রাইজআপ নিউইয়র্ক সিটির লিডারশিপ সামিটে প্রার্থীদের শক্তিশালী কমিউনিটি বিনির্মাণে পাশে থাকার অঙ্গীকার
৭ ফেব্রুয়ারি শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের অদূরে কুইন্সে উডসাইডে গুলশান টেরেসে রাইজআপ নিউইয়র্ক সিটির ব্যানারে তৃতীয় বার্ষিক লিডারশিপ সামিট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রার্থীদের এজেন্ডা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পছন্দের প্রার্থী বাছাইয়ের পথ সুগমের একটি ব্যতিক্রমধর্মী চমৎকার অনুষ্ঠান তৃতীয়বারের মতো আয়োজন করে সংগঠনটি।
তীব্র কনকনে শীত উপেক্ষা করে বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ, নিউইয়র্ক স্টেটের কম্পট্রোলার, সিনেট, অ্যাসেম্বলি, ইউএস কংগ্রেসের বিভিন্ন পদের ১৮ জন প্রার্থীসহ একজন নির্বাচিত কাউন্সিল সদস্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পাশাপাশি কমিউনিটি নেতা, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবিসহ দেড় শতাধিক আমন্ত্রিত অতিথির উপস্থিতিতে পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে আনন্দমুখর। ঐক্য, নাগরিক সচেতনতা ও নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অর্থবহ আলোচনা ও মতবিনিময় ছিল অনুষ্ঠানজুড়ে।
রঙিন আলোয় সুসজ্জিত জমকালো অনুষ্ঠানের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন রাইজআপ এনওয়াইসির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এনওয়াইপিডির অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কমান্ডিং ডিটেকটিভ শামসুল হক এবং সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন কাজী তেজওয়ার (আরভিন)। তারুণ্যদীপ্ত আরভিনের প্রাণবন্ত ও সুচিন্তিত উপস্থাপনা সবার নজর কেড়ে নেয়।
মূল বক্তব্যে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শামসুল হক বাংলাদেশি কমিউনিটির অগ্রগতি ও সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ—দুটিই তুলে ধরেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করে বলেন, ‘ভবিষ্যৎকে জানার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সেটিকে নিজেই তৈরি করা।’ তিনি আরও বলেন, নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের সংখ্যা ও নাগরিক অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচিত বাংলাদেশি জনপ্রতিনিধির অভাব, সিটির সরকারি উচ্চপদে সীমিত উপস্থিতি এবং পরিবার ও তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কমিউনিটি সেন্টারের অভাব উল্লেখযোগ্য। তাই নিয়মিত নাগরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং যোগ্য, নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
২০২১ সালে কয়েকজন বাংলাদেশি–আমেরিকানকে নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন রাইজআপ এনওয়াইসির প্রতিষ্ঠা করেন শামসুল হক। শুরু থেকেই তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটির এক্সিকিউটিভ বোর্ড ও স্বেচ্ছাসেবী সদস্যরা নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্পটে ভোটার নিবন্ধন, নাগরিক সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বাড়াতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। কমিউনিটি নেতাদের মতে, ২০২৫ সালের সিটি মেয়র নির্বাচনে বাংলাদেশি-আমেরিকান ভোটারদের রেকর্ডসংখ্যক অংশগ্রহণে এসব যুগোপযোগী ও ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ অনন্য ভূমিকা রেখেছে। যার ফলস্বরূপ বর্তমানে নিউইয়র্ক সিটি মেয়র জোহরান মামদানির প্রশাসনে ট্রান্সজিশন কমিটিতে শামসুল হকসহ ১০ বাংলাদেশি ঠাঁই পেয়েছেন। আগামী বছরগুলোতে এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ আরও বিস্তৃত পরিসরে করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। যাতে আমেরিকার মূল ধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি শক্তিশালী ও প্রতিনিধিত্বমূলক ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলা যায়।
প্রার্থীদের মধ্যে বক্তব্য দেন নিউইয়র্ক স্টেট কম্পট্রোলার পদপ্রার্থী রাজীব গোয়েল, আদেম বাস্কেদ্দেকো, যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস ডিস্ট্রিক্ট ৬–এর পদপ্রার্থী চাক পার্ক, ডিস্ট্রিক্ট-৭ অ্যান্টোনিও রেইনোসো এবং জুলি ওন, নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটের ডিস্ট্রিক্ট-১৩ জেসিকা রামোস, জেসিকা গঞ্জালেস-রোহাস, ডিস্ট্রিক্ট-২৪ ওমর মোহাম্মদ, নিউইয়র্ক স্টেট এসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট-২৪ মাহতাব খান, ডিস্ট্রিক্ট-২৫ কেনেথ প্যাক, ডিস্ট্রিক্ট-৩২ মোহাম্মদ মোল্লা, ডিস্ট্রিক্ট-৩৪ আবির কায়াস, ব্রায়ান রোমেরো, ডিস্ট্রিক্ট-৩৭ পিয়া রহমান, ডিস্ট্রিক্ট-৩৮ ডেভিড অরকিন, ডিস্ট্রিক্ট-৮৭ জাকির চৌধুরী। এ ছাড়া আরও বক্তব্য দেন নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের ডিস্ট্রিক্ট-২১–এর সম্মানিত সদস্য শ্যানেল থমাস-হেনরি, যিনি বর্তমানে কেনো পদে প্রার্থী নন।
নিউইয়র্ক স্টেট এসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট-৩৪–এর প্রার্থী আবির কায়াস প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রতিনিধি হতে চান বলে তাঁর বক্তব্যে ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশি কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার নিয়ে তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান তিনি।
এদিকে কংগ্রেসনাল প্রার্থী জুলি ওন বলেন, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশি কমিউনিটির সদসদ্যের নিউইয়র্ক সিটি সরকারের উচ্চপর্যায়ে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার এবং তিনি এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কমিউনিটির সঙ্গে কাজ করতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত।
২৩ জুন প্রাইমারি নির্বাচন সামনে রেখে বক্তারা নিউইয়র্কজুড়ে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অতীতের চেয়ে আরও বেশি সংখ্যায় ভোট প্রদানের আহ্বান জানান। সর্বশেষ নির্বাচনে নিবন্ধিত বাংলাদেশি ভোটারের প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট প্রদান করেছেন বলে বক্তারা জানান। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামীতে এই হার ৯০ শতাংশে উপনীত করার লক্ষ্য নির্ধারণের আশা ব্যক্ত করেন বক্তারা। এতে মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি শক্তিশালী কমিউনিটি বিনির্মাণে প্রতিনিধিদের আরও দায়বদ্ধ ও সক্রিয় করে তুলবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রার্থীরা বাংলাদেশি কমিউনিটির স্বপ্ন ও চ্যালেঞ্জের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, সুযোগ সৃষ্টি করা ও শক্তিশালী কমিউনিটি বিনির্মানে সম্মিলিত কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
কমিউনিটির নেতারা এই সামিটকে গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ, অংশীদারত্ব ও সম্মিলিত উদ্যোগের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ভবিষ্যতেও নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। নাগরিক শক্তি বৃদ্ধি, নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা ও সরকারের প্রতিটি স্তরে বাংলাদেশি–আমেরিকানদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দেওয়াই হলো রাইজআপ নিউইয়র্ক সিটির ব্যানারে বার্ষিক লিডারশিপ সামিটের মূল লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানের শেষের দিকে সব প্রার্থীর উপস্থিতিতে ফটোসশেনে অংশ নেন অতিথিবৃন্দ, সংগঠনটির এক্সিকিউটিভ বোর্ড ও স্বেচ্ছাসেবী সদস্যরা।
নৈশভোজের পর অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য দেন রাইজআপের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি শামসুল হক। অনুষ্ঠান সফল করার জন্য উপস্থিত সব প্রার্থী, অতিথি, রাইজআপের স্বেচ্ছাসেবী সদস্যদের পাশাপাশি যাঁরা আর্থিক ও অন্যভাবে সহায়তা করেছেন, সবাইকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দেন তিনি।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]