মা আমাকে জন্ম দিয়েই বুঝিয়েছিলেন ‘রেডলাইন ’৭১’

ছবি: এআই/প্রথম আলো

মাকে নিয়ে আমার কখনোই স্মৃতিকথা লেখা হয়নি। কখনোই বলা হয়নি, ‘মা, তোমাকে বড্ড ভালোবাসি, তুমিই আমার পৃথিবী।’ যদিও মা আমার সমগ্র সত্তাজুড়ে। সেই ছোটবেলা থেকেই আগলে রেখেছেন সব ঝড়ঝাপটা থেকে। মনে পড়ে, শীতের কোনো এক সকালে নানাবাড়িতে কি এক অঘটনই না ঘটিয়েছিলাম। তখনো ছোট বোনটির জন্ম হয়নি, মায়ের পেটে। বয়স কতই–বা আর হবে—পাঁচ কি ছয়। আমি আর আমার পিঠাপিঠি ছোট ভাই একসঙ্গে দিলাম ঢিল ইয়া বড় এক মৌচাকে। মুহূর্তেই আমরা দুজন হয়ে গেলাম চলন্ত মৌচাক। তৎক্ষণাৎ মা সব বাধা উপেক্ষা করে নিজেকে মৌমাছির লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আমাদের শীতের কম্বল দিয়ে ঢেকে শেষ রক্ষার চেষ্টা করলেন। আরেক দিনের কথা মনে পড়ে। কাঁঠালের বড় বিচি সাদা সরু করে কেটে, নাকের ভেতরে দিয়ে হাতির দাঁত-হাতির দাঁত খেলছিলাম। কখন যে ছোট ভাইটি নাকের ভেতরে পুরোটা ঢুকিয়ে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়েছে, বুঝতে পারি নি। আমাকে পিটাপিটির পর্ব শেষ করেই মা সোজা ডাক্তারের কাছে। অজপাড়াগাঁ থেকে চটজলদি শহরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া আসলে মার সাহস ও দূরদর্শিতার বহিঃপ্রকাশ ছিল।

আমাদের বেড়ে ওঠা মূলত ছিল বিভিন্ন মফস্‌সল শহরে বাবার বদলির চাকরির সুবাদে। আজ এশহরে তো বছর দুই ঘুরতেই ওশহরে; নতুন শহর মানেই নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু। রোজ স্কুল থেকে ফিরে খেলার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে থাকার স্বাধীনতা ছিল মাগরিবের আজান পর্যন্ত। বিপত্তি হতো যেদিন হেরে যেতাম। গোল শোধ না করা পর্যন্ত জোর করেই খেলা চালিয়ে যেতাম। আর দেরিতে বাসায় ফেরায় বাবার অগ্নিমূর্তি থেকে মা-ই আমাদের রক্ষা করতেন। আমাদের দুরন্তপনায় বিরক্ত হয়ে বাবা প্রায়ই মেজাজ হারাতেন। কিন্তু আমার মা ছিলেন প্রচণ্ড ধৈর্যশীল।

আমাদের রাতে পড়ালেখার দেখভাল বাবাই করতেন। তবে বাবার মেজাজের কারণে আমরা চাইতাম, বাবা কখন তার বন্ধুদের সঙ্গে বের হবে। বাবা বের হলেই মায়ের ওপর উপরি দায়িত্ব ছিল আমাদের পড়ানোর। আমার মনে পড়ে, ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় বাবা উচ্চ শিক্ষার্থে জাপান চলে গেলেন। শুরুতে কয়েক মাস মা প্রচণ্ড আর্থিক সংকটে পড়লেও আমাদের বুঝতে দেননি, পূরণ করেছেন আমাদের সব আবদারই। তখন বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর কাজটি আজকের দিনের মতো এত সহজ ছিল না। যাহোক, বাবা দেশে ফেরার পর তখন আমাদের আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো হলেও, মা তাঁর নিজের জন্য খরচের ব্যাপারে আগের মতোই মিতব্যয়ী ছিলেন। আসলে মা দেখানোপনাকে বরাবরই অপছন্দ করতেন। মানুষের ভেতরের সৌন্দর্যে বিশ্বাসী ছিলেন। আমাদেরকেও সেভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর ছিল না। মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ায় পড়াশোনা আর সেভাবে এগোয়নি। কিন্তু সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়টি ছিল তাঁর সর্বাধিকার। আমাদের বাবা তাঁর ৫২তম জন্মদিনে হঠাৎই মারা গেলেন, মা ভেঙে না পড়ে সামলে নিলেন নিজেকে। কারণ, তাঁর সন্তানদের তখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

জীবনের অর্ধশতাব্দী পার করে আজ আমি পশ্চিমা দেশে মাস্টার্স, পিএইচডির সুযোগ পেয়েছিলাম তা আমার মা–বাবার ত্যাগের বিনিময়ে। তাঁদের ত্যাগ শুরু হয়েছিল আমার জন্মের সময় থেকেই। গত মাসে ছিল আমার ৫৫তম জন্মদিন, জন্মদিন না বলে জন্মতারিখ বলাই ভালো। ঘটা করে জন্মদিন পালন আমাদের ছিল না। মায়ের সঙ্গে কথা হলো ফোনে। মায়ের বয়স হয়েছে, দুইবার স্ট্রোক, দুইবার হার্ট অ্যাটাক, একবার বাইপাস সার্জারির ধকল নিয়েও আমাকে আগলে রেখেছেন দূর থেকে। আমার জন্মের সময়টি মায়ের খুব সুখের ও কষ্টের স্মৃতি, যা মা আমাকে প্রথম বলেছিলেন আমার কিশোর বয়সে। আবারও মা বললেন। তখন ’৭১ সাল। এপ্রিল মাসের শেষের দিক। ময়মনসিংহের (তৎকালীন জামালপুর) আমার নানাবাড়িতে খবর এল, পাঞ্জাবিরা গ্রামে ঢুকে গেছে। মানুষ পঙ্গপালের মতো দৌড়ে এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছিল। মায়ের তখন স্বাভাবিক নড়াচড়া করারও অবস্থা নেই। গরু বা মহিষের গাড়িতে ছাউনি দিয়ে নানি-খালারা মাকে নিয়ে বিলের ওধারে অজপাড়াগাঁয়ে এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরিবেশটি মায়ের জন্য সহনীয় না হওয়ায়, অগত্যা ফেলে যাওয়া বাড়িতেই ফিরে আসেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। তার পরদিনই আমার পৃথিবীতে আসা। কিন্তু তারপরও যে মাকে কতবার আমাকে বুকে নিয়ে এই গ্রামে, সেই গ্রামে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ নিতে হয়েছে, তা বলতে গিয়েই মায়ের গলা বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে…আমারও দুচোখ গড়িয়ে পানি এসে যায়। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে…এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত পতাকা…। ভেবে আশ্চর্য হই, যখন মিডিয়ায় দেখি, ’৭১–কে ভুলিয়ে দিতে কারও কারও নতুন নতুন নসিয়ত—ইতিহাস ইতিহাসের জায়গায় থাক…। মা, তুমিই আমার ’৭১, তুমিই আমার বাংলাদেশ।

লেখক: অধ্যাপক মোস্তফা সারোয়ার, নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র

ই–মেইল: [email protected]

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]