
এরপর আমরা গেলাম বেতে। দেখব বিখ্যাত মারলায়ন, সিংহের মাথা আর মাছের শরীর নিয়ে সিঙ্গাপুরের সিগনেচার মাসকট। সিমগাপুরের নাম অনেকবার পরিবর্তিত হয়েছে, মালয় আর চাইনিজদের সংমিশ্রণে হয়েছে আজকের সিঙ্গাপুর। আমরা নামলাম। খুব ইচ্ছা করছিল, বোট ট্যুর নেব। কিন্ত কাব্য বলল, ‘সময় হবে না, ঝুম।’ বললাম, ‘তাহলে মারলায়নের কাছে চলো যাই, ছবি তুলে দেবে।’ ও বলল, ‘যখন–তখন বৃষ্টি হয় এ দেশে, বাড়তি কাপড় আছে?’ বললাম, ‘না।’ ও বলল, ‘এসো, ওদের মজার ড্রিংক খাওয়াই। ডাবের পানির সঙ্গে শাঁস ব্লেন্ড করা মজার একটা ড্রিংক।’ খেতে খেতে বললাম, ‘চলো, মারলায়নের কাছে ছবি তুলব।’
কাব্য আর আমি হাঁটছি ব্রিজের ওপর। মনেই হচ্ছে না যে আগে কোনো দিন কাব্যের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। মারলায়নের কাছাকাছি পৌঁছাতেই নামল ঝুমবৃষ্টি। কোনোরকমে ছবি তুলে দিলাম দৌড়। একটু পরে বাসে ফিরে চললাম বিমানবন্দরের পথে। কাব্য বলল, ও নিউইয়র্কে থাকে, পড়ছে পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে। আমি পড়ছি সাইকোলজি।
নেমে ছুটলাম আমার ব্যাগ নিতে। এরপর উড়োজাহাজে উঠলাম। কাব্যর সিট আমার পেছনে। সাড়ে তিন ঘণ্টায় আর দেখা হলো না আমাদের। ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে ব্যস্ত হয়ে গেলাম ইমিগ্রেশন পার হয়ে ব্যাগ সংগ্রহ করতে। খালামণি এসে দাঁড়িয়ে আছেন। বের হওয়ার আগে একবার কাব্যকে দেখলাম। হাত নেড়ে বাই বলে দিলাম।
রাতের ঢাকা কী অসম্ভব সুন্দর। খালামণি কত আদুরে গল্প করছেন। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, কাব্য সঙ্গে গেলে খুব ভালো হতো। কেন? এত দিন কখনো কারও জন্য এ রকম লাগেনি। বাসায় পৌঁছে পরদিন বিশ্রাম নিলাম। পরদিন ব্রাঞ্চ করতে গেলাম পাগলা বাবুর্চি রেস্তোরাঁয়। খালামণিকে বললাম, ‘বইমেলায় যাব।’ বললেন, ‘তুই তো বাংলা ভালো করে পড়তে পারিস না, বইমেলায় কেন? খামোখা ধুলা খাবি। রকমারিতে অর্ডার দিয়ে দেব।’ কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা করছে কাব্যকে দেখতে। ও বলেছিল, বইমেলায় যাবে।
পরদিন গেলাম আড়ংয়ে। গান বাজছে, ‘বাতাসে বহিছে প্রেম...নয়নে লাগিল নেশা...কারা যে ডাকিল পিছে...বসন্ত এসে গেছে…’
ইশ, কেন যে কাব্যর কোনো ফোন নম্বর বা ঠিকানা নিলাম না! এমন সময় কে যেন এসে ডাকল, ‘ঝুম, কেমন আছ?’ কাব্য? কাব্যই তো! বললাম, ‘আরে কোনো ঠিকানা না দিয়ে কোথায় হাওয়া হয়ে গেলে?’ ও হাসল, খালামণিকে সালাম দিল। তারপর বলল, ‘কাফেতে বসি চলো।’ খালামণিও গেল সঙ্গে। আমি ওকে অনেক কিছু বলতে চাই। কিচ্ছু বললাম না। ও বলল, ‘ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম আইডি দাও।’ দিলাম। বন্ধু হলাম। খালামণি ওর মা–বাবা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চাইল। আমি চুপ। দেখছি, ও আমার পছন্দের ফুচকা, সুশি আর কফি অর্ডার করল (এত কিছু মনে রেখেছে!)। আমি চিনি দিতে গিয়ে টেবিলে ছড়ালাম। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি কিন্তু জানতে দিতে চাইলাম না। ও হয়তো বন্ধু ভাবছে। আবার হো হো করে হাসছে আমার কথা শুনে। কিন্তু আমার বলতে ইচ্ছা করছে, জীবনের প্রথম প্রেম, তোমাকে জানতে চাই।
বাসায় চলে এলাম। কাব্যর সঙ্গে টুকটাক চ্যাটিং ছাড়া আর তেমন কোনো কথা হয়নি। আমরা এর ভেতর হাতিরঝিলে গেলাম, ময়নামতিতে গেলাম, ইলিশ খেলাম। এরপর যাওয়ার দিন চলে এল। আগামীকাল ভ্যালেন্টাইনস ডে। মানে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। আমার খুব ইচ্ছা করছে কাব্যকে জিজ্ঞেস করি, উইল ইউ বি মাই ভ্যালেন্টাইন?
এর মধ্যে খালামণির গার্ড এসে বিশাল একটা প্যাকেট গিল। আমার নামে এসেছে, ভেতরে গোলাপ, চকলেট আর একটা টেডি। ছোট্ট করে লেখা,
‘লাভ ইজ ইন দ্য এয়ার, ঝুম
ক্যান ইউ ফিল ইট?
ফরএভার ইয়োরস..
কাব্য’
এই প্রথম খালামণির কঠিন চোখ উপেক্ষা করে হাসলাম। তারপর আইডিতে গিয়ে লিখলাম,
‘ইয়েস! আই ক্যান ফিল ইট...’