আমাদের সংস্কৃতি, ঈদ উৎসব ও জাতীয় সংগীত

ঈদের নামাজ
ফাইল ছবি

দেশ থেকে আট হাজার কিলোমিটার দূরে সংসার আমাদের। সংসারে বউ, বাচ্চা, ভাই, বোন, ভাবি, দুলাভাই সবাই আছে। রক্তের বাইরেও যে মানুষ আপন হতে পারে, এটা প্রবাসী ছাড়া কেউ এত গভীরভাবে ঠাহর করতে পারে না। দেশে রক্তের সম্পর্কের বাইরে শুভাকাঙ্ক্ষী বলতে বন্ধুবান্ধব আর চেনাজানা কতিপয় মানুষ।

অথচ প্রবাসে প্রত্যেক বাঙালিই আপনজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষী। যদি না সেখানে নোংরা রাজনীতির খড়্গ চালানো হয়। এ আপনজনের মিলনমেলা সম্পূর্ণতা পায় বিভিন্ন আয়োজনে। হোক সেটা নবান্ন, নববর্ষ, পয়লা ফাল্গুন কিংবা রোজা, ঈদ, পূজা–পার্বণ। তেমনই এবার ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে মিলিত হয় এ আপন মানুষগুলো।

আড়াই লাখ মানুষের শহর হালে। এটি মধ্য জার্মানির স্যাক্সনি আনহাল্ট অঙ্গরাজ্যের শহর। বছর কয়েক আগেও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ছিল নেহাত হাতে গোনা ৩০–৩৫ জন, যার প্রায় শতভাগই শিক্ষার্থী। বর্তমানে যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে শ খানেক, যার প্রায় শতভাগই শিক্ষার্থী।

পরিবার–পরিজন ছেড়ে দূর দেশে ভিন্নভাষী মানুষের ভিড়ে মাতৃভাষা গলাধঃকরণ করার মজা হয়তো এত সহজে মেলে না, যদি না একে অপরের দেখা মেলে। গড়গড় করে বাংলা বলতে ইচ্ছা করে। শুধুই বাংলা ও আঞ্চলিক বাংলা। যেমনটা নিজের ক্ষেত্রে কুষ্টিয়ার আঞ্চলিকতা টেনে আনতে ইচ্ছা করে। জার্মান ও ইংরেজির ভিড়ে এ যেন মহামূল্য দুর্লভ কোনো সম্পদ।

এবারের ঈদুল আজহা ছিল একটু অন্য রকম। কারণ, সপ্তাহান্তের ঈদ বলে কথা। তা–ও শনিবার অর্থাৎ ঈদের দিনে ছুটি আবার ঈদের পরদিন রোববারও ছুটি। যেটা সচরাচর খুব একটা হয়ে ওঠে না।

ফলাফল দুই দিনব্যাপী ঈদ আড্ডা আর বিনোদন। ঈদের দিন শুরু হয় নামাজ দিয়ে। হালে এফসি ফুটবল স্টেডিয়ামে হয় ঈদের জামাত। দেশি–বিদেশি মিলিয়ে হাজার মুসল্লি অংশ নেন এই ঈদ জামাতে। এরপর পারিবারিকভাবে চলে খাবারের আয়োজন। যার মধ্যে বাংলার ঐতিহ্যবাহী খিচুড়ি, সেমাই, ফিরনি ও নানাবিধ মাংস। এবারে ঈদের ভিন্নতা ছিল জার্মানিতে কোরবানির আয়োজন। আমাদের দুই ছোট পরিবারে খাসি কোরবানি করা হয়। হালে থেকে কোরবানির মাংস সংগ্রহে ছুটে যাই দেড় শ কিলোমিটার দূরের ড্রেসডেন শহরে। মাংস আনতে আনতে বিকেল গড়িয়ে যায়।

বিকেলে পার্শ্ববর্তী মাঠে শুরু হয় আড্ডা, কৌতুক, খেলাধুলা ও খাওয়াদাওয়া। ৫০ থেকে ৬০ জন বাঙালির মিলনে শুরু হয় উৎসব। পাঞ্জাবি ও ঐতিহ্যবাহী দেশি পোশাক ছিল অন্যতম আকর্ষণ। যে যেমন পারে রান্না করে হাজির হয় উৎসবে। খিচুড়ি, পোলাও, মাংস, কেক, পুডিং, পিঠা ও নানা রকম সেমাই ছিল উৎসবের অন্যতম আয়োজন। গল্পগুজব ও আড্ডা দিয়ে শেষ হয় প্রথম দিন।

দ্বিতীয় দিনের উৎসবে আকর্ষণ ছিল একটু অন্য রকম। উৎসব শুরু হয় জাতীয় সংগীত দিয়ে। দেশ থেকে আট হাজার কিলোমিটার দূরে ভিনদেশে, ভিন্নভাষীর জগৎ। যেখানে আমার দেশের জাতীয় সংগীত লাউডস্পিকারে বাজছে! আর আমাদের চোখ করছে ছলছল! এমন দুর্লভ অনুভূতিতে আমাদের চোখ ছলছল করবে না, তাই আবার হয় নাকি? একদিকে জাতীয় সংগীত বাজছে, আপনমনে মিনমিন করে কণ্ঠ দিচ্ছি।

কেউবা আবেগ উগরে দিয়ে চিৎকার করে গাইছে। চোখে ভাসছে সোনার দেশ, মাটি, শৈশব, কৈশোর, কাদা, মাটি, নদী, জোনাকি, ঝিঁঝি পোকা, রাতের লোডশেডিং, কালবৈশাখী, স্কুল, মুষল বৃষ্টি, আম, কাঁঠাল, মা, বাবা, ভাই, বোন। এ যেন অদ্ভুত অধরা জিনিস বাস্তবে ধরা দেওয়া। এ এক মন্ত্রমুগ্ধ অনুভূতি, যে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।

জাতীয় সংগীত শেষে শুরু হয় প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ। বিবাহিত বনাম অবিবাহিতের ক্রিকেট ম্যাচ। জয় যদিও বিবাহিতের দলেই ধরা দেয়। ১২ ওভারের ম্যাচে বিবাহিতরা জয় পায় ২০ রানের। সবশেষে কোরবানির মাংস গোগ্রাস করার পালা। আস্তে আস্তে সন্ধ্যা গড়িয়ে আরও একটি উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তী মিলনের বার্তায় ঘটে বিদায়ের ঘণ্টা।