গুয়াংজুতে এক রাত, এক যুগের গল্প

অফিসে এসে মাত্রই ল্যাপটপ ওপেন করেছি, মেইল চেকের ভেতরে হঠাৎ মোবাইলের স্ক্রিনে দেখলাম টুং করে শব্দ করে ভেসে এল কলেজজীবনের এক বন্ধুর মেসেজ, ‘দোস্ত কেমন আছিস?’

আমি বেশ অবাক হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই রিপ্লাই দিলাম, ‘দোস্ত, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, তুই কেমন আছিস?’

এরপর কুশল বিনিময় শেষে আমরা ফোনে কিছুক্ষণ কথা বললাম, যার সারমর্ম হচ্ছে আগামীকাল দুই সপ্তাহ পরে আমার বন্ধু চীনে আসছে ব্যবসার কাছে, গুয়াংজু নামক এক শহরে, আর এদিকে আমিও যেহেতু দুই বছর ধরে চাকরির সুবাদের চীনে আছি, সে বলল, কোনো কথা শুনতে চাইনা, এইচএসসি পাসের পরে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে আমাদের দেখা হয়নি, তাই অবশ্যই আসবি তুই দেখা করতে।

তারপর উইকেন্ডে যেহেতু দেখলাম ছুটি আছে, আর পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে, এদিকে ও যেহেতু চীনের কিছুই আসলে চেনে না, আর ভাষাগতও একটা জটিলতা আছে, তাই আর তেমন কিছু না ভেবে টিকিট কেটে প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম ডালিয়ান থেকে গুয়াংজুয়ের উদ্দেশে।

অবশেষে চাকরি আর ব্যক্তিগত ব্যস্ততার ভেতরে কখন যেন দুই সপ্তাহ কেটে গেছে তা টেরই পাইনি, আর এদিকে ফ্লাই করার সময়ও চলে এসেছে।

তাই ব্যাগ গুছিয়ে উঠে পড়লাম গুয়াংজুর উদ্দেশে অফিস শেষ করে তাড়াহুড়ো করেই গিয়ে ফ্লাইট ধরলাম লাস্ট মিনিটে, সঙ্গে হালকা কিছু জামাকাপড় আর সমরেশ মজুমদারের ‘কোথায় যাবে ছেলেটি’ নিতে ভুল করিনি।

প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে যখন প্লেনে চড়ে বসেছি, তখন রাত আটটা, ডালিয়ান থেকে প্রায় চার ঘণ্টার যাত্রা গুয়াংজু। প্লেন টেক অফ করার পরে লাইট যখন নিবু নিবু করে চাদের আলোর মতো জ্বলছিল, তার ভেতরে এয়ার হোস্ট্রেসের কাছে থেকে একটা ব্লাংকেট নিয়ে গায়ে পেঁচিয়ে খুলে বসলাম উপন্যাসটি।

একনিশ্বাসে পড়ে শেষ করলাম চমৎকার লেখাটি। আর এই উপন্যাসটির পেছনেও আরেক গল্প আছে, সেটা না হয় আরেক দিন, তবে শুধু এটুকু বলি, প্রায় চার বছর আগে, বাংলাদেশের সীতাকুণ্ডের কোনো এক বাসা থেকে একজনের কাছে থেকে এটা পেয়েছিলাম, এরপর প্রায় চার বছর হয়ে গেলেও ব্যস্ততায় তা আর খোলা হয়নি, কিন্তু অবশেষে এটাকে খুললাম আর চার ঘণ্টায় যাত্রায় এটাকে শেষ করলাম। এরপর একটা ছবি তুলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতেও ভুললাম না...

‘ইট টেকস ফোর ইয়ার্স টু ওপেন অ্যান্ড ফোর আওয়ার্স টু কমপ্লিট।’

যাহোক, বইটার যখন শেষ পাতা উল্টালাম তখন এয়ার হোস্ট্রেস মাইকে ঘোষণা করল যে আমরা আর কিছুক্ষণের ভেতরেই গুয়াংজু ল্যান্ড করতে যাচ্ছি।

এরপর যখন নামলাম গুয়াংজুতে, সময় তখন রাত ১টা, টার্মিনাল–২–এর ৪৩ নম্বর গেট দিয়ে বের হয়েই দেখি আগে থেকে বুক করা হোটেলের গাড়ি আর ড্রাইভার আমার জন্য অপেক্ষারত। তারপর দেরি না করে মালপত্র নিয়ে উঠে বসলাম গাড়িতে, এখানে আবহাওয়া এখন বেশ গরম, আমি যে শহর থেকে এসেছি সেখানে বেশির ভাগ সময়ই ঠান্ডায় নিমজ্জিত থাকে, তাই গরমটা বেশ এনজয় করতে করতে পৌঁছে গেলাম হোটেলে, সেখানে গিয়ে জরুরি কাজ সেরে যখন হোটেল রুমে চেক ইন করেছি তখন রাত প্রায় দুইটা, এরপর হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে নিচে নেমে গেলাম পেটপুজো করতে, সব একা একাই করতে হচ্ছিল কারণ আমার বন্ধু এসে পৌঁছাবে ভোর পাঁচটায়।

এরপর খাওয়াদাওয়া শেষ করে আশপাশের পরিবেশ দেখতে দেখতেই বন্ধুর ফোন, সে ইমিগ্রেশন শেষ করে অপেক্ষা করছে। আমি এরপর হোটেলে গিয়ে রেসিপশনিস্টকে বুঝিয়ে বললাম, এরপর তার কথামতো বন্ধু হোটেলের গাড়িতে উঠে কিছুক্ষণের ভেতরই পৌঁছে গেল হোটেলে।

এত বছর পর দুই বন্ধুর দেখা, দুজনই ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিলাম, সেও এসে হাতমুখ ধুয়ে খাবার খেয়ে যখন বাইরে তাকালাম, সুয্যিমামা তার তেজ ছড়ানো শুরু করে দিয়েছে।

এরপর বন্ধুকে বললাম যে সকাল ১০টায় যাদের সঙ্গে মিটিং তারা চলে আসবে, আর এদিকে সারা রাত যেহেতু ঘুমানো হয়নি তাই কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিতে।

ঘুম থেকে এরপর নয়টায় উঠে ফ্রেশ হয়ে দুজনই হোটেলের নিচে গিয়ে একটা মুসলিম রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করলাম, যেটাকে চায়নিজে বলে ‘লাংঝু লামিয়ান’।

সেখানে গিয়ে বিফ ডাম্পলিং খেতে খেতেই যাদের সঙ্গে মিটিং তারা গাড়ি নিয়ে উপস্থিত।

অগত্যা আমরা যাত্রা শুরু করলাম ফ্যাক্টরির পথে, প্রায় ৭০ কিলোমিটার আমাদের হোটেল থেকে ফ্যাক্টরির দূরত্ব। সুন্দর নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে দেখতে যখন যাচ্ছিলাম তখন মনেই মনেই গুনগুন করছিলাম বাংলা কোনো একটা গান।

এর ভেতরে আমার বন্ধু বলে উঠল, এই রাস্তাটা কেমন আমাদের ঢাকা–চট্টগ্রাম হাইওয়ের মতো তাই না?

আমিও তাল মেলালাম, আসলেই তা–ই, দূরে মেঘের নিচে পাহাড় উঁকি দিচ্ছে আর দুপাশে সারি সারি গাছ যেন একই সুরে গান গাইছে।

অবশেষে ফ্যাক্টরিতে গিয়ে পৌঁছালাম, সেখানে আমাদের অভিবাদন শেষ করে মিটিং শুরু হলো, সেটা শেষ হলো বেলা তিনটায়, ততক্ষণে পেটের ক্ষুধাও জানান দিচ্ছে বেশ ভালো করে যে আমরা ক্ষুধার্ত, তাই এরপরে চলে গেলাম চায়নিজ একটা রেস্টুরেন্টে। সেখানে এলাহি সব খাবার কিন্তু দুঃখবশত সব খাবারই সেদ্ধ কিংবা আধা সেদ্ধ।

চিকেন, মাটন, বিফ, ফিশ, ভেজিটেবল আরও কত কী! এক একটা খাবারের কি সব চায়নিজ বাহারি নাম, আমি যেহেতু চায়নাতেই থাকি, বেশ তৃপ্তি করে খেলাম, কিন্তু আমার বন্ধুর কাছে খাবারে অনেক গন্ধ লাগছিল, কারণ ওরা আমাদের মতো মসলা ব্যবহার করে না।

যাহোক, সে পর্ব শেষ করে হোটেলের সামনে এসে ছবি তুলে রওনা দিলাম হোটেলের দিকে, হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা ছয়টা।

এসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাতের শপিংয়ে, চলে গেলাম কাছের একটা শপিং মলে, সেখান থেকে আমরা দুজনই কিছু কেনাকাটা সেরে নিলাম, এর ভেতরে আমার বন্ধু একটা ছোট্ট রাইস কুকার কিনে ফেলেছে, কারণ সে হোটেলে রান্না করে খাবে, এই চায়নিজ খাওয়া তার পক্ষে খাওয়া সম্ভব নয়।

যাহোক, কেনাকাটা শেষ করে বাসায় এসে জিনিসপত্র রেখে বাইরে সুপারশপ থেকে ডিম আর কুমড়া কিনে এনে আমার বন্ধু রাইস কুকারে উঠিয়ে দিল।

আমিও ফ্রেশ হয়ে যখন এসেছি তখন সে ভর্তা বানিয়ে সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আনা গরুর মাংসের আচার দিয়ে যখন খাবার খেতে দিল, মনে হলো যেন অমৃত খাচ্ছি।

তারপর ঘুমাতে ঘুমাতে আর কতশত গল্প করতে করতে শেষ রাতের ঘণ্টা যখন বাজল ঘড়ির কাঁটায়, তখন ঘুমাতে গেলাম, পরদিন বেশ দেরি করে ঘুম থেকে উঠলাম।

ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে দুপুরে চলে গেলাম স্থানীয় একটা হোলসেল মার্কেট, নাম Tong Tong Market.

সেখানে গিয়ে আরও অনেক ঘোরাঘুরি, জামা–জুতা, আরও কত কী! সব কেনাকাটা শেষ করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বিকেল চারটা।

আর দেরি করলাম না, যেহেতু ওই দিনই আমার সন্ধ্যা সাতটায় ফ্লাইট, দ্রুত হোটেলে ফিরেই রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশে।

বন্ধুর সঙ্গে কোলাকুলি করে একরাশ ভালো লাগা নিয়ে উঠে পড়লাম ডালিয়ানের উদ্দেশে হাওয়াই জাহাজে।

পিছে পড়ে রইল মধুর স্মৃতি আর এক যুগের করা রাত জাগা গল্প। বন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা হবে বাংলাদেশের কোনো এক টং চায়ের দোকানে কিংবা ঝাঁ–চকচকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কোনো রেস্টুরেন্টে। তত দিন অমলিন থাকুক এই মধুর স্মৃতিটুকু।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]