আমার বাবুর বাবু কই?

ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ (বাংলা) বইয়ে স্থান পেয়েছে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের এই গ্রাফিতি

পোলাও রান্না কখনোই কোনো সহজ কাজ নয়। অন্তত সাবিহার কাছে তো নয়ই। চালের বিপরীতে ঠিক তার দ্বিগুণ পরিমাণ পানি দিতে হবে। কোকোনাট মিল্ক আর পানি দুটোই দেওয়া যায় পানির অংশে। এতবার করার পরও প্রতিবার কেন যেন একটা না পারার ভয় কাজ করে। মজার বিষয় সব সময় পোলাও চমৎকার হয়। স্পেশালি ইয়ন খুব আনন্দ নিয়ে খায়। সাবিহার কলিজার টুকরা একমাত্র ছেলে ইয়ামিন। ইয়ামিনকে সাবিহা ইয়ন ডাকে। সাবিহার মতো গল্লু চেহারার একটা বাবু হয়েছিল ঠিক ১৫ বছর আগে। আজ জন্মদিন সাবিহার বাবুর। ইয়ামিনের খুব পছন্দ পোলাও আর আলুসহ ঝোল ঝোল মুরগির মাংস। তাই রান্না করছে সাবিহা।

বেলা ৩টার মতো বাজে। দুপুরে যেই না একটু ঘুম দেবে বলে শুয়েছিল, তখনই মনে পড়ল সাবিহার আজ তো ইয়নের জন্মদিন। আজকে তার কলিজার জন্মদিন। ইদানীং সব ভুলে যায় সাবিহা। মাঝেমধ্যে ঘুম ভাঙার পর চোখ বুজে শুয়ে খুঁজে পায় না কোথায় আছে, কে সঙ্গে? বাবু কই? আম্মা কই? দুর্বল লাগে চোখ খুলতেই। বেশির ভাগ সময়ই হাসিব উঠে চা বানায়, এটা—সেটা দিয়ে নাশতাও বানায় এমন শরীর খারাপের দিনে। আস্তে করে মাথায় হাত বুলায়ে ডাকে... ‘সাবিহা! ওই মেয়ে! ওঠো!’

সাবিহার খুব ভালো লাগে ক্ষণিকের এই মুহূর্তগুলো। হাসিব তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। ভালোবাসার পাশাপাশি চমৎকারভাবে স্নেহ করে বাচ্চাদের মতো। এই স্নেহ খুব গভীরভাবে চুপ করে ভাবলেই অনুভব হয়। কিছু স্নেহ-মমতা হুড়োহুড়ি করে অনুভব করা যায় না।

পোলাও রান্না শেষ। মুরগির মাংসও প্রায় শেষ পর্যায়ে। আলু আর ঝোল দিল। মুরগির তরকারিতে আলু দিতে হবে অল্প হলুদ মরিচ মাখায়ে অল্প ভাজি করে। সরাসরি আলু দিলেই ইয়ন বলে উঠবে ‘আম্মু! চালাকি চালাকি, বেশি চালাকি?’ ছেলেটা একটু খুঁতখুঁত স্বভাবের খাবারের বিষয়ে।

‘হ্যালো’

‘হ্যাঁ... হ্যালো... কই তুমি? কখন আসবা প্রায় ৫টা বাজে?’

‘এই তো অফিসে সাবিহা। বের হচ্ছিলাম। কি করো? খাইছো?’

‘ভুলে গেলা? তুমিও! বাসায় আসো। বাবুর জন্মদিন তো আজকে। পোলাও মাংস রান্না করছি। আসার সময় কোকের ক্যান আইনো তো। ইয়ন প্লাস্টিকের বোতল পছন্দ করে না...’

হাসিব চুপ করে আছে। ৩/৪ সেকেন্ড হবে হয়তো। কোনো এক কারণে মাঝেমধ্যে এই অল্প সময়েও অনেক ভাবনা খেলে যায় মাথায়, অনেক স্মৃতি বিদ্যুৎ বেগে ছুটে বেড়ায়। ইদানীং বেশি হয়। ভাবনায় হারিয়ে যাওয়া নিজেকে দ্রুত খুঁজে হাসিব বলল

‘আজকে? কিন্তু বাবুর জন্মদিন তো…’

‘আজকে নয়? আজকেই তো।’

‘হতে পারে। আমার কোথাও ভুল হচ্ছে। আচ্ছা আমি তাড়াতাড়ি আসতেছি। খালা কই? নাই উনি বাসায়?’

‘খালা আছে। উনি যান না কোথাও। নামাজ পড়তেছেন আম্মার রুমে।...হাসিব, আম্মা কবে আসবে? আজকে আসলে ভালোমন্দ সবাই মিলে খেতাম।’

‘আম্মা? ওকে! বাড়িতে কল দেব বাসায় এসে। ঘুরে যেতে বলব আব্বু আম্মাকে। ঠিক আছে?’

‘আচ্ছা। রাখি রাখি...তরকারি চুলায়...’

অল্পের জন্য রক্ষা। কথায় কথায় আর একটু দেরি হলেই পাতিলে লেগে যেত। অল্প করে কটা ধনিয়া পাতা আর কাঁচা মরিচ দিয়ে ডাকনা দিয়ে দমে রাখল চুলার পাশেই। ঘুরতেই দেখে খালা দাঁড়ানো।

‘খালা? ইয়ন কই? আসে নাই এখনো মাঠ থেকে। প্রায় তো মাগরিব এর টাইম হয়ে আসল। দেখছো? এখনো আসে নাই’

খালা অল্প করে মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে কি যেন বিরবির করে বলল। সাবিহা শুনতে পেল না। এমন সময় কলিং বেলের শব্দ। শুনেই দৌড়ে দরজা খুলল সাবিহা...

‘আম্মু! পোলাউ রানছো? সঙ্গে কি? রোস্ট নাকি ঝোল মাংস?’

‘কেমনে বুঝলি?’ বলতে বলতে ছেলের কপালে আদর দিল। ‘হ্যাঁ আব্বু। তোর পছন্দের খাবার। এখন খাবি?’

‘আমিতো সিঁড়ির নিচে এসেই তোমার রান্নার গন্ধ পেলাম! হে হে। হ্যাঁ আম্মু খাওয়া যায়। ক্ষুধা লাগছে…’

ইয়ন হাসছিল। সাবিহা তাঁকিয়েই আছে। ছোট্ট বাবুটা তার বড় হয়ে গেল। নিজের ছেলে দেখেই হয়তোবা সাবিহার অচেনা এক ভালো লাগা কাজ করে ছেলেটা হাসলে। স্নিগ্ধ এক মমতা আছে হাসিতে। কলিজার মধ্যে অকারনেই হু হু করে উঠল। প্রচণ্ড সুখবোধে কি?

‘যাও। গোসল করে আসো। কি অবস্থা গেঞ্জির, প্যান্টের!’ ছেলের পরনে কালো শর্টস আর তার প্রিয় দল বার্সেলোনার জার্সি গেঞ্জি। ‘কত দিন এইটা চেইঞ্জ করস নাইরে ইয়ন? ইছ বাবা!’ বলেই রান্না ঘরের দিকে গেলো সাবিহা।

‘খালা! আব্বু খাবে তো। টেবিলে খাবার দাও’ হুড়োহুড়ি করতে করতে বলল সাবিহা। প্রতিউত্তরে খালা কিছু বলল না। অনুরোধের বিপরীতমুখী গতিতে টেবিলে খাবার দিতে শুরু করলো।

কিছুক্ষণ পরেই বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। সাবিহা বুঝলো ইয়ন গোসল শেষ করেছে। একটা প্লেট এ খাবার বাড়তে শুরু করল সে।

‘আম্মু! আমি যাই। খেলতে যাব’

‘কিরে তুই তো সেম কাপড়েই আছিস আব্বু! গোসল করিস নাই বুঝি? আচ্ছা থাক। আয় দুইটা লোকমা দিই’

‘দাও’

সাবিহা পোলাওর সঙ্গে অল্প ঝোল আর আলু ভেঙে অল্প মাখল। সঙ্গে একটু কলিজার টুকরা দিয়ে ছেলের মুখে তুলে দিল।

‘আম্মু তুমিও খাও’ খেতে খেতে বলল ইয়ন। ‘অনেক মজা হইছে আম্মু। খুউব!’

সাবিহা নিজেও লোকমা নিল। ছেলেকে আবার দিল। দুজনে অল্প করে খেল। মাথার ওপরে সিলিং ফ্যান মৃদু বাতাস দিচ্ছে। ছেলেটার লম্বা চুলে চোখ ঢেকে যায় প্রায়। সাবিহার ভালো লাগে একটু লম্বা চুলে। সাবিহা আজ এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে প্রিয় ছেলের দিকে। লোকমা দিতে দিতে চোখ খাপসা হয়ে যাচ্ছে সাবিহার ভীষণ কোন এক মায়ায়। ভাগ্যিস ছেলেটা তাকাচ্ছে না। মাথা নিচু করে খাচ্ছে।

যদিও খালা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। নিঃশব্দে বিরবির করছেন আর খুব নিয়ন্ত্রিত ভাবে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।

‘আম্মু গেলাম’

‘আর একটু খা’

‘না। বন্ধুরা নিচে। যেতে হবে! যাই আম্মউউ! ভালোবাসিইইইইই’

‘আমি বেশিইইইইইই’ বলেই হেসে উঠল সাবিহা।

‘নো নো নো! আমি বেশিইইইই’ বলেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল ইয়ন।

সাবিহার একমাত্র ছেলে। তার কলিজা। কোনো এক অজানা কারণে সাবিহা একদৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে ফাঁকা সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ির চেয়ে বুকের ভেতরটা যেন বেশি ফাঁকা লাগছে। কেন যেন মাথাটা হাল্কা লাগলো। সাবিহা শোবার ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

ভোর হবে হবে। জানালা অল্প ফাঁকা। মৃদু শীতল বাতাস আসছে। বাহিরে অনেক বৃষ্টি হয়েছিল সন্ধ্যা থেকেই। মাথার পাশের টেবিল ল্যাম্প অফ করে হাসিব বারান্দায় গেল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে হাসিব। পাশেই ইজি চেয়ার। ক্লান্ত লাগছে তার খুব। শত হাজার এলোমেলো চিন্তারা ছুটোছুটি করছে। কাকে ঠেলে কে সামনে এসে কথা বলবে তার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে হয়তো।

‘বাজান। ঘুমান নাই ক্যান?’ খালা যে কখন আসলেন। টেড় পায়নি হাসিব।

চুপ করে থাকলো একটু। ‘খালা! আপনি? ঘুমান নাই?’

‘জি বাবা। উঠলাম। একটু নামাজ পড়তাম। জানালার পাশে দাঁড়াইয়া একটু নামাজ পড়ি? আপনার লাইগাও দোয়া করতাম?’

‘ঠিক আছে খালা। পড়েন।’ বলতেই বলতেই হাসিব এর মায়ের কথা মনে এলো। আম্মা বাসায় থাকলে পাশে গিয়া শুয়ে থাকত এখন। ফজরের সময় হয়ে এল প্রায়।

২ রিং পরতেই আম্মা ফোন ধরল...‘আব্বু! এত সকালে?’

‘এমনেই আম্মা। নামাজ পড়বেন না?’

‘হ্যাঁ। ওজু বানাইলাম। নামাজের মসলায় বসতেই তোমার কল। কি হইছে আব্বু?’

হাসিবের শরীর কাঁপছে। তীব্র বেদনায় চোখ ভিজে উঠল নিমিষেই। মায়ের প্রশ্নের উত্তরে কোনোভাবে ‘হু আম্মা?’ বলতে পারল। হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল পরক্ষণেই। কেতাদুরস্তভাবে থাকা হাসিব, গুছানো কাজ, পরিমিত হাসি হাসি মুখ আর তুখোড় ব্যক্তিত্বের। হাসিবকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে সাবিহা। যেকোনো পরিস্থিতিই হোক হাসিব হাসিমুখে শান্তভাবে তা ম্যানেজ করে নেয়। কিন্তু ওই ঘটনার পর সব থেমে গেল। চোয়াল শক্ত করে জীবন কাটায়। সেদিন কাঁদেনি হাসিব। আজ প্রায় ২ মাস হলো। একবারো ভেঙে পড়েনি। সাবিহার যত্ন আর সংসার এর হাল দুইই শক্ত হাতে ধরে সময়ের সঙ্গে গড়াচ্ছিল। আজ যেন আর পারল না। অনেকক্ষণ দম আটকে থাকা মানুষ যেভাবে শ্বাস নেয়, ঠিক সেভাবেই জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে গোঙানির শব্দে হাসিব বলে উঠল ‘আম্মা গো! আম্মা! আমার বাবু কই গো আম্মা? ও আম্মা গো...’

জানালার পাশেই নামাজের মসলায় খালা নীরবে কাঁদছে মোনাজাত তুলে। বিরবির করে কি যেন বলছে। সৃষ্টিকর্তা যেন কষ্ট কমায় এই বাচ্চা দুটার এই একটাই দোয়া উনি দিনে শতবার করে যান। বিরবির করেন, হাঁটতে বসতে করেন। নাতির মতো আদর করে বড় করছিলেন ইয়নকে।

ফোনের অন্য পাশের মা তখন ছটফট করছিল। কয়েকবার ডাকলেন। কোনো জবাব পেলেন না। হাসিব শুনছে মায়ের ডাক। প্রায় নিস্তেজ হয়ে আসছে তার দেহ। ঝিমঝিম করছে পুরো শরীর। অল্প করে শুনতে পেলো মায়ের কণ্ঠ.... চিৎকার করে বিলাপ করছেন...

‘আল্লাগো! আমার বাবুর বাবু কই গো? ফিরায়া দাও গো মাবুউউদ’

চারদিকে চুপচাপ এর মাঝেই হঠাৎ করে দমকা বাতাস বয়ে গেল। ডালপালা পাতাসহ পুরো প্রকৃতি যেন মায়ের বিলাপে গুঙিয়ে উঠল....

***

জুলাই মাসের সেই দিনে ইয়ন অন্য দিনের মতো বের হয়েছিল। মানা করেছিল সাবিহা, কিন্তু বাবাকে ধরে ম্যানেজ করল। বারবার বলছিল ‘আম্মু সবাই যাচ্ছে তো। ভয় পাও কেন? আমরা তো ছোট। আমাদের কেন কিছু করবে? আমরা শুধু অল্প একটু করে প্রতিবাদ জানাব।’

ইয়নের লাশ রাস্তায় পড়েছিল অনেকক্ষণ। সাবিহা হাসিবের কলিজার টুকরা রাস্তায় শুয়ে ছিল সেদিন পরিত্যক্ত ইটপাথরের সঙ্গে। ইয়নের পরনে ছিল তার প্রিয় জার্সি। নড়তে নড়তে হঠাৎ করেই স্থির হয়ে গিয়েছিল। ঠিক যেমন করে একসময় বুকের ওপরে ঘুমিয়ে পড়ত কলিজার বাবুটা।

* মূল গল্প লিখেছেন ‘জুলাই ২৪’র শহীদেরা

* ভাবানুবাদ: মাঈনুল ওয়াদুদ সুমন, ডার্ডফোর্ড, ইংল্যান্ড

‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]