বাফেলোতে রোহিঙ্গা শরণার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু: মার্কিন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো শহরে প্রায় অন্ধ ও ইংরেজি ভাষা না জানা এক রোহিঙ্গা শরণার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। নুরুল আমিন শাহ আলম (৫৬) নামের ওই ব্যক্তিকে ১৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সীমান্তরক্ষী বাহিনী (সিবিপি) একটি কফি শপের সামনে একা ফেলে চলে যাওয়ার পাঁচ দিন পর গত মঙ্গলবার রাতে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বাফেলোর মেয়র শন রায়ান এই মৃত্যুকে ‘প্রতিরোধযোগ্য’ এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাজকে ‘অমানবিক’ ও ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন।
যেভাবে আটক হন তিনি
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের (২০২৫ সালে) ফেব্রুয়ারিতে। পরিবার ও আইনজীবীর ভাষ্য মতে, শাহ আলম বাড়ির কাছে হাঁটতে বের হয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। চোখে কম দেখায় তিনি একটি ‘কার্টেন রড’ (পর্দা টাঙানোর দণ্ড) লাঠি হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। পথ হারিয়ে তিনি ভুলবশত একজনের বাড়ির আঙিনায় ঢুকে পড়লে বাড়ির মালিক পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাঁকে রডটি ফেলে দিতে বললেও ইংরেজি না জানানোয় তিনি তা বুঝতে পারেননি। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে পুলিশের দুই কর্মকর্তা সামান্য আহত হলে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশকে আক্রমণ, অনুপ্রবেশ ও অস্ত্র রাখার (রড) অভিযোগ আনা হয়। এর পর থেকে তিনি প্রায় এক বছর ইরি কাউন্টি হোল্ডিং সেন্টারে বন্দী ছিলেন।
মুক্তি ও নিখোঁজ হওয়া
সম্প্রতি একটি আপস রফার (plea deal) মাধ্যমে শাহ আলমের জামিন মঞ্জুর হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁকে সিবিপি কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সিবিপি কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে দেখেন যে তিনি শরণার্থী হিসেবে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন এবং তাঁকে বিতাড়িত (deportation) করার কোনো সুযোগ নেই। এরপর পরিবারের কাউকে বা তাঁর আইনজীবীকে না জানিয়েই সিবিপি কর্মকর্তারা শাহ আলমকে বাফেলোর একটি ‘টিম হর্টনস’ কফি শপের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যান। সিসিটিভি বা নজরদারি ক্যামেরায় দেখা যায়, প্রায় দৃষ্টিহীন শাহ আলম কফি শপের বন্ধ দরজার সামনে কিছুক্ষণ পায়চারি করে দিক্ভ্রান্তের মতো হাঁটতে শুরু করেন। সেই থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
মরদেহ উদ্ধার ও তদন্ত
নিখোঁজের পাঁচ দিন পর মঙ্গলবার রাতে বাফেলোর একটি স্টেডিয়ামের কাছ থেকে ‘শাহ আলমের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। যে জায়গায় তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, মরদেহটি সেখান থেকে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে পাওয়া যায়। সে সময় তাঁর পায়ে সঠিক জুতা বা পর্যাপ্ত শীতের কাপড়ও ছিল না।
প্রাথমিক ময়নাতদন্তে এটিকে ‘স্বাস্থ্যগত কারণে মৃত্যু’ বলা হলেও পরিবারের সদস্যরা এর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হকুল এবং অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসও এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন।
জানাজা ও দাফন
২৬ ফেব্রুয়ারি বাফেলোর সাইকামোর স্ট্রিটের মসজিদ জাকারিয়াতে শাহ আলমের জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় রোহিঙ্গা কমিউনিটি, বাংলাদেশি কমিউনিটির লোকজনসহ বিপুল সংখ্যক স্থানীয় লোক সমবেত হন। পরে মসজিদ–সংলগ্ন কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
দাফন শেষে এক পারিবারিক বন্ধু বলেন, ‘শাহ আলম শুধু পরিবারের কাছে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মার্কিন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।’
শাহ আলমের পরিবারকে সাহায্য করার জন্য ৫৫ হাজার ডলার সাহায্য উঠানোর জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়। বৃহস্পতিবার এই লেখা পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৪৯ হাজার ডলার তহবিল উঠে যায়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]