ঘোমটার ভেতরের হাসি
চাকরির সুবাদে এক বছর হলো চায়নায় শিফট করেছি। ছোট্ট একটা শহর, নাম ডালিয়ান, ছিমছাম আর ভয়ংকর ঠান্ডা, নর্থ কোরিয়ার ঠিক পাশেই এই গোছানো শহরটা।
এখন প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সকালে সময় দেখার আগে ওয়েদার আপডেট চেক করি, কারণ এখানে টেমপারেচার অলওয়েজ মাইনাসে থাকে, দিনটা কেমন যাবে, সেটা বোঝা যায় আজকের তাপমাত্রা কত সেটার ওপর।
সেদিন ছিল রোববার, ছুটির দিন, তাই পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিলাম, ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নিয়ে দেখি এক গাদা মেসেজ, বয়স ৩০ হলো, সেই খুশিতে রাতে বন্ধু, কলিগ, বোনের শুভেচ্ছা বার্তা, সঙ্গে আম্মুর ছোট্ট একটা মেসেজ, ‘আজকে বিকেলে যাচ্ছি মেয়েটাকে দেখতে।’
আমি এর আগে কড়া করে বলে দিয়েছি, ওই মেয়ের বাসায় যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
ও আচ্ছা, ভাবছেন মেয়েটা কে?
মেয়েটা মোনালিসা, ভিঞ্চির না, বাগেরহাটের মেয়ে মোনালিসা, তার সঙ্গে এখনো আমার দেখা হয়নি, তার ছবিও দেখিনি, শুধু এক দিন মাত্র ৫ মিনিট কথা বলেই মেজাজ খারাপ করে বলে দিয়েছি যে এই মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে, একে বিয়ে করা সম্ভব নয়।
আচ্ছা, সমস্যাটা কী, সেটা বলি এখন, দুই দিন আগে যখন প্রমোশন পেয়ে সাউথ এশিয়ান রিজিওনাল ম্যানেজার হলাম চায়নার এই বহুজাতিক কোম্পানির, সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এসে আম্মুকে বলছিলাম, চায়নার কঠিন ভাষা সঙ্গে তাদের অদ্ভুত খাবারদাবারের গল্প, তখনই আম্মু বলল যে একটা মেয়ে দেখেছি, খুব ভালো, আজকে রাতে তোর সঙ্গে কথা বলায় দেব। কারণ, দুই বোনের ভেতর একমাত্র ছেলে হিসেবে আম্মু চাইত, বাংলাদেশের মেয়েই যেন বিয়ে করে থিতু হই।
সেদিন রাতেই মেয়েটার সঙ্গে আম্মু কথা বলিয়ে দিল কনফারেন্স কলে, এরপর আম্মু কল কেটে দেওয়ার আগে বলল যে তোরা দুজন কথা বল।
সেটাও ঠিক ছিল, সালাম দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে ২-৩ মিনিট কথা বলেছি, ঠিক এর ভেতর মেয়েটা হঠাৎ করে তার মাকে ডেকে বলে, ‘আম্মু, আমি আর কী কথা বলব, আর কথা বলতে পারব না, এই ছেলের সঙ্গে তুমিই কথা বল!’
আমি তো যারপরনাই অবাক এবং খুবই বিরক্ত, নিশ্চিত এই মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে, তা না হলে এমন করতে পারে?
এরপর আম্মুকে সোজা বারণ করে দিয়েছি যে এ বিয়ে সম্ভব নয়।
এরপরও আম্মু আজকে তাদের বাসায় যায় মেয়েটাকে সামনাসামনি দেখতে, সেদিন সন্ধ্যায় কফি হাতে নিয়ে ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ ম্যাকে চালু করে দিয়ে মাত্র কম্বলের নিচে বসেছি আর অমনি আম্মুর ভিডিও কল, ভিডিও কল দিয়েই বলছে, দেখ তো বাবা, এই মেয়েটাকে চিনিস কি না!
আম্মু ফোন দেওয়ার সঙ্গেই, আমি সঙ্গে সঙ্গে দেখলাম, ভীষণ মিষ্টি একটা মেয়ে হাসি দিয়ে আমায় বলল, আসসালামু আলাইকুম, তার ওই ঘোমটার ভেতর থেকে মুখটা ঈষৎ উঁচু করে যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বলল, আমি জাস্ট স্তম্ভিত হয়ে গেছি, ভিঞ্চি কি এই হাসিটাই এঁকেছিলেন? এমন অপার্থিব হাসির জন্যই কি পুরুষের এই অপেক্ষা, এত যুদ্ধ! কেবল এই হাসিটুকু নিজের করে নেবে বলে?
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সামলে নিয়ে আমি আগের দিনের কথা মনে করে বললাম, ‘আম্মু কোথায়, প্লিজ, তাকে ফোনটা দিন,’ এরপর আম্মুকে বললাম, আম্মু, তোমাকে না বলেছিলাম, এখানে না যেতে, আমি রাখছি, বলেই খট করে ফোনটা কেটে দিলাম।
তারপর আম্মুও সেখান থেকে চলে এল মুখ গোমড়া করে, আর তারাও আমার এই কথা শুনে বলে দিয়েছে যে এখানে আমরাও আত্মীয়তা করতে চাই না।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ভেঙে গেল, সম্পর্কটা হওয়ার আগেই।
এর আরও দিন তিনেক পরে আমি আমার ছোট বোন, আম্মু সবাই গ্রুপ কলে কথা বলছিলাম, তখন উঠল এই মেয়েটার কথা, আমি কি করে বলি যে মেয়েটাকে আমারও ভীষণ ভালো লেগেছে, ও হাসির প্রেমে আমিও পড়েছি, কিন্তু সেটা না বলে বললাম, ভেঙে গেছে তো ভালো হয়েছে।
তবুও আমার থেকে বছর দুই এর ছোট আমার বোন বলল যে ভাইয়া, আমি কথা বলি, যদি কিছু হয়, আমি কিছুই বললাম না, এরপর ওরাই কথা বলল।
তারপর আবার কথা হলো, দুই পক্ষ আবার কথা বলে বলল যে আবার ছেলে মেয়ে দুজন কথা বলুক, এরপর কথা বললাম, তারপর এই মেয়ে বলে কী, আপনার চুল সব পাকা, তাই আমি ও কথা বলেছি, আমি পাকা চুলের ছেলেকে বিয়ে করব কেন? তখন মাথায় আমার গান বাজছে, ‘ওরে ও টুকটুকির মা, বয়স আমার বেশি না, চুল কয়টা পাইকা গেছে বাতাসে...’
সে যাহোক, তারপর দুজনের কথা হলো, দুজনেই কথার প্রেমে পড়লাম, এভাবে মাসখানেক কথা বলার পর বুঝলাম, দুজন দুজনকে চাই, তখন আর আমার এই ৩০ বছর বয়সের পাকা চুল কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াল না, ফোনে ফোনে সবাইকে সঙ্গে রেখেই কবুল পড়ে ফেললাম।
এরপর মজার ব্যাপার হলো, বিয়ের ঠিক চার দিন পরেই আমার অফিস থেকে আমাকে বাংলাদেশে বিজনেস ট্রিপে পাঠাল, সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া হয়ে ফিরতে হবে।
আমার কাছে মনে হলো, এ তো মেঘ না চাইতেই জল, আমি কোনো কথা না বলেই সারপ্রাইজ দিতে পৌঁছে গেলাম বাংলাদেশ, তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা...
এরপর, এরপর জাস্ট প্রেমে পড়লাম, সাত দিনের ট্রিপ শেষে আমি যখন চায়নার উদ্দেশে আবার রওনা দিলাম, তখন বুঝলাম, এই কাজল চোখের মেয়েটিকে আমার পাশে কতটুকু দরকার! তাই ফিরে এসেই দেরি না করে মাত্র দুই মাসের মাথায় আমার ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে মেয়েটাকে নিয়ে এলাম, আর শুরু করলাম আমাদের টোনাটুনির সংসার।
এবারের ভ্যালেন্টাইনে আসার আগেই তাকে নিয়ে এসেছি, এখানে ভ্যালেন্টাইন্সের দিন থেকে চায়নিজ নিউ ইয়ার শুরু, দুজন মিলে এখন স্নোফল দেখি আর সে আইসক্রিম খেতে খেতে বাচ্চা একটা মেয়ের মতো উচ্ছ্বাস নিয়ে হেঁটে বেড়াই এই ছোট্ট শহরের বুক চিরে...
ভালোবাসা কী অদ্ভুত সুন্দর, এখন তাকিয়ে দেখি আর উপভোগ করি, উফফ, এই অসাধারণ অনুভূতি নিয়েই কেটে যাক আরও ৫০টি বছর, হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন্স ডে।
*লেখক: সাজ্জাদুল ইসলাম তুষার