আমাদের চেতনার দীপশিখা: অধ্যাপক যতীন সরকার

অধ্যাপক যতীন সরকারফাইল ছবি

কিছু মৃত্যু শুধু একটি জীবনের অবসান ঘটায় না, একটি যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করে। অধ্যাপক যতীন সরকারের প্রয়াণ আমাদের জন্য তেমনই এক শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। ৮৯ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক বিশাল উত্তরাধিকার—আমাদের মননে, চিন্তায় ও বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন আমাদের অনেকের শৈশব-কৈশোরের দীপশিখা।

আমাদের প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সঙ্গে যতীন স্যারের নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নব্বইয়ের দশকের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, যখন আমরা সংগঠন গড়ার স্বপ্নে বিভোর। আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ বা আমাদের আঙিনা—শহরের এমন কোনো প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক মঞ্চ ছিল না, যেখানে তাঁর সরব পদচারণ ছিল না। আমাদের প্রতিটি আয়োজনে, প্রতিটি আমন্ত্রণে তাঁর ছিলেন এক অনিবার্য ও উজ্জ্বল উপস্থিতি। তাঁর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন ছিল না; তিনি ছিলেন আমাদেরই একজন, আমাদের অভিভাবক।

যতীন স্যারের তেজোদীপ্ত বক্তৃতা, সত্য উচ্চারণের সাহস আর স্বতন্ত্র ভঙ্গি আমাদের তরুণ মনকে অনুপ্রাণিত করত। তাঁর মার্ক্সবাদী চিন্তাভাবনা সেই বয়সেই আমাদের অনেকের চোখ খুলে দিয়েছিল, প্রগতির ধারায় সম্পৃক্ত হতে শিখিয়েছিল। আমরা তাঁর বক্তৃতার ভক্ত ছিলাম। সেই মঞ্চে তিনি শুধু একজন বক্তা থাকতেন না, হয়ে উঠতেন হ্যামেলিনের সেই বাঁশিওয়ালা, যাঁর আদর্শ, চেতনা আর বুদ্ধির সুরে আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো হাঁটতাম।

মানুষটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল আরও গভীর, আরও ব্যক্তিগত। তিনি ছিলেন আমার বাবার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও বন্ধু। একই কলেজে পড়ানো থেকে শুরু করে শহরের সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁরা ছিলেন সহযোদ্ধা। সেই সূত্রে তিনি আমাদের পরিবারেরও একজন হয়ে উঠেছিলেন। তাই সম্পর্কের রসায়নটাও ছিল দ্বৈত। সংগঠনের মঞ্চে তিনি ছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় ‘স্যার’, আর পারিবারিক আবহে তিনি হয়ে যেতেন আমাদের প্রিয় ‘যতীন কাকা’।

‘দূর পরবাস’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

প্রবাসে আসার পর অনেক দিন যতীন স্যারের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি, কথা হয়নি। কিন্তু তিনি তো হারিয়ে যাওয়ার মানুষ নন। তাঁর লেখা, তাঁর কলাম আর বিশেষ করে তাঁর সেই অমোঘ বক্তৃতাগুলো আমাদের স্মৃতিতে চিরভাস্বর। তাঁর আদর্শকে, তাঁর চেতনাকে, তাঁর সেই বুদ্ধিদৃপ্ত কথাগুলোকে আমরা অনুসরণ করতাম। তিনি ছিলেন সেই পথিক, যিনি আমাদের প্রজন্মের জন্য পথ দেখিয়েছেন।

আজ তিনি লোকান্তরে, কিন্তু আমাদের চেতনার জগতে যতীন স্যার, আমাদের যতীন কাকা সব সময় আছেন এবং থাকবেন, জ্বলবেন দীপশিখা হয়ে । যে জ্ঞান, সাহস আর সত্যনিষ্ঠার আলো তিনি আমাদের মধ্যে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, তা কখনো নেভার নয়।

শান্তিতে থাকুন, আমাদের প্রিয় অধ্যাপক। আপনার দেখানো পথেই যেন আমরা চলতে পারি।

*লেখক: সোহেল আজাদ, জুরিখ, সুইজারল্যান্ড