আয়ারল্যান্ডে নাগরিকত্ব আইনে শিগগিরই আসছে বড় পরিবর্তন

আয়ারল্যান্ড

আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন ৭ সেপ্টেম্বর দেশটির সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, এখন থেকে আয়ারল্যান্ডে নাগরিকত্বপ্রত্যাশীদের জন্য নতুন নিয়ম চালু হতে যাচ্ছে। আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি অফলির টুলামোরে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দল ফিনা ফলের এক আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আয়ারল্যান্ডের জাতীয় গণমাধ্যম আরটিই সূত্রে এ খবর পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, তাঁর সরকার আয়ারল্যান্ডের নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়ায় (ন্যাচারালাইজেশন সিস্টেম) এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে চলতি সপ্তাহেই আলোচনা করতে যাচ্ছে; যার মাধ্যমে তাঁর ভাষায় আইরিশ নাগরিকত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে একটি ‘ভারসাম্য’ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অপর দিকে আয়ারল্যান্ডের বিচার, স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী জিম ও’ক্যালাহান জানিয়েছেন, ‘আইরিশ ন্যাশনালিটি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬’ বুধবার আলোচনার জন্য আইরিশ মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে। মন্ত্রী জিম ও’ক্যালাহান মনে করেন, এই পরিবর্তন এক প্রজন্মের মধ্যে নাগরিকত্ব আইনের সবচেয়ে বড় সংস্কার।

নতুন পরিকল্পনায় একটি অন্যতম শর্ত হলো আইরিশ নাগরিকত্বপ্রত্যাশীদের অবশ্যই এখন থেকে দেশটিতে কমপক্ষে আট বছর ধরে বসবাস করতে হবে; যে সময়সীমা বর্তমান পাঁচ বছর রয়েছে। এ ছাড়া আবেদনকারীদের একটি ভাষা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে (যার মধ্যে ইংরেজি ও আইরিশ ভাষার প্রাথমিক বিষয়গুলোর সঙ্গে পরিচিতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং আইরিশ নাগরিক-জ্ঞান বা ‘সিভিকস’ (civics) সম্পর্কেও ধারণা থাকতে হবে)। সেই সঙ্গে প্রমাণ করতে হবে যে নাগরিকত্ব পেতে ইচ্ছুক ব্যক্তি আয়ারল্যান্ডে বসবাস করতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। অর্থাৎ, আবেদনের তারিখের আগের নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত তিনি কোনো বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা ভাতা বা সহায়তা গ্রহণ করেননি। তা ছাড়া আয়ারল্যান্ড ও সে দেশের মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা এবং নাগরিকত্ব লাভের পাশাপাশি সমাজে অবদান রাখার সক্ষমতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও এসব শর্তের অংশ হবে। ক্ষমতাসীন সরকারের মতে, এসব পরিবর্তন আয়ারল্যান্ডকে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে সহায়তা করবে। এ সময় আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, ‘আমাদের অভিবাসনব্যবস্থা এখন অনেক বেশি দৃঢ় ও শক্তিশালী; আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমছে এবং গত ১২ মাসে তা হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি, আশ্রয়প্রার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটিও এখন অনেক বেশি দক্ষ ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।’

লেখক

অন্যদিকে অভিবাসনমন্ত্রী ও’ক্যালাহান জানান, পরবর্তী সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে জনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য মন্ত্রীর হাতে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা প্রদান করা হবে এবং নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত ও সহজতর করার ব্যবস্থা করা হবে।

তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত জানিয়েছেন আয়ারল্যান্ডের লেবার পার্টির বিচারবিষয়ক মুখপাত্র অ্যালান কেলি। বিচারমন্ত্রীর প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন যেন বসবাসের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করার প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়। তাঁর মতে, নাগরিকত্ব পাওয়ার অপেক্ষার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করার বিষয়টি আয়ারল্যান্ডের অভিবাসনব্যবস্থার উন্নতির কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টার চেয়ে বরং রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির কৌশল। পাশাপাশি লেবার পার্টির অন্য একজন নেতার মতে, ‘নাগরিকত্ব সফলভাবে সমাজের মূলধারায় মিশে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে প্রস্তাবিত নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে কর্মী আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আয়ারল্যান্ডের সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

এদিকে অভিবাসন সহায়তা সংস্থা ‘ডোরাস’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জানিয়েছেন যে নতুন প্রস্তাবগুলোর ‘কোনো কার্যকর উদ্দেশ্য নেই’। জন ল্যানন আরটিই–এর ‘নিউজ অ্যাট ওয়ান’ অনুষ্ঠানে বলেন যে আইরিশ নাগরিকত্ব পাওয়া এমনিতেই বেশ কঠিন। তিনি এই প্রস্তাবগুলোকে ‘বেশ কঠোর’ ও ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে অভিহিত করেন। ল্যানন জানান, ডোরাস এমন অনেক মানুষকে দেখেছে, যাঁদের নাগরিকত্বের আবেদন গৃহীত হওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, অথবা দেশের বাইরে সময় কাটানোর কারণে আবেদন বাতিল হয়ে গেছে।

প্রস্তাবিত নীতিমালায় ভাষা-সংক্রান্ত যে শর্তের কথা বলা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে ল্যানন মনে করেন, সরকার যদি এমনটা প্রত্যাশা করে, তবে ভাষা শেখার ক্লাসে অংশগ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘সামগ্রিকভাবে অভিবাসীদের জন্য ওরিয়েন্টেশন বা পরিচিতিমূলক কর্মসূচিতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। কারণ, তা ছাড়া তাঁরা আইরিশ সমাজে পুরোপুরি মিশে যেতে পারবেন না।’

ল্যানন আরও যোগ করেন, নাগরিকত্ব না থাকায় অভিবাসীদের নিয়মিতভাবে তাঁদের ‘স্ট্যাম্প’ বা অভিবাসন অনুমতির জন্য আবেদন করতে হয়, যার প্রতিটির জন্য ৩০০ ইউরো খরচ করতে হয়। এর অর্থ হলো, এখানে নিজেদের অবস্থান বা মর্যাদা নিয়ে তাঁরা সব সময় একধরনের অনিশ্চয়তায় থাকেন এবং যেকোনো সময় তাঁদের অভিবাসন অনুমতির আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে।

তথ্যসূত্র: আরটিই

*লেখক: রাইসুল সৌরভ: আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব গলওয়েতে বিচারিক সিদ্ধান্তে এলএলএমের ব্যবহারবিষয়ক ডক্টরাল গবেষক

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]