তাইফ: যেখানে পাহাড় আজও নবীর ধৈর্যের সাক্ষী
পৃথিবীর কিছু শহর আছে, যেগুলো শুধু ভ্রমণের গন্তব্য নয়—সেগুলো হৃদয়েরও গন্তব্য। সৌদি আরবের পাহাড়ি শহর তাইফ তেমনই একটি নাম। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, শীতল আবহাওয়া, ফলের বাগান আর বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের এক বেদনাময় অথচ মহিমান্বিত অধ্যায়—সব মিলিয়ে তাইফ যেন ইতিহাস, প্রকৃতি ও আত্মিক অনুভূতির এক অপূর্ব মিলনস্থল।
মক্কায় কয়েক দিন অবস্থানের পর এক সকালে আমি আর আমার বন্ধু সাইমন তাইফের উদ্দেশে রওনা হলাম। মক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত আমাদের বন্ধু হাবিব পুরো ভ্রমণের আয়োজন করে দিয়েছিল। তারই পরিচিত একজন চালকের টয়োটা ক্যামরিতে আমরা যাত্রা শুরু করি।
মক্কার রুক্ষ পাহাড় ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যেতে লাগল। সামনে খুলে যেতে লাগল আঁকাবাঁকা পাহাড়ি মহাসড়ক। একের পর এক তীক্ষ্ণ বাঁক, গভীর খাদ, আকাশ ছোঁয়া পর্বত আর নিচে বিস্তীর্ণ উপত্যকা। কখনো মনে হচ্ছিল আমরা মেঘের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, কখনো মনে হচ্ছিল পাহাড় আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরে পথ দেখাচ্ছে। প্রকৌশলের অসাধারণ নকশায় নির্মিত এই পাহাড়ি সড়ক সৌদি আরবের আরেকটি বিস্ময়। প্রতিটি বাঁকে গাড়ি থামিয়ে প্রকৃতিকে আরও কিছুক্ষণ দেখে নিতে ইচ্ছা করছিল।
পথে চোখে পড়ল বিশাল আকৃতির বন্য বানরের দল। তারা রাস্তার ধারে বসে থাকে, যেন পথিকদের আগমনের অপেক্ষায়। অনেক পর্যটক গাড়ি থামিয়ে কলা, বাদাম বা বিস্কুট এগিয়ে দেন। খাবার পেয়ে বানরগুলোর উচ্ছ্বাস, লাফালাফি আর কৌতূহলী চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, মানুষ ও প্রকৃতির এক সহজ-সরল সম্পর্ক এখনো এখানে টিকে আছে।
তাইফ শহরে পৌঁছে প্রথমেই মনে হলো, এটি যেন মরুভূমির বুকে লুকিয়ে থাকা এক সবুজ দ্বীপ। শীতল বাতাস, পাহাড়ঘেরা উপত্যকা, ছায়াঘেরা রাস্তা আর ফলের বাগান—সব মিলিয়ে সৌদি আরবের অন্য শহরগুলোর সঙ্গে এর পার্থক্য স্পষ্ট। তাইফকে সৌদি আরবের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী বলা হয়, আর সেখানে গিয়েই বুঝলাম কেন।
কিন্তু তাইফের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রকৃতি নয়; তার পরিচয় লুকিয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসে।
আজ থেকে চৌদ্দ শ বছরেরও বেশি আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এই শহরে এসেছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, এখানকার মানুষ অন্তত সত্যকে গ্রহণ করবে। কিন্তু তাঁকে স্বাগত জানানো হয়নি। বরং তাঁকে উপহাস করা হয়, শিশু ও দুর্বৃত্তদের দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। রক্তে ভিজে যায় তাঁর পবিত্র পদযুগল।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
সেই মুহূর্তের কথা কল্পনা করতেই শরীর শিউরে ওঠে। মানবতার শ্রেষ্ঠ মানুষটি আহত, ক্লান্ত, রক্তাক্ত—তবু তাঁর মুখে কোনো অভিশাপ নেই।
একসময় তিনি আশ্রয় নেন উতবা ও শায়বা ইবনে রাবিয়ার আঙুরবাগানে। আজও সেই বাগানে গেলে এক ধরনের নীরবতা অনুভব করা যায়। মনে হয়, সময় যেন এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। বাগানের ভেতরে ছোট্ট একটি মসজিদ রয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করার সময় মনে হচ্ছিল, এই মাটিতেই হয়তো রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর দরবারে তাঁর হৃদয়ের গভীরতম আর্তি নিবেদন করেছিলেন।
স্থানীয় গাইড আমাদের এমন একটি পুরোনো বাড়িও দেখালেন, যেটি অনেকেই ‘বুড়ির বাড়ি’ নামে চেনেন। এ নিয়ে নানা লোককথা প্রচলিত আছে। ইতিহাস ও জনশ্রুতির মিশেলে স্থানটি পর্যটকদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
তাইফ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য ছিল মহান সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মসজিদ ও সমাধিস্থল। কোরআনের তাফসিরে যাঁর অবদান আজও সমগ্র মুসলিম বিশ্ব শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। মসজিদের প্রশান্ত পরিবেশে কিছুক্ষণ বসে মনে হলো, জ্ঞানের মানুষ কখনো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যান না; তাঁদের আলো যুগ যুগ ধরে মানুষকে পথ দেখায়।
মসজিদের সামনেই সারি সারি রেস্তোরাঁ, কফিশপ ও স্যুভেনিরের দোকান। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা মুসল্লি ও পর্যটকেরা এখানে আতর, তাসবিহ, খেজুর, ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি, গোলাপজল এবং তাইফের বিখ্যাত গোলাপের সুগন্ধি কিনে নিয়ে যান। আমরাও কিছু স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহ করলাম—যেন ফিরে গিয়েও তাইফের সুবাস সঙ্গে থাকে।
এরপর আমরা চড়লাম তাইফের বিখ্যাত কেবল কারে। ধীরে ধীরে কেবল কার যখন পাহাড়ের ওপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন নিচে বিস্তীর্ণ উপত্যকা, ফলের বাগান, সবুজ পাহাড় আর দূরের শহর এক অপার্থিব দৃশ্য তৈরি করেছিল। মনে হচ্ছিল, যেন আকাশের বুক থেকে পৃথিবীকে নতুন করে দেখছি।
তাইফ সৌদি আরবের ফলের রাজধানী হিসেবেও পরিচিত। আঙুর, ডালিম, ডুমুর, পীচ, এপ্রিকট, নাশপাতি, স্ট্রবেরি—কত রকম ফল যে এখানে জন্মায়! আর আছে বিশ্বখ্যাত তাইফের গোলাপ। এই গোলাপ থেকে তৈরি আতর ও গোলাপজল পৃথিবীর নানা দেশে রপ্তানি হয়। পাহাড়ি বাতাসে গোলাপের হালকা সুবাস ভেসে বেড়ায়, যা এই শহরকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
বিকেলের শেষ আলো যখন পাহাড়ের গায়ে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিল, তখন বিদায়ের সময় হলো। কিন্তু মনে হচ্ছিল, এই শহরকে এত সহজে বিদায় বলা যায় না।
ফেরার পথে আমরা কারনুল মানাযিল (আস-সাইল আল-কাবির) মিকাতে থামলাম। সেখানে ইহরাম বেঁধে আবার মক্কার পথে রওনা দিলাম। রাতের পবিত্র কাবাঘর, তাওয়াফ, সাফা-মারওয়া, আর ওমরাহ সম্পন্ন করার সেই প্রশান্তি যেন তাইফ সফরেরই পূর্ণতা এনে দিল।
মক্কায় ফিরে মনে হচ্ছিল, আজ শুধু একটি পাহাড়ি শহর ঘুরে এলাম না; ফিরে এলাম ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায় থেকে। এমন এক শহর থেকে, যেখানে প্রতিটি পাহাড় মহানবীর ধৈর্যের গল্প বলে, প্রতিটি বাতাস তাঁর ক্ষমার বাণী বহন করে, প্রতিটি আঙুরলতা মনে করিয়ে দেয় আদ্দাসের মানবিকতার কথা।
আজও চোখ বন্ধ করলে সেই আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, শীতল বাতাস, আঙুরের বাগান, কেবল কার থেকে দেখা সবুজ উপত্যকা আর রক্তাক্ত অবস্থায়ও মানবতার জন্য দোয়া করা প্রিয় নবীর স্মৃতি একসঙ্গে ভেসে ওঠে।
তাইফ আমার কাছে কেবল একটি ভ্রমণ নয়; এটি ছিল আত্মাকে স্পর্শ করা এক যাত্রা। যে যাত্রা শিখিয়েছে—কষ্টের চেয়েও বড় ধৈর্য, প্রতিশোধের চেয়েও বড় ক্ষমা, আর পৃথিবীর সব সৌন্দর্যের ঊর্ধ্বে রয়েছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ।
* লেখক: মো. ফয়সাল ফরিদ চৌধুরী, মক্কা, সৌদি আরব