বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো বিভাগ বা অনুষদ খোলা হয় না, যা কিনা সমাজ, দেশ বা মানবসভ্যতার জন্য প্রয়োজন নেই। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আপনি যদি বিজ্ঞানী না হতেন তাহলে কী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি ছিল—উত্তর এসেছিল ‘আমি হয়তো পিয়ানো বাজাতাম।’ সে সারা দিন ল্যাবে কাজ করে হয়তো চাইবে সন্ধ্যায় থিয়েটারে যেতে। এ থিয়েটার-নাটক এসব নিয়ে হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস হচ্ছে। মিলিয়ন ডলারের নতুন কোনো প্রজেক্টের মিটিং শেষে আপনার হয়তো ইচ্ছা হবে ভালো কোনো ডায়েট খাবার নিতে—ভবিষ্যতে এ সুষম বা ডায়েট খাবার নিয়ে কেউ হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে গবেষণা করছে। রোহিঙ্গা ইস্যু বা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আজ সেমিনার হচ্ছে, আবার এসব সভা-সেমিনারকে ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে হয়তো একসময় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়েছে বছরের পর বছর। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করা কোনো তুখোড় ছাত্র বা গবেষক হয়তো খুঁজে বেড়াচ্ছে ভাষার এমন কাউকে, যে কিনা বাংলায় নির্দেশনা দেওয়া কোনো রোবটের জন্য ভাষা-মনোবিজ্ঞানের ব্যাপারে সহায়তা করতে পারে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ হয়তো মানবসভ্যতার ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, আবার একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র হয়তো প্রোগ্রামিং–বিষয়ক আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দুই বন্ধু হয়তো কাজ করছে আগামীর পৃথিবীর জন্য ‘Vertical Farming Management’ নিয়ে।

মেডিকেলের কোনো শিক্ষার্থী হয়তো কোনো পরিবহন প্রকৌশলী বা নগর পরিকল্পনাবিদের খোঁজ করছে—জ্যামের কারণে গাড়িতে বসে থাকাটা আমাদের কিডনি ক্ষয়ের কতটুকু কারণ, সেই বিষয়ে গবেষণা করার জন্য। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষকের গবেষণার ওপর হয়তো বাংলাদেশের সব কটি নদী নিয়ে একটি ডেটাবেজ অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। ইংরেজি ভাষাবিজ্ঞানের কিছু ছাত্রছাত্রী হয়তো বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রচলিত ইংরেজি কারিকুলামের আধুনিক শিক্ষায় যথার্থতা নিয়ে গবেষণা করছে। ইলিশ মাছের গুণাগুণ ঠিক রেখে কীভাবে পুকুরে চাষ করা যায় কিংবা বাংলার রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে কি চীনাদের পান্ডাদের মতো ব্যাপকভাবে ফিরিয়ে নিয়ে আসে যায় কি না—এসব বিষয় নিয়ে হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী তাদের আগামীকালের অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে ব্যস্ত।

ওপরের গল্পগুলো অনেকের কাছে কাল্পনিক মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের দেশের বিভিন্ন বিষয়ের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু ছেলেমেয়ে নীরবে নিভৃতে এভাবেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে দিন কাটায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় শেষে সফলতার দেখা পায়। প্রশ্ন আসতে পারে, অমুক বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে আমি কি চাকরির বাজারে টিকে থাকতে পারব? চাকরির বাজার পরিবর্তন হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে যে বিষয়ের চাকরির বাজার ভালো, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষে সে বিষয়ের চাকরির বাজার একই রকম না–ও থাকতে পারে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক মুক্তি অনেক সময় সর্বাধিক গুরুত্ব পেলেও শিক্ষার উদ্দেশ্য থেকে সরে আসাটা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের বড় অন্তরায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্তির দিন পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীর কতটুকু পরিবর্তন হলো, ডিগ্রির চেয়ে সেটাই মুখ্য। এ পরিবর্তন তাকে পরিবর্তনশীল এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে সহায়তা করবে। চাকরি-চাকরি করে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকে নিজেকে হারিয়ে ফিরেছে, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে জীবনের প্রথম কম্পিউটার কি–বোর্ডে হাত দেওয়া ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সময় দ্রুত চলে, পরিবর্তন ঘটে প্রতিনিয়ত। গ্লোবালাইজেশনের এ যুগে হলিউডের টপচার্ট মেনে মুভি দেখা ছেলেটা যখন মিড-টার্ম পরীক্ষার জন্য ফটোকপি দোকানে খোঁজ নেবে—বুঝতে হবে সে নিজের পরিবর্তনে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যেকোনো বিষয়ের ওপর অনেক অনলাইন কোর্স এখন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায়। অজুহাত আর সিস্টেমের ভুল ধরে সময় ব্যয় না করে, নিজের বিষয়কে ভালোবেসে লেগে থাকলে সফলতা পাওয়াটা সময়ের ব্যাপার।

আমার এ কথাগুলো অনেকের ভালো না–ও লাগতে পারে। কিন্তু যারা পৃথিবীময় বিকশিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের নিজেদের পাড়ি দেওয়া ভুল পথে ঠেলে দেওয়াটা অন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য শুভকামনা। তোমাদের পথচলা হোক জ্ঞানের অন্বেষণে একটি মুক্তচিন্তা, বৈষম্যহীন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের চেষ্টায়।


* লেখক: মাহমুদুল হাসান, পিএইচডি গবেষক, ভার্জিনিয়া টেক, যুক্তরাষ্ট্র ও সহকারী অধ্যাপক, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।