স্পেস টেকনোলজির উন্নয়নে যে কয়েকজন বিজ্ঞানী কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে ওয়ার্নার ভন ব্রাউনের নাম সবার প্রথমে উচ্চারিত হয়। ওয়ার্নার ভন ব্রাউনও ছিলেন একজন জার্মান। বিখ্যাত রসায়নবিদ ফ্রিটজ হেবারের নাম আমরা শুনেছি। বেশির ভাগ শিল্পকারখানায় তাঁর দেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করে নাইট্রোজেন ও হাইড্রোজেনের সংস্পর্শে অ্যামোনিয়া উৎপাদন করা হয়। এ পদ্ধতির নাম ফ্রিটজ-হেবার পদ্ধতি এবং ১৯১৮ সালে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।

জীবনে চলার পথে বিভিন্ন সময় নিজের বা অন্যের প্রয়োজনে মানুষের দেহ থেকে রক্ত দেওয়া কিংবা রক্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু রক্ত দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে যে প্রশ্নটি সবার আগে করা হয়, সেটি হলো রক্তের গ্রুপ কী? রোগীর রক্তের গ্রুপের সঙ্গে রক্তদানে আগ্রহী ব্যক্তির গ্রুপ মিললেই কেবল রক্তদাতা রোগীকে রক্ত দিতে পারেন। অতি প্রয়োজনীয় এ ব্লাড গ্রুপের আবিষ্কারক কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার।

আরভিন শ্রোডিঙ্গারের মতো কার্ল ল্যান্ডস্টেইনারের জন্ম হয়েছিল অস্ট্রিয়ায়। হিটলারের সমসাময়িক জার্মান বিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার সাহায্যে গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। নাৎসিরা জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পতন ঘটলে নাৎসিদের অধীনে কাজ করা জার্মান বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাঁদের নাগরিকত্ব প্রদানের পাশাপাশি নতুনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অধীনে থাকা উপনিবেশগুলো একে একে স্বাধীন হতে শুরু করে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে এ দুই দেশ বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। আর এ সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বরাজনীতির নতুন দুই মোড়ল হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ইউরোপের মাটিতে নাৎসিদের প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এক হয়ে কাজ করেছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ ভাগে এসে এ দুই দেশের মধ্যকার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হতে শুরু করে।

ফলে এ দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধের দিকে এগোতে থাকে। ১৯৫০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় চার দশক গোটা বিশ্বের মানুষ এ দুই দেশের দ্বৈরথ দেখেছে। শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নয়, যেকোনো ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরিতে কিংবা অলিম্পিকের মতো আসরেও যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অন্যকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শাসনকাঠামো ছিল গণতন্ত্রভিত্তিক এবং পুঁজিবাদকে কেন্দ্র করে দেশটির অর্থনীতি পরিচালিত হয়ে আসছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসকদের কাছে গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ ছিল চক্ষুশূলের মতো। তাঁরা বলশেভিজমকে ধারণ করতেন। একটা কথা উল্লেখ করে নিই। সোভিয়েত ইউনিয়ন একক কোনো রাষ্ট্রের নাম নয়।

রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, আজারবাইজান, এস্তোনিয়া, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিস্তান, তাজিকিস্তান ও মলদোভার মতো ১৫টি রাষ্ট্র এবং আবখাজিয়া, সাউথ ওশেটিয়া ও কালিনগ্রাডের মতো কয়েকটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এক হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানীর নাম ছিল মস্কো। বলশেভিজম মূলত কমিউনিজমের একটি রূপ।

নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে এসে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। রোন্যাল্ড রিগ্যানের চতুরতার কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপ্রধান মিখাইল গর্বাচেভ পরাস্ত হন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পেছনে দেশটিতে চলমান অর্থনৈতিক মন্দাও দায়ী। রাষ্ট্রীয় আয়ের বেশির ভাগ অংশ রাজধানী মস্কোতে জমা হতো; কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে থাকা রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যেকে আলাদাভাবে নিজেদের অর্থনীতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর ওপরও কমিউনিজমের প্রভাব শেষ হয়ে যায়।

বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, চেক রিপাবলিক, রোমানিয়া ও স্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলো গণতন্ত্র এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে প্রবেশ করে। পূর্ব ও পশ্চিম দুই জার্মানি এক হয়ে যায়। ওয়ারশো প্যাক্ট ভেঙে দেওয়া হয়। ন্যাটোর বিপরীতে ওয়ারশো প্যাক্ট ছিল একটি সামরিক জোট।

যদি কোনো কারণে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন বা পূর্ব ইউরোপের এসব দেশের কোনোটিতে আক্রমণ করে, তাহলে সম্মিলিতিভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর প্রতিরোধ সৃষ্টির অংশ হিসেবে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশোতে এ সামরিক জোট গঠন করা হয়েছিল। ওই সময় ওয়ারশো প্যাক্টে সাইন করা অনেক দেশ আজ ন্যাটোর সদস্য।

পোপ জন পলের নাম আমরা অনেকে শুনেছি, তিনি ছিলেন খ্রিষ্টধর্মীয় রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। ১৯২০ সালের ১৮ মে পোল্যান্ডে তাঁর জন্ম হয়েছিল। অনেকে বলেন, পোল্যান্ডসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে কমিউনিজমের প্রভাব নিঃশেষ করতে জন পল বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ইউক্রেনে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সামরিক অভিযান এবং একই সঙ্গে বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব এখন নতুন করে সবার মনে একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও পশ্চিমা জোটগুলোর বিপরীতে বিশ্বরাজনীতিতে কি নতুন করে দুই পরাশক্তির আবির্ভাব ঘটতে চলেছে? ১৯৬৯ সালে রিচার্ড নিক্সন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন।

ক্ষমতা গ্রহণের পর রিচার্ড নিক্সন প্রথম চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো চীনও নিজেদের কমিউনিজমের আদর্শে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করত। তবে বলশেভিজমের তুলনায় চীনের কমিউনিজম ছিল ভিন্ন। এ ছাড়া সীমানা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ছিল বেশ শীতল।

তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধে জয়লাভের কৌশল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে মনোনিবেশ করছিল। আজকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এবং একই সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিন ও সি চিন পিং অতীতের সব তিক্ততাকে ভুলে এক হয়ে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কাজ করছেন। চীন ও রাশিয়া পরস্পরের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিককালে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে আমুর নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এ সেতু নির্মাণের ফলে সড়কপথে আরও জোরালোভাবে চীন ও রাশিয়া একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো এখন চীন ও রাশিয়ার উত্থান ঠেকাতে মরিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে ন্যাটো ও জি সেভেনের সম্মেলনে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তার প্রায় সবই চীন ও রাশিয়াকেন্দ্রিক। চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো কতটুকু সফলতা অর্জন করতে পারবে, সেটাই আজকের দিনে পৃথিবীব্যাপী প্রধান আলোচ্য বিষয়।

রাশিয়া যখন ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালায়, তখন পশ্চিমা দেশগুলোর অনেক গণমাধ্যম দাবি করছিল যে খুব শিগগির রাশিয়ার পতন হতে চলছে। রাশিয়াকে গোটা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো দেশটির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। সুইফট সিস্টেম থেকে রাশিয়াকে বের করে দেওয়া হয়।

যদি বাইরের কোনো দেশ এমনকি অন্য কোনো কোম্পানিও যদি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে অংশ নেয়, তবে তাদেরও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়। অলিম্পিক ও বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো আসর থেকে রাশিয়া ও বেলারুশের খেলোয়াড়দের নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হয়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুবলের দরপতন শুরু হয়।

তবে সবাইকে অবাক করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এ অর্থনৈতিক অবরোধের পরও রাশিয়াকে একঘরে হওয়া থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হন। ২০০০ সালের পর যখন বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে ওই সময় নতুনভাবে বিশ্বরাজনীতিতে রাশিয়ার উত্থানের বিষয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে আমলে নেয়নি।

রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে রাশিয়ার তেমন একটা ক্ষতি হয়নি, বরং ইউরোপের দেশগুলো এখন সবচেয়ে বেশি হাঁসফাঁস করছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বেশির ভাগ দেশ জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী। শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ আমদানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রুশ পুঁজিপতিদের বিনিয়োগ রয়েছে। চলবে...

লেখক: রাকিব হাসান রাফি, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন