প্রবাসে ঈদ: ব্রেমেনে গড়ে ওঠা এক টুকরো বাংলাদেশ
ঈদ মানেই পরিবার, আপনজন আর একসাথে আনন্দ ভাগাভাগির মুহূর্ত। কিন্তু প্রবাস জীবনে সেই চেনা ঈদের সকাল, মায়ের হাতের রান্না কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সাথে কোলাকুলি- সবই যেন স্মৃতির ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে। তবুও দূর দেশ জার্মানির ব্রেমেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য এবারের ঈদুল ফিতর সেই শূন্যতাকে অনেকটাই ভরিয়ে দিয়েছে ভালোবাসা আর মিলনের উষ্ণতায়।
রমজানের শুরু থেকেই ব্রেমেনের বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটি একসাথে ইফতার, খতমে তারাবিহ এবং ধর্মীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে এক অনন্য বন্ধনের সৃষ্টি করে। সেই ধারাবাহিকতায় ঈদের দিন ব্রেমেন তাকওয়া মসজিদ-বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় ঈদের জামাত।
সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত এই জামাতে ব্রেমেনে বসবাসরত প্রায় সকল বাংলাদেশি একত্রিত হন। নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সবার প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। নামাজ শেষে যখন সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে 'ঈদ মোবারক' বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, তখন মনে হয় এখানেই যেন গড়ে উঠেছে আরেকটি পরিবার, আরেকটি বাংলাদেশ।
প্রবাসে ঈদের সবচেয়ে বড় অভাব থাকে পরিবারের সাথে সময় কাটানোর। কিন্তু ব্রেমেনের বাংলাদেশিরা সেই অভাব পূরণ করেছে নিজেদের মধ্যেই। একে অপরের হাসি, গল্প আর আন্তরিকতায় যেন তৈরি হয়েছে এক টুকরো দেশ। কেউ আর একা নয় সবাই যেন সবার আপনজন।
ঈদের আনন্দকে আরও রঙিন করে তুলতে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন পরিবেশনা। ছোট্ট সোনামণিদের পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত ও আবৃত্তি। পাশাপাশি ইসলামিক সংগীত পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল 'ঈদ মেজবান'। প্রবাসে থেকেও দেশীয় স্বাদ ফিরিয়ে আনতে সবাই নিজ নিজ এলাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার নিয়ে আসেন। মায়ের হাতের রান্নার স্মৃতি আর দেশের স্বাদ যেন একসাথে মিলেমিশে যায় এই খাবারের মাধ্যমে। নামাজ শেষে সবাই একত্রে বসে সেই খাবার উপভোগ করেন, যা শুধু একটি খাবার নয়, বরং আবেগ আর স্মৃতির এক মিলনমেলা।
শুধু দেশীয় নয়, মুসলিম বিদেশি বন্ধুদের অংশগ্রহণে তাদের দেশীয় খাবারও যুক্ত হয় এই আয়োজনে, যা এক ভিন্নধর্মী সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পরিবেশ তৈরি করে।
ঈদের এই আনন্দঘন আয়োজনে একসাথে ঘোরাঘুরি, ভেসার নদীর পাড়ে ফটোসেশন এবং সবার জন্য স্ন্যাকস ও পানীয়ের ব্যবস্থা ছিল। দুপুরে সবাই একত্রে জুমার নামাজ আদায় করেন।
প্রবাসে ঈদ কখনোই দেশের মতো হয় না, তবুও মানুষ মানুষের পাশে থাকলে, দূরত্ব আর একাকীত্ব হার মানে। ব্রেমেনের এই আয়োজন প্রমাণ করে, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, ভালোবাসা আর ঐক্যের মাধ্যমে আমরা নিজেরাই তৈরি করতে পারি এক টুকরো বাংলাদেশ।
লেখক:
তৌকির আহমেদ, অ্যারোস্পেস, সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার
ব্রেমেন, জার্মানি