১৮ কোটি মানুষ, ১৭ কোটি মত, এবার বোঝো গণতন্ত্রের ঠ্যালা

গণতন্ত্রচর্চায় নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা প্রধান পূর্বশর্ত। একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্রের লক্ষ্য অর্জন হয়েছে ভাবার কোনো কারণ বা অবকাশ নেইছবি: প্রথম আলো

বিশ্ব মানবাধিকার এবং বিশেষ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মানবসভ্যতা আজ পর্যন্ত যা অর্জন করেছে, তার ওপর একটি গভীর রিফ্লেকশন এখন জরুরি। খারাপ থেকে হয়তো কিছু ভালো হয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই উন্নতি কি আশানুরূপ। যদি আমরা অন্য ক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে তুলনা করি, বিশেষ করে প্রযুক্তির সঙ্গে, তাহলে স্পষ্ট বোঝা যায় মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সেই গতিতে এগোয়নি, যেভাবে এগোনোর কথা ছিল।

আজ আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মানুষের চিন্তা অনুকরণ করছি, মঙ্গলগ্রহে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখি, অথচ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এখনো ভোট দিয়ে ক্ষমতা বদলাতে পারে না। প্রযুক্তি উড়ছে, গণতন্ত্র হাঁটছে, আর মানবাধিকার অনেক জায়গায় এখনো হামাগুড়ি দিচ্ছে।

এই জায়গায় একটি পুরোনো গল্প খুব প্রাসঙ্গিক। জানি না আপনি আগে শুনেছেন কি না, কিন্তু এই গল্প গণতন্ত্রের জন্ম ও তার মৌলিক সমস্যাটা ব্যাখ্যা করতে আশ্চর্য রকম কার্যকর।

একসময়, সম্ভবত প্রাচীন গ্রিসে, একটি শিল্পকারখানার মালিক ছিলেন যিনি তাঁর সব শ্রমিককে প্রতিদিন একই খাবার দিয়ে লাঞ্চ দিতেন। মালিকের ধারণা ছিল তিনি খুব উদার। খাওয়ার ব্যবস্থা আছে, কাজের পরিবেশ আছে, আর কী চাই। কিন্তু হঠাৎ একদিন তিনি জানতে পারলেন শ্রমিকদের মধ্যে লাঞ্চ নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ। প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিক তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। কেউ বলছে খাবার একঘেয়ে, কেউ বলছে পুষ্টিকর নয়, কেউ বলছে এটা অপমানের শামিল।

মালিক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন। কারণ, তিনি বুঝতেন, ক্ষুধার্ত বা অসন্তুষ্ট শ্রমিক দিয়ে উৎপাদন বাড়ে না। বরং তারা একদিন কাজ ছেড়ে চলে যাবে। তখন কী করা যায়। তিনি ডাকলেন রাষ্ট্রের জ্ঞানীগুণীদের। সেই সময় গ্রিসে জ্ঞানী ব্যক্তির অভাব ছিল না।

একজন মনীষী সমাধান দিলেন। বললেন, ঠিক আছে, সবাই যার যার মতামত জানাও, তোমরা লাঞ্চে কী খেতে চাও। শ্রমিকেরা কথা বলল। কেউ মাছ চায়, কেউ মাংস, কেউ নিরামিষ, কেউ গরম খাবার, কেউ ঠান্ডা। সব মতামত একত্র করে মালিক দেখলেন এক অদ্ভুত চিত্র। মাত্র ২০ শতাংশ শ্রমিক তাঁর দেওয়া খাবারেই খুশি। কিন্তু বাকি ৮০ শতাংশের মধ্যে এমন ভয়াবহ মতভেদ যে কোনো একটি বিকল্পের পক্ষেই ২০ শতাংশের বেশি সমর্থন নেই।

মালিক তখন শ্রমিকদের ডেকে বললেন, দেখো, তোমাদের মধ্যে যে দলটি আমার দেওয়া লাঞ্চ পছন্দ করে, তাদের সংখ্যা ২০ শতাংশ। তোমরা যারা অসন্তুষ্ট, তোমাদের মধ্যে কেউই একমত নও। তাই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার মতো কোনো ঐকমত্য নেই। আমি তো কারও মতের বিরুদ্ধে কিছু করছি না। কাজেই এই বিষয়ে আমার আর কিছু করার নেই।

খবরটি তখন গ্রিসের বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়ে। বিতর্ক শুরু হয়। শেষে গ্রিক জাতি এক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, গণমাধ্যম থাকবে, আর সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনই হবে সব সিদ্ধান্তের ভিত্তি। এভাবেই গণতন্ত্রের বীজ রোপিত হয়।

এবার বোঝো ঠ্যালাটা কোথায়।

এই ঠ্যালা এতই নিষ্ঠুর যে আজ বাংলাদেশে তাকালেই তার ফলাফল দেখা যায়। ১৮ কোটি মানুষের দেশে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ মানুষের মধ্যে দ্বিমত আছে, মতভেদ আছে, বিভক্তি আছে। কেউ ধর্মে, কেউ জাতিতে, কেউ শ্রেণিতে, কেউ আদর্শে বিভক্ত। ফলাফল কী হয়। আমলারা সব সময় সুসংগঠিত থাকে। তারা একত্রে সিদ্ধান্ত নেয়, একত্রে কাজ করে, আর শেষ পর্যন্ত যেটা তারা চায় সেটাই বাস্তবায়িত হয়।

১৮ কোটি মানুষের যদি ১৭ কোটি মত থাকে, তখন মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ যদি একত্রিত হয়ে কিছু করতে চায়, সেটাই গণতন্ত্র চালানোর জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় বাংলাদেশের ৫ শতাংশ ধনী গোষ্ঠী। তারা রাতারাতি রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য নেতাদের কিনে ফেলে। আর সাধারণ মানুষ মনে করে, ভোট দিলাম, নির্বাচন করলাম, কিন্তু কিছুই বদলালো না।

কেন বদলাবে। কারণ, গরিবের কোনো সংগঠিত নেতৃত্ব নেই। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ জুলাই আন্দোলন। ক্ষোভ ছিল, সাহস ছিল, মানুষ ছিল, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব ছিল না।

এই বাস্তবতাটা ট্রাম্প কিছুটা বুঝতে পেরেছেন। গ্রিক দার্শনিকদের সেই পুরোনো পাঠ তিনি নিজের মতো করে কাজে লাগাচ্ছেন। তাই তিনি অনেক কিছুই ডোন্ট কেয়ার করে নিজের ইচ্ছেমতো করেন। প্রশ্ন হলো, তিনি কি গণতন্ত্রের মন্ত্র ধ্বংস করতে চান, নাকি তিনি কেবল এই নির্মম সত্যটাই বুঝে গেছেন যে বিভক্ত জনতার ওপর শাসন করা সবচেয়ে সহজ।

আমরা কি এখনো লাঞ্চের মেনু নিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াই করব, নাকি বুঝব যে ঐক্য ছাড়া গণতন্ত্র কেবল অন্যের সুবিধার একটি ব্যবস্থা মাত্র।

*লেখক: রহমান মৃধা, সুইডেন

[email protected]

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]