হনলুলু, ওয়াহু দ্বীপের দক্ষিণে হাওয়াইর রাজধানী। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম জনবহুল শহর। হনলুলু মূলত পর্যটক কেন্দ্র। কম বৃষ্টির কারণে, হনলুলুতে বেশির ভাগই শুষ্ক গ্রীষ্মকাল থাকে। এখানে মাসজুড়ে তাপমাত্রার সামান্য তারতম্য ঘটে। বছরের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা ২৭ থেকে ৩২°সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২৪°সেলসিয়াস। মনোরম আবহাওয়ার জন্য এখানে সারা বছরই পর্যটকদের আসা–যাওয়া লেগেই থাকে।

তিন দিন হনলুলু শহরে প্রচুর ঘুরোঘুরি হলো। মনের ভেতর বারবার দোলা খাচ্ছে ‘পার্ল হারবার’। এটা না দেখলে বড় একটা ইতিহাস দেখা, জানা থেকে বঞ্চিত হব। গত ১৬ আগস্ট সকালের নাশতা সেরেই আমরা হোটেল থেকে বাসের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। ১০ মিনিট হেঁটে গেলেই রাস্তার ওপারে বাসস্টেশন। ২ মিনিট পরে বাস এলে টিকিট কেটে উঠে পড়ি।

কয়েকটা স্টেশন পার হয়ে প্রধান রাস্তার ওপর আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো। রাস্তার উল্টো দিকে পার্ল হারবারের পথ। হাঁটতে থাকি...কি চমৎকার, ছিমছাম। দেখতে পাই... ‘পার্ল হারবার ন্যাশনাল মেমোরিয়াল’ (Pearl Harbour National Memorial) ফলকটি।

দেখা হয়ে গেল কয়টি ইয়ং জাপানিজ মেয়ের সঙ্গে। ফলকের ওপরে বসে ওরাও আমাদের ছবি তুলে দিল, আমরাও ওদের ছবি তুলে দিলাম। বিদেশে এলে এমন হরহামেশা ঘটে। সেলফি তুলতে গেলেই আরেকজন নিজে থেকে এসে ছবি তুলে দেয়।
সামনে গিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলে, নিরাপত্তা রক্ষী আটকে দিল। ভ্যানিটি ব্যাগ ভেতরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। হায়! ব্যাগটা কোথায় রাখব? একটা জায়গা দেখিয়ে দিল। ব্যাগটা সুরক্ষিত থাকবে, তবে পাক্কা ৬টা ডলার বেরিয়ে গেল। মনে মনে গজ গজাইলাম... এমন জানলে ব্যাগই আনতাম না।

কার্ড, ডলার সব জামাই মিয়ার পকেটে রেখে ভেতরে ঢুকি। কী অপূর্ব বিশাল নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরা সবুজ প্রান্তর, একেবারে প্রশান্ত মহাসাগরের কিনার ঘেঁষে। জলের ঢেউ, নীল আকাশজুড়ে সাদা মেঘের ভেলা, হালকা তেজদৃপ্ত রোদ্দুর, আর চনমনে হাওয়ায় ৬ ডলারের দুঃখবোধ মুহূর্তে উড়ে গেল। আমি সত্যি উচ্ছ্বসিত! তবে ভেতরে অদ্ভুত একটা মৃদু কাঁপন! খানিকটা রক্তক্ষরণ! ঠিক হিরোশিমা দেখে যা হয়েছিল।

পার্ল হারবার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের হনলুলু শহরে অবস্থিত একটি নৌ ও বিমানঘাঁটি। এটা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২০০০ মাইল এবং জাপান থেকে প্রায় ৪০০০ মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। সামরিক কৌশলগত দিক দিয়ে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর, রোববার। দিনটি ছিল অফিশিয়াল ছুটির দিন। সেনাবাহিনীর লোকেরা অলস সময় কাটাচ্ছে। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের ঘড়িতে তখন সকাল ৮টা বেজে ১০ মিনিট, জাপানি নেভির প্রধান সেনাপতি এসোরকু ইয়ামামোতোর পরিকল্পনা অনুযায়ী জাপানি নৌবহর এবং ৬টি বিমানবাহী জাহাজ থেকে ৩৫৩টি যুদ্ধবিমান একযোগে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে এ মার্কিন নৌঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। এটি ছিল সুপরিকল্পিত।

কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি যে জাপানিরা হাওয়াইয়ের দূরবর্তী দ্বীপগুলোয় আক্রমণ করে যুদ্ধ শুরু করবে। আক্রমণের আকস্মিকতায় শুরুতেই হতভম্ব হয়ে পড়েন মার্কিন সেনারা। পাল্টা আক্রমণের জন্য নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার আগেই ডুবে যায় তাদের চার চারটি যুদ্ধজাহাজ। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাকি চারটি। তারা ৮টি যুদ্ধজাহাজ এবং ৩০০টিরও বেশি বিমান সমেত প্রায় ২০টি আমেরিকান নৌযান ধ্বংস বা ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছিল। বেসামরিক ব্যক্তিসহ এই হামলায় ২ হাজার ৪০০ এর বেশি আমেরিকান মারা যায়। আহত আরও এক হাজারেরও বেশি মানুষ।

আক্রমণটি মার্কিনদের অহমিকায় গভীর দাগ কেটে যায়। পার্ল হারবার আক্রমণের পরদিনই আমেরিকা প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করে জাপানের বিরুদ্ধে। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বলেন, এটা একটা কলঙ্কিত দিন। এ আক্রমণের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। পার্ল হারবার আক্রমণের বেশকটি উদ্দেশ্যের মধ্যে কয়েকটি হলো...।

১.
জাপানের নিজস্ব কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না। জাপান ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছিল আমেরিকা হতে আমদানিকৃত তেল, আয়রন, স্টিল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল যন্ত্রপাতি ইত্যাদির ওপরে। আমেরিকা এসব জিনিস আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু কাজ না হলে, ১৯৪০ সালে আমেরিকা সব রপ্তানি বন্ধ করে দেয় এবং আমেরিকায় জাপানের যত সম্পদ ছিল, তা আটকিয়ে দেয়। তখন জাপান, নিজেদের গৌরব রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে।
২.
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরের মূল শক্তিসমূহ বিধ্বস্ত করে দেওয়া।
৩.
প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
৪.
আক্রমণের মধ্য দিয়ে জাপানের সামরিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করা এবং তার নৌশক্তির জন্য পর্যাপ্ত সময় নেওয়া।
৫.
এ আক্রমণের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ আমেরিকানদের নৈতিক মনোবল চূর্ণ করা।
পার্ল হারবারের ভেতরে ঢুকেই ডান পাশে দেখি, একটা সাবমেরিন মিউজিয়াম। তবে টিকিট কেটে ঢুকতে হবে তাই ওদিকে আর পা মাড়ালাম না। আরও অনেক জিনিস দেখার আছে। আমরা হাঁটছি আর বিভিন্ন মনুমেন্টের ছবি তুলছি...কোথাও নোঙর, কোথাও স্ট্যাচু, আর যাঁরা এ রোহমর্ষক ঘটনায় নিহত হয়েছেন, তাঁদের স্মৃতির ফলকগুলো কী সুন্দরভাবে করে রেখেছে। টোকিও থেকে আগত এক জাপানি ভদ্রলোক বেশ বড়সড় এক ক্যামেরা দিয়ে একাকী ছবি তুলছিলেন। আমরা তার বেশ কিছু ছবি তুলে দিলাম। প্রতিদিন নানা দেশ থেকে অনেক পর্যটক আসে। ঘুরতে ঘুরতে একটা রুমে ঢুকে পড়ি। সেখানে পার্ল হারবারের ঘটনা সুন্দর করে ছবি, লেখা, জাহাজের মডেল দিয়ে সাজানো ছিল। ওখান থেকেই অনেক কিছু জেনে নেই। কিছুটা সময় আমি একটা গাছের নিচে মখমল সবুজ তাজা ঘাসের ওপর বসে থাকি। চঞ্চল জলছোঁয়া বাতাসে মন, শরীর জুড়িয়ে যায়।

আর কত? খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। একটাই শপ দেখলাম। লাইনে দাঁড়িয়ে স্যান্ডউইচ, চিপ্স, কোক, পানি খেয়ে নিলাম। জিরিয়ে নিতে নিতে দেখি, খানিকটা দূরে একটা রুমের দরজা শুধু দেখা যাচ্ছে আর অনেকে সেখানে লাইন দিয়ে রেখেছে। ব্যাপার কী? পা পা করে এগিয়ে যেয়ে আমরাও লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ি। ৩০ জন নিয়ে একটা ছোট্ট শিপে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় প্রশান্ত মহাসাগরের ভেতরে যেখানে বিখ্যাত ইউএসএস অ্যারিজোনা (USS Arizona) জাহাজটির কিছু ধ্বংসাবশেষ সুরক্ষিত আছে। এক দল যাচ্ছে, আরেক দল আসছে...এভাবেই  চলছে। ওখানে কোনো কথা কেউ বলতে পারবে না। ওরা ইতিহাস বলছে, আর আমরা শুনছি।

আবার মহাসাগরের ঢেউয়ের দোলায় দোলায় ফিরে এলাম আগের জায়গায়। কী চমৎকার পরিবেশ! এক টলমল টলমল অনুভূতি কাজ করছে হৃদয়ের পরতে পরতে... আমার সব অশ্রুজল, দৈন্যতা, মলিনতা, অপারগতা, সব...সব ডুবে যাক নীল গভীর জলে।

নিউটনের তৃতীয় সূত্র বলে, প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটালে জাপান আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় এবং পার্ল হারবার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ফিরিয়ে দেয়। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি করে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর নজর রাখতে সক্ষম হয়। জাপানিদের পার্ল হারবার আক্রমণের ফলে পরবর্তী সময়ে লাখো নিরীহ মানুষ নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করে, ইতি ঘটে অজস্র জীবন ও স্বপ্নের। জাপানি সেনাপতি ইয়ামামোতো বলেছেন, উনারা জানতেন যে শেষ পর্যন্ত জাপান হারবে কিন্তু ইগো এবং ক্ষমতার লোভ হিংস্র করে তোলে। আর তার বলি দিতে হয় দেশ এবং সাধারণ মানুষদের। হায়রে ক্ষমতার লালসা! এর কারণে দেশে দেশে যুদ্ধ আর হানাহানি চলতেই থাকে...

একটা মজার কথা জেনে নিন, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত নির্মান হওয়া যত সিনেমা রয়েছে তার মধ্যে এই ঘটনাকে উপজীব্য করে বানানো ‘পার্ল হারবার’ সিনেমাটিতেই ব্যবহার করা হয়েছে সবচাইতে বেশি পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য।

বিকেলের স্নিগ্ধ সময় পার করছি। আর নয়, এবার ফেরার পালা। এ কথাটা যে কত বড় সত্য তাই ভাবছি... ইট মারলে, পাটকেলটি খেতে হয়। হিরোশিমা এবং নাগাসাকি ট্র্যাজেডি তারই উদাহরণ। হিরোশিমা শহর দেখে যে তীব্র ক্ষোভ ছিল, তা কিছুটা হলেও কাটাকাটি হয়ে গেল। মনে এক অজানা বেদনাবোধ বিরাজ করছে। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, দুটি জিনিস অসীম। মহাবিশ্ব এবং মানুষের মূর্খতা। আসলেই, সত্যি তাই।