ছায়ানদী

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

নদী যাদের নাম জানে—

ভোরের আগের সময়টুকু সুন্দরবনের নদীগুলো নিজেদের নাম ভুলে যায়। তখন তারা আর পশুর মতো হিংস্র নয়, মানুষের মতো নিরীহও নয়—তারা শুধু সাক্ষী। কুয়াশা নামলে জল আর আকাশ এক হয়ে যায়, আর সেই মিলনস্থলেই জন্ম নেয় সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা।

ট্রলারটা চলছিল নদীর বুক চিরে। ইঞ্জিনের একঘেয়ে শব্দের সঙ্গে মাঝিদের নিশ্বাস মিশে যাচ্ছিল। কেউ কথা বলছিল না। কথা বললে নাকি নদী রেগে যায়,এই বিশ্বাস এখানে পুরোনো।

হঠাৎ পাশের ট্রলার থেকে চিৎকার।

তারপর গুলি।

শব্দটা নদীর ওপর পড়ে ছড়িয়ে পড়ল না, বরং কুয়াশার ভেতর আটকে গেল। কয়েকজন মানুষ ছায়ার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুখ দেখা গেল না, কিন্তু হাতগুলো চেনা। এই হাতগুলো বহু বছর ধরে নদীর আইন বদলে দিয়েছে।

একজন মাঝি চোখ বন্ধ করল। সে জানত, চোখ খোলা রাখলে আজীবনের বোঝা বইতে হবে।

দূরে পুলিশের ওয়্যারলেস কেঁপে উঠল—

‘গোলপাতার ঘের পার হয়েছে... সন্দেহ ডাকাত কেরামতের দল...রেডি ইউনিট থ্রি।’

নদী কোনো উত্তর দিল না। সে জানে, মানুষের বিচার তার কাছে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়!

কেরামত: একজন বাবা

কেরামতের জন্ম হয়েছিল দারিদ্র্যের ভেতর, কিন্তু সে দারিদ্র্যকে কখনো ক্ষমা করেনি। প্রথম খুন করেছিল ২০ বছর বয়সে। সেদিন রাতে সে বমি করেছিল অনেক। এখন আর করে না।

জঙ্গলের গভীরে তার ঘরটা যেন মানুষের নয়—কোনো ছবি নেই, কোনো স্মৃতি নেই। এখানে সময় থেমে থাকে।

আগুনের সামনে বসে সে জালালের দিকে তাকাল।

—তোর নামে হুলিয়া হয়েছে।

—জানি।

—দুজন পুলিশ মরছে।

—শুনিছি।

কেরামত চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল,

—আমি তোকে বাঁচাতে পারি। কিন্তু তার দাম আছে।

—আমি দাম দিতে শিখেছি। আপনার ছায়াতেই!

কেরামত উঠে দাঁড়াল।

—হাওরে যাবি। আমার শ্বশুরবাড়ি।

জালাল মাথা তুলল।

—সখিনার কাছে?

এই নামটা কেরামতের গলায় অন্য রকম শোনাল।

—হ্যাঁ। কিন্তু মনে রাখবি—ও কিছু জানবে না। জানলে তুইও বাঁচবি না, আমিও না। আমার মেয়ের জীবন বাচাতে নজরবন্দি করে রাখবি।

এই কথাটা সে বলেছিল ডাকাত কেরামত হয়ে নয়,একজন ভয় পাওয়া বাবা হয়ে।

সখিনার পৃথিবী

হাওরের বাড়িটায় কেরামত বছরে দুই বার আসে। আসে মানে—রাতে আসে, ভোরে চলে যায়। সখিনা ছোটবেলা থেকেই শিখেছে, আব্বা মানে প্রশ্নহীন ভালোবাসা!

একবার সে জিজ্ঞাসা করেছিল,

—আব্বু, আপনি এত দূরে থাকেন কেন?

কেরামত বলেছিল,

—দূরে থাকলে তোকে কাছ থেকে দেখা যায়।

সখিনা তখন বুঝতে পারেনি। এখনো পুরো বোঝে না।

তার পৃথিবী ছোট—হাওর, উঠোন, বৃষ্টি, আর অপেক্ষা।

দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

জালালের আগমন

সেদিন বৃষ্টি থামেনি। উঠোনে কাদা, আকাশ ভারী। সখিনা গাছের পাতা সরাচ্ছিল, এমন সময় একজন ভেজা মানুষ এসে দাঁড়াল।

—কে আপনি?

লোকটা একটু থেমে বলল,

—আপনার আব্বা পাঠিয়েছেন।

এই কথাটার ভেতরেই সখিনার সব বিশ্বাস।

—নাম?

—জালাল।

সে লক্ষ করল লোকটার চোখে ঘুম আছে, কিন্তু মিথ্যে নেই।

ভালোবাসা যেভাবে আসে

দিনগুলো ধীরে এগোল।

জালাল মাছ ধরতে যায়।

সখিনা রান্না করে।

রাতে ছাদে বসে তারা নীরবতা ভাগ করে নেয়।

একদিন সখিনা জিজ্ঞাসা করল,

—আপনি কি কাউকে মেরেছেন?

জালাল অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—হ্যাঁ।

—তাহলে আপনি খারাপ মানুষ।

—হয়তো। কিন্তু আমি আর খারাপ থাকতে চাই না।

এই কথাটার ভেতরেই ভালোবাসা ঢুকে পড়ল। কোনো ঘোষণা ছাড়াই।

পিতৃত্বের ভয়

জঙ্গলে কেরামত অস্থির হয়ে উঠছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে তাকে আরও কাছে ঠেলে দিয়েছে আগুনের। জালাল যদি সব সত্য বলে দেয় সখিনার কাছে, কেরামত হারিয়ে ফেলবে তার মেয়েকে। এত বছর দূরে রেখেও যে মেয়ের জন্য গোপনে কাদে কেরামত!

মকসুদ বলল,

—হাওরে যাই?

কেরামত চোখ বন্ধ করল।

—হ্যাঁ। জালালরে কুমিরের পেটে দিয়া দে।

এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সে প্রথম বুঝল—ক্ষমতা দিয়ে সব রক্ষা করা যায় না। যেমন জালালের জন্য তার মায়া!

পত্রিকার দেয়াল

হাটে গিয়ে পত্রিকার দেয়ালে সখিনার চোখ আটকে গেল।

‘জোড়া খুনের আসামি জালাল’

তার হাত কাঁপছিল। বৃষ্টি ভিজে সে বাড়ি ফিরল।

—তুমি কে?

—আমি এমন একজন, যে তোমার জন্য বদলাতে চেয়েছিল।

—আমার আব্বা কী করে?

জালাল চুপ করে রইল।

এই চুপটাই ছিল সখিনার কাছে সবচেয়ে জোরালো চিৎকার!

সত্যের ভার

সখিনা সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। ঘরের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ যেন প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে একটি করে প্রশ্ন ফেলছিল।

জালাল উঠোনে বসে ছিল, মাথা নিচু করে।

—তুমি যদি আগে বলতে...

সখিনা বলল, গলায় অভিযোগ নয়, ক্লান্তি।

—আগে বললে তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে? জালাল জিজ্ঞাসা করল।

—না।

—তাহলে?

এই ‘তাহলে’-র কোনো উত্তর নেই। কিছু সত্য শুধু সময় চায়, ক্ষমা চায় না।

সখিনা জানত তার আব্বা তাকে আগলে রাখতে গিয়ে একটা দুনিয়া তৈরি করেছে, যার ভেতরে ঢুকলেই রক্ত লেগে যায়। সে এখন সেই দুনিয়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

পালানো

তারা পালাল ভোরের আগে। হাওড় তখনো ঘুমাচ্ছে।

নৌকাটা ধীরে নদীতে নামল। চারপাশে কুয়াশা, যেন নদী নিজেই তাদের ঢেকে দিচ্ছে।

—আমরা কি পারব?

সখিনা ফিসফিস করে বলল।

—পারব না জানি বলেই যাচ্ছি।

জালাল বলল।

পেছনে পড়ে থাকল বাড়ি, উঠোন, শৈশব।

সামনে শুধু জল।

অনুসরণ

মকসুদের ট্রলার দ্রুত ছোটে। ইঞ্জিনের শব্দে নদীর বুক ফেটে যাচ্ছে। মকসুদ জালাল মুখোমুখি।

—কেরামতের সালাম নিস।

সে হাসল।

এই অনুসরণে ব্যক্তিগত কিছু নেই। এখানে শুধু আদেশ আর আনুগত্য। কেরামত জঙ্গলে বসে ছিল। দূরে গুলির শব্দ শোনার আগেই সে বুঝে গিয়েছিল—সে তার মেয়েকে শেষবারের মতো ছুঁয়েছে বহু বছর আগে।

নদীর মাঝখানে

নদীর মাঝখানে সংঘর্ষটা খুব দ্রুত হলো।

জালালের শরীরে গুলি লাগল। রক্ত জলে মিশে গেল।

সখিনা চিৎকার করতে চেয়েও পারল না। গলা আটকে গেল।

মকসুদ ট্রলার ঘুরিয়ে নিল।

—শেষ করবি নাকি?

কেউ জিজ্ঞাসা করল।

মকসুদ তাকাল সখিনার দিকে। হঠাৎ তার মনে হলো,এই চোখ সে আগেও দেখেছে। ভয় নয়, প্রশ্ন।

সে ট্রলার ঘুরিয়ে নিল।

—মরা মানুষরে কয়বার মারা যায়!

নদী কাউকে জানাল না—জালাল বেঁচে আছে, না মরে গেছে।

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

কেরামতের শাস্তি

পরদিন সকালে কেরামত খবর পেল—জালাল নিখোঁজ, সখিনার কোনো খোঁজ নেই। সে চিৎকার করল না।

অস্ত্র তুলল না। সে শুধু বসে রইল। প্রথমবার তার মনে হলো—সে হেরেছে। পুলিশের কাছে নয়, নিজের মেয়ের কাছে।

কয়েক মাস পর এক ভোরে সুন্দরবনের ভেতর থেকে তার লাশ উদ্ধার হলো।

গুলির চিহ্ন নেই।

খবরের কাগজে লেখা হলো—

‘ডাকাত কেরামতের মৃত্যু: রহস্যজনক’

কেউ জানল না, সে নিজেই নদীতে নেমেছিল কি না।

নিখোঁজ জীবন

জালাল বেঁচে ছিল।

কিন্তু সে আর আগের জালাল নয়।

শরীরে গুলির দাগ, মনে অনন্ত ক্ষত।

একটা শহরে তারা আশ্রয় নিল। যেখানে কেউ তাদের নাম জানে না। সখিনা কোনোদিন আর তার আব্বার কথা তুলল না। জালালও ক্ষমা চাইল না। নীরবতা তাদের সংসারের নিয়ম হয়ে গেল।

সন্তানের জন্ম

ছেলেটার জন্মের রাতে জালাল প্রথম কাঁদল।

এই কান্না অপরাধের জন্য নয়, ভয়ের জন্য।

—আমার পাপ কি ও বইবে?

সে ভাবল।

সখিনা শুধু বলেছিল,

—ও যেন সত্য নিয়ে বড় হয়।

এই কথাটাই ছিল জালালের যাবজ্জীবন শাস্তি।

নদীর ধারে

বহু বছর পর।

একটি ছোট শহর। পরিচিত নয় এমন নদী।

জালাল দাঁড়িয়ে থাকে প্রায়ই। কথা বলে না।

ছেলেটা একদিন জিজ্ঞাসা করল,

—আব্বু, তুমি এত চুপ কেন?

জালাল বলল,

—কারণ, আমি এক জীবনে অনেক কথা বলেছি। এখন আর কথা খুঁজে পাই না!

ছায়ানদী

তখন সন্ধ্যা নামে। ছেলেটা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—আব্বু, নদীতে ছায়া পড়ে কেন?

জালাল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,

—কারণ আলো সব সময় সাহসী হয় না। কিছু আলো ছায়া হয়ে বাঁচে!

সখিনা দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিল। তার মনে হলো এই নীরবতাই তাদের শাস্তি।

এই বেঁচে থাকাই বিচার।

নদী বইতে থাকে।

ছায়া নিয়ে।

অপরাধ নিয়ে।

কোনো রায় ছাড়াই!

লেখক: হিমু আকরাম, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। হাইপয়েন্ট স্ট্রিট, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র।