ফিনল্যান্ডের তুর্কুতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদ্‌যাপিত হলো ‘বাংলাদেশি কালচারাল ডে ২০২৬’

ছবি: লেখক

ফিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক শহর তুর্কুতে (পূর্বে ফিনল্যান্ডের রাজধানী ছিল) অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রবাসী বাঙালিদের ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলা ‘বাংলাদেশি কালচারাল ডে ২০২৬’। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মাঝে দেশীয় কৃষ্টি ও ঐতিহ্য ছড়িয়ে দিতে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘তুর্কু বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন’ (Turun Bangladeshilaisten Yhdistys-TBY) এক বিশেষ মেলা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে। মেলায় আবহমান বাঙালি খাবার, বাঙালি পোশাক ও বাঙালি সংস্কৃতিকে প্রদর্শন এবং চর্চার মাধ্যমে ভিনদেশে নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেন ফিনল্যান্ডপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। এ মেলা কেবল ফিনল্যান্ডে বাঙালিদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলাই নয়, বাঙালি নবপ্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতি লালনেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে আয়োজকেরা মনে করেন। পরে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান, কবিতা, নৃত্য ও বিভিন্ন মঞ্চপরিবেশনার মধ্য দিয়ে সুদূর ফিনল্যান্ডের বুকে প্রবাসীরা তুলে ধরেন একটুকরা বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন আদিবা ফারাহ ও জাহিদ লিংকন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত দর্শকমণ্ডলী ও অতিথিদের প্রতি সম্মান জানিয়ে সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশন করা হয়। সূচনাপর্বে আয়োজক সংগঠন টিবিওয়াই-এর দীর্ঘদিনের প্রেক্ষাপট ও সাংগঠনিক রূপরেখা তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি খাইরুল ইসলাম। তুর্কু শহরে আশি ও নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশিদের সামাজিক তৎপরতা বিদ্যমান থাকলেও কমিউনিটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৮ জুন সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে শতাধিক সক্রিয় সদস্য নিয়ে গঠিত এ সংগঠন নিয়মিত সামাজিক ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড, যেমন রমজানে ইফতার মাহফিল, কোরবানির ঈদ উদ্‌যাপন, ক্যারিয়ার উন্নয়ন সেমিনার এবং শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করে আসছে।

সাংস্কৃতিক পর্বের প্রথম চমক ছিল শিশুদের পরিবেশনায় ‘বাংলাদেশের ছয় ঋতু’ শীর্ষক বিশেষ মঞ্চ–উপস্থাপনা। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত—বাংলার এই বৈচিত্র্যময় ঋতুচক্রকে খুদে পরিবেশকেরা অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে মঞ্চে তুলে ধরে উপস্থিত সবার ভূয়সী প্রশংসা কুড়ায়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

অনুষ্ঠানের সাহিত্য ও আবৃত্তি পর্বে পরিবেশিত হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কবিতা ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, জনপ্রিয় কবিতা ‘নিমন্ত্রণ’ ও ‘আমার বন্ধু’। এ ছাড়া আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল একটি একক কি–বোর্ড ইনস্ট্রুমেন্টাল পরিবেশনা, যা দর্শককে সুরের ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়।

নৃত্য ও নাট্যপর্বে দেশীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলা হয়। ঐতিহ্যবাহী ‘লীলাবালি’ ও ‘রূপবান-এ নাচে’ গানের সঙ্গে মনকাড়া নৃত্য পরিবেশিত হয়। এর পাশাপাশি পরিবেশিত হয় ‘ভাসাব দোহারে’ এবং রবীন্দ্রসংগীত ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’-এর নান্দনিক নৃত্য। পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য তুলে ধরে পরিবেশিত হয় বিশেষ নৃত্য ‘পাহাড়ি উৎসব’। আধুনিক সমাজব্যবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবকে ব্যঙ্গাত্মক আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে মঞ্চস্থ হয় একটি একক রম্য নাটিকা ‘টিকটকার বান্ধবী’।

ছবি: লেখক

সংগীতের বিভিন্ন ধাপে পরিবেশিত হয় তুর্কুর জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড ‘নামছাড়া’–এর পরিবেশনায় কালজয়ী ও জনপ্রিয় বাংলা গানের একের পর এক পরিবেশনা। এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল ‘হারিয়ে যাও’, ‘আমার পথচলা’, ‘অপেক্ষা’, ‘তারায় তারায়’, ‘অন্ধ’, ‘ফিরিয়ে দাও’, ‘অসমাপ্ত’, ‘আলো’, ‘জাদুর শহর’, ‘বিস্ময়’, ‘বন্ধ জানালা’, ‘অবচেতন’, ‘পূর্ণতা’ এবং সব শেষে ঐতিহাসিক সংগীত ‘চলো বদলে যাই’। বাংলার মাটির সুরের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে লোকসংগীতের একটি বিশেষ ফিউশন পরিবেশনাও রাখা হয়। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি প্রকাশে পরিবেশিত হয় একটি ফিনিশ ভাষার গান ‘কেসায়ো’ (Kesäy)।

সমাপনী বক্তব্যে আয়োজক সংগঠনের পক্ষ থেকে সহসভাপতি মো. আবদুল্লাহ আল সাজ্জাদ উপস্থিত অভিভাবক, শিশু-কিশোর, স্বেচ্ছাসেবক এবং সাধারণ সদস্যদের সার্বিক সহযোগিতার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রবাসের মাটিতে নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা ও শিকড়ের সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুক্ত রাখা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য রক্ষা করাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। দর্শকের উষ্ণ করতালির মধ্য দিয়ে সফল ও সার্থকভাবে সমাপ্ত হয় ফিনল্যান্ডের তুর্কুর ‘বাংলাদেশি কালচারাল ডে ২০২৬’।