ভূমধ্যসাগরের তীরে কয়েকটি দিন: নিস, ভেন্তিমিলিয়া, সানরেমো ও মোনাকো
১ জুন ২০২৬ দুপুরে আমি ও সহধর্মিণী মারিয়া স্টকহোম থেকে ফ্রান্সের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর নিসের উদ্দেশে যাত্রা করি। এটি কোনো নতুন অভিজ্ঞতার একেবারে শুরু ছিল না। কারণ, এর আগেও এই অঞ্চলে আসার সুযোগ হয়েছে। তবু ভূমধ্যসাগরের এই উপকূল এমন এক অঞ্চল, যেখানে প্রতিবার ফিরে আসা মানে নতুন করে কিছু দেখা, নতুন করে কিছু বোঝা এবং পরিচিত কিছুর ভেতর থেকেও অচেনাকে খুঁজে পাওয়া।
সময়ের সঙ্গে মানুষের দৃষ্টি বদলে যায়, আর সেই দৃষ্টির পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই একই শহরও কখনো নতুন অর্থে, কখনো নতুন নীরবতায় আবার সামনে এসে দাঁড়ায়।
নিসে পৌঁছে প্রথমেই আমরা শহরের অলিগলি, পুরোনো অংশ ও সমুদ্রতীর ধরে হাঁটি। নিস তখন শুধু একটি পর্যটন শহর হিসেবে ধরা দেয় না, বরং ধীরে ধীরে বোঝা যায়, এটি ইউরোপের ইতিহাসের এক দীর্ঘ স্তরবিন্যাস। প্রাচীন গ্রিক বসতি থেকে শুরু করে রোমান শাসন, পরবর্তীকালে ইতালীয় প্রভাব এবং শেষ পর্যন্ত ফরাসি নগর হিসেবে গড়ে ওঠা এই শহর যেন একাধিক সভ্যতার সহাবস্থানের জীবন্ত দলিল। সমুদ্রের নীল জলরাশি, পাহাড়ের ঢাল আর সূর্যালোকের বিশেষ উজ্জ্বলতা মিলে শহরটিকে এমন এক পরিবেশ দেয়, যা বহু শিল্পী, লেখক ও চিন্তককে বারবার আকর্ষণ করেছে।
নিসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল ‘এয়ারবিএনবি’র মাধ্যমে। আধুনিক ভ্রমণের জগতে এটি খুবই পরিচিত একটি মাধ্যম হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা সব সময় অনলাইনের ছবি বা বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক না কেন, বাস্তবতা যাচাই এবং নিজের চোখে দেখা অভিজ্ঞতার মূল্য কখনোই কমে না।
নিসে সমুদ্রতীরে সময় কাটানোর সময় একটি দৃশ্য আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে যায়। সাঁতার কাটতে গিয়ে দেখি, স্থানীয় স্কুলের শিক্ষকেরা ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে সমুদ্রসৈকতে এসেছেন। শিশুরা বালুর ওপর ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক, বোতল ও নানা ধরনের আবর্জনা সংগ্রহ করছে। এটি শুধু একটি পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, বরং এমন একটি শিক্ষা, যেখানে ছোটবেলা থেকেই পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধকে আচরণের অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
সেই দৃশ্যের ভেতরেই আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগে। আমরা পরিবেশ রক্ষার জন্য আসলে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছি? উন্নত দেশগুলোতে এই দায়িত্ববোধকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা দেখা যায়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সেটাই কি যথেষ্ট? নাকি পরিবেশসচেতনতা আরও গভীরভাবে সমাজের সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া দরকার? যেমন দেশপ্রেম মানেই শুধু ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ বা ২০২৪-এর গণ–অভ্যুত্থান নয়। দেশপ্রেম ও মানবিকতা নানা সামাজিক সমস্যার সমাধানের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়, আর তার শুরু শিশুদের শিক্ষা থেকে। একই সঙ্গে দেখা হলো, কীভাবে ফ্রান্সে শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় পদক্ষেপ হতে পারে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
পরদিন বিকেলের দিকে সমুদ্রতীরে আমি ও মারিয়া বসে ছিলাম। নিসের সেই পরিচিত উপকূল তখন ধীরে ধীরে দিনের আলো হারাচ্ছে। আমরা শুধু বসে ছিলাম না, ছোট্ট একটা পিকনিকের মতো মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল। সৈকতের ওপর বসে নানা ধরনের ফল, হালকা খাবার নিয়ে আমরা সময় কাটাচ্ছিলাম। সমুদ্রের হাওয়া, নরম আলো আর ঢেউয়ের শব্দ মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা খুব স্বাভাবিক অথচ গভীরভাবে শান্ত লাগছিল।
ঠিক সেই সময়ে দূরে চারজন তরুণ মাছ ধরছিল। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, তাদের বড়শিতে বড় একটি মাছ ধরা পড়েছে। মুহূর্তেই তারা উত্তেজিত হয়ে ওঠে, যেন ছোট একটি সাফল্য পুরো বিকেলের আবহ বদলে দিয়েছে।
কিছুক্ষণ পর কথাবার্তার ভেতর দিয়ে জানা যায়, তারা চারজন চারটি ভিন্ন দেশের মানুষ। একজন আলজেরীয়, একজন পোলিশ, একজন বেলারুশীয় এবং অন্যজন ইউক্রেনের বাসিন্দা। চারটি ভিন্ন ইতিহাস, ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা, ভিন্ন স্মৃতি, কিন্তু সেই মুহূর্তে তারা একই সমুদ্রের ধারে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে মাছ ধরছে।
আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, নিজ নিজ দেশে কি তোমরা এমনভাবে একসঙ্গে সময় কাটাতে পারো? তারা একটু থেমে খুব সাধারণভাবে বলল, সেখানে আমরা বন্ধু হতে পারিনি। কারণ, স্বার্থ অনেক সময় সম্পর্ক ভেঙে দেয়। কিন্তু এখানে আমরা শুধু বন্ধু, আর সেটাই সহজ।
এই একটি সংক্ষিপ্ত কথোপকথন আমাকে অনেকক্ষণ নীরব করে রাখে। কারণ, এখানে কোনো তত্ত্ব নেই, কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নেই। আছে শুধু বাস্তবতা, ভিন্ন ইতিহাসের চারজন মানুষ, একই সমুদ্রে দাঁড়িয়ে একই আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে।
এই ভাবনা নিয়েই আমরা ভেন্তিমিলিয়ার উদ্দেশে ট্রেনে করে পরদিন সকালে রওনা হই। ইউরোপে ট্রেনে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া কোনো জটিল প্রক্রিয়া নয়। সীমান্ত পেরোনোর জন্য আলাদা কোনো দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ভিসা চেক বা আনুষ্ঠানিক বিরতি অনুভূত হয় না; ট্রেন শুধু তার গতিতে এগিয়ে চলে।
একজন বাংলাদেশি হয়ে সুইডিশ নাগরিক হিসেবে এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে শুধু সুবিধাজনক নয়, বরং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগের বাস্তব চিত্র, যেখানে সীমান্ত আছে, কিন্তু সেই সীমান্ত দৈনন্দিন জীবনের গতি থামিয়ে দেয় না।
ভেন্তিমিলিয়া একটি পাহাড়ঘেরা সীমান্ত শহর। ভেন্তিমিলিয়ার পুরোনো স্থাপত্য, সরু রাস্তা ও সমুদ্রের সংযোগ মিলিয়ে এটিকে একটি স্বতন্ত্র চরিত্র দিয়েছে। তবে এখানে আমার সবচেয়ে গভীর অভিজ্ঞতা ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখা। কাজের চাপ, সীমিত সুযোগ ও দূর দেশে নিজের অবস্থান তৈরি করার নিরন্তর চেষ্টা—সবকিছু মিলিয়ে এটি এক কঠিন বাস্তবতা, যেখানে প্রতিদিনের জীবনই একধরনের লড়াই।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, এখানে বাংলাদেশের পরিচিত শাকসবজির চাষও চোখে পড়ে। দূর দেশে থেকেও মানুষ নিজের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও শিকড়কে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এই দৃশ্য আমাকে একধরনের পরিচয়ের ধারাবাহিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও স্মৃতি ও অভ্যাস পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
ভেন্তিমিলিয়া থেকে আমরা যাই সানরেমো শহরে। এই পথে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া সুড়ঙ্গপথ, সমুদ্রের কাছাকাছি চলতে থাকা দৃশ্য এবং ধীরগতির নগরজীবন একধরনের ভিন্ন ছন্দ তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে মনোযোগকে বাইরের জগৎ থেকে ভেতরের ভাবনার দিকে নিয়ে যায়।
সানরেমো আমাকে মুগ্ধ করেছে তার পরিবেশ দিয়ে, কিন্তু সমুদ্রের প্রকৃত সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করা সম্ভব হয়নি। কারণ, উপকূলজুড়ে অসংখ্য নৌকা ও বোট থাকায় খোলা সমুদ্রের বিস্তৃত দৃশ্য অনেক সময় আড়াল হয়ে যায়। আমার ব্যক্তিগত অনুভূতিতে, সমুদ্র তখনই সবচেয়ে সুন্দর যখন তা নীরব, খোলা ও কোনো কিছুর দ্বারা বাধাগ্রস্ত নয়।
সানরেমোর পথে এক নারীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই শহর কি মোনাকোর চেয়ে কম সুন্দর মনে হয় না? তিনি হেসে বললেন, তুমি প্রথম ব্যক্তি যে আমাকে এই প্রশ্ন করেছ। তারপর বললেন, এখানে শান্তি আছে। টাকার পেছনে দৌড়াতে হয় না। সবই আছে, শুধু টাকা ছাড়া। এই একটি বাক্য আমার কাছে শহরটির জীবনদর্শনের মতো মনে হয়েছে।
খাবারের অভিজ্ঞতা কিছুটা সাধারণ ছিল। খারাপ নয়, তবে এমন কিছু নয়, যা বিশেষভাবে মনে থেকে যায়। হয়তো এর একটি কারণ ছিল আমার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা। কারণ, আমি নিজেও রান্না করতে পছন্দ করি এবং খাবারের স্বাদ ও ভারসাম্য নিয়ে কিছুটা সংবেদনশীল।
এই ভ্রমণের শেষ অংশ ছিল মোনাকো। আয়তনে অত্যন্ত ছোট হলেও এটি বিশ্বের অন্যতম পরিচিত রাষ্ট্র। সমুদ্র, পাহাড় ও আধুনিক স্থাপত্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জায়গা বিলাসিতা, গতি ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রতিটি দৃশ্যেই একধরনের পরিপূর্ণতার প্রদর্শন আছে বলে মনে হয়।
মোনাকোতে সমুদ্রতীরে বসে আমি আম খাই, পরে পানিতে গোসল করি। সেই সহজ মুহূর্তের পর কিছু সময়ের জন্য ফেরারি গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়। বাহ্যিকভাবে এটি ছিল একধরনের বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা, দ্রুততা ও আধুনিকতার এক প্রদর্শন, কিন্তু সেই মুহূর্তগুলোর ভেতরেই আমার মধ্যে অন্য একটি অনুভূতি ধীরে ধীরে তৈরি হতে শুরু করে।
হঠাৎ মনে হলো, মানুষের কাছে যা আছে, তা নিয়েও সে শান্ত থাকতে পারে। জীবনের জন্য সবকিছু অতিরিক্ত হওয়া জরুরি নয়। আমি নিজেকে তখন একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে দেখি এবং মনে হয় আমার জীবন আসলে খারাপ নয়, বরং যথেষ্ট। এই উপলব্ধি কোনো বড় ঘটনার ফল নয়, বরং ছোট ছোট মুহূর্তের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একধরনের নীরব স্বীকৃতি।
এই কয়েক দিনের সফর আমাকে শুধু কয়েকটি শহর দেখায়নি, বরং মানুষ, সমাজ ও নিজের ভেতরের দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে বুঝতে সাহায্য করেছে। নিসের সমুদ্রতীরে শিশুদের পরিবেশ শিক্ষা, ভেন্তিমিলিয়ায় প্রবাসীদের সংগ্রাম, সানরেমোর জীবনদর্শন এবং মোনাকোর বিলাসিতা—সব মিলিয়ে এই ভ্রমণ ছিল একধরনের নীরব শিক্ষা।
ভ্রমণ শেষ হয়, কিন্তু কিছু অভিজ্ঞতা শেষ হয় না। তারা থেকে যায় চিন্তার মধ্যে, প্রশ্নের মধ্যে এবং মাঝেমধ্যে নিজের জীবনকে নতুনভাবে দেখার চোখ হিসেবে।