বাংলাদেশি গ্লোবাল মেরিনার্স রিইউনিয়ন ২০২৬

গাংচিল যেমন সমুদ্রের অস্থির আত্মা, সে উড়ে চলে অন্তহীন আকাশে, ডানায় ভর করে বয়ে নিয়ে যায় লবণাক্ত স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর নীরব গল্প। তার ভেতরে বয়ে চলে সমুদ্রের ডাক। ঠিক তেমনি, তীরে থিতু হওয়া নাবিকের বুকের গভীরেও থেমে থাকে না সেই সমুদ্র। বাইরে সে সংসার গড়ে, জীবনের হিসাব মেলায়; কিন্তু অন্তরে তার ঢেউ ওঠে নিরবধি। বন্দরের শব্দ, ভেজা বাতাসের গন্ধ, দূরে ভেসে আসা পাখির ডাক—সবকিছু তাকে অদৃশ্য এক টানে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই নীল দিগন্তে। সে হয়তো দিগন্ত ছেড়ে এসেছে; কিন্তু দিগন্ত কখনো তাকে ছাড়েনি।

এসব অস্থির হৃদয়ের মানুষগুলো, যাদের জীবনের বড় অংশ কেটেছে সমুদ্রযাত্রায়, তাদেরই এক আবেগভরা মিলনমেলা বসেছিল ক্যানবেরায়, ১০ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৬। গাংচিলের ঝাঁকের মতো ছুটে এসেছিল তারা—সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে, কানাডা, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দুবাই, বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। যেন সবাই এক অদৃশ্য স্রোতে ভেসে এসেছে—একই টানে, একই ভালোবাসায়।

সিডনি থেকে তিন ঘণ্টার পথ। ১০ এপ্রিল, স্ত্রী নীহারিকা আর ছেলে আরিয়ানকে নিয়ে যখন ক্যানবেরার পথে, তখন মনটা অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরে উঠছিল—এ যেন শুধু ভ্রমণ নয়, যেন ফিরে যাওয়া, বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া নিজের মানুষদের কাছে ফিরে যাওয়া। সূর্য যখন ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছিল, আমরা পৌঁছালাম সানডাউন ভিলা। ডাইনিং হলে ঢুকতেই যেন চোখে পড়ল এক টুকরো সমুদ্র—শতাধিক নাবিক আর তাদের পরিবার মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন শ মানুষ। কত চেনা মুখ, কত পুরোনো গল্প, কত না–বলা স্মৃতি—সব একসঙ্গে জেগে উঠল। মনে হচ্ছিল, সময় যেন হঠাৎ পেছনে ফিরে গেছে।

মাগরিবের নামাজের পর প্রয়াত আর অসুস্থ সহকর্মীদের জন্য দোয়া—সেই মুহূর্ত ছিল গভীর, নীরব আর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। কারও চোখে জল, কারও ঠোঁটে নিঃশব্দ প্রার্থনা। তখন মনে হচ্ছিল—আমরা শুধু সহকর্মী নই, আমরা একে অপরের জীবনের অংশ, একে অপরের গল্প।

১১ এপ্রিল—আনন্দ আর জীবনের উচ্ছ্বাসে ভরা এক দিন। ভোরের শান্তি দিয়ে শুরু হয়ে দিনভর হাসি, খেলাধুলা, গল্প আর একসঙ্গে থাকার আনন্দে কেটে গেল। বারবিকিউয়ের ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে ছিল বন্ধুত্বের উষ্ণতা। সন্ধ্যার কুইজ আর রাতের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সবকিছুতেই যেন দেশের গন্ধ, শিকড়ের টান। হাজার মাইল দূরে থেকেও মনে হচ্ছিল—আমরা সবাই একই আকাশের নিচে, একই হৃদয়ের মানুষ।

১২ এপ্রিল—একটু থেমে থাকার, একটু অনুভব করার দিন। শহর ঘোরা, আড্ডা, হাসির ফাঁকে কোথাও যেন লুকিয়ে ছিল সময় ফুরিয়ে আসার হালকা বিষণ্নতা। রাতের ফরমাল ডিনার, পুরস্কার বিতরণী আর ‘ধূমকেতু’র আবেগঘন পরিবেশনা—মঞ্চ যেন হয়ে উঠেছিল স্মৃতি আর অনুভূতির এক মিলনক্ষেত্র। সেখানে আনন্দ ছিল, গর্ব ছিল আবার ছিল এক অদৃশ্য বেদনা—এই মুহূর্তগুলো শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে।

১৩ এপ্রিল—বিদায়ের সকাল। আকাশ যেন একটু নীরব, বাতাসও যেন থমকে। শেষ ফটোসেশন, বিদায়ী দোয়া—সবকিছুতেই এক অদ্ভুত শূন্যতা। ১০৫টি পরিবার, প্রায় ৩৫০ জন মানুষ—এই কয়েক দিনে যেন এক পরিবার হয়ে গিয়েছিল। বিদায়ের সময় মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ফেলে যাচ্ছি আবার কিছু অমূল্য সঙ্গে নিয়েও ফিরছি।

খাবারের টেবিলেও ছিল অনুভূতির ছোঁয়া—টার্কিশ, ওরিয়েন্টাল আর বাংলাদেশি স্বাদের মেলবন্ধন, যা শুধু জিবে নয়, মনেও গেঁথে গিয়েছিল।

দিনভর নির্ধারিত অনুষ্ঠানগুলোর ব্যস্ততা শেষে, রাতে সস্ত্রীক আমরা কেউ কেউ জড়ো হতাম ডাইনিংরুমে—আড্ডার সেই আসর ছিল একেবারেই প্রাণবন্ত আর অবিরাম। কারও হাতে ঝালমুড়ি বানানোর তোড়জোড়, কারও কণ্ঠে ভেসে উঠত চেনা সুর; মুহূর্তেই সবাই মিলে গানে গানে মিশে যেতাম এক অদ্ভুত উষ্ণতায়।

হাসি, গল্প আর স্মৃতির রেশে সময় কখন যে গড়িয়ে যেত, টেরই পাওয়া যেত না। গভীর রাত পর্যন্ত চলত সেই আড্ডা, যেন সময়ও থমকে দাঁড়াত আমাদের সঙ্গে। এই পুনর্মিলনীতে, নীহারিকা আর আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠেছিল এই রাতজাগা আড্ডার আসর—যেখানে বন্ধনগুলো আরও গভীর আরও আপন হয়ে উঠেছিল।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশি নাবিকদের সংগঠন বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান মেরিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএমএ) উদ্যোগে ক্যানবেরার মাটিতে বর্ণিল আবহে যেন রচিত হলো এক আবেগঘন ইতিহাস।

সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল, পরিবারের সবাই নাবিকদের অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। এই চার দিনের স্মৃতি আমাদের ভেতরে রেখে গেল এক সমুদ্রভরা অনুভূতি—অসংখ্য হাসি, কিছু নীরব অশ্রু আর এক অদ্ভুত টান, যা আবারও আমাদের এক করবে—এই প্রত্যাশায়।

*লেখক: মাস্টার মেরিনার, সিডনির শিপিং কোম্পানি ন্যাশনাল অপারেশনাল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]