দুঃস্বপ্ন

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গত রাতে আমি এক ভয়ানক এবং অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি।

স্বপ্নে দেখলাম, আমি এক বিশাল প্রাসাদের ভেতর দাঁড়িয়ে আছি। সেখানে একের পর এক লম্বা লম্বা ঘরের সারি, যার যেন কোনো শেষ নেই। প্রতিটি ঘর একদম নিঝুম, শান্ত আর জনশূন্য। আসবাবপত্র আর দেয়ালের কাঠের প্যানেলগুলোর ওপর ধুলার পুরু আস্তরণ জমে আছে। দেয়ালে ঝুলছে প্রাচীন আমলের কিছু অদ্ভুত ও হাস্যকর খোদাই করা ছবি। চারপাশটা এক নিরেট, নিস্তেজ নীরবতায় ডুবে আছে—যেন কোনো বধির কানের ভেতরকার অবশ নীরবতা। আশেপাশের কোনো শব্দ চেনার জন্য আমি কান খাড়া করে বৃথা চেষ্টা করলাম। সবকিছু এত বেশি পরিত্যক্ত আর বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে যে আমার মনে এক ধনী ব্যক্তির কথা জাগল। এমন একজন ধনী মানুষ, যিনি এত বিপুল প্রাসাদ আর দুর্গের মালিক যে নিজে সবগুলোর কথা মনেই রাখতে পারেন না; আর এই প্রাসাদের কথা তিনি হয়তো সম্পূর্ণ ভুলে গেছেন। অথবা এমনও হতে পারে, তিনি বুড়ো হয়ে গেছেন এবং তাঁর স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে।

কিন্তু...আমি নিজে এখানে কী করছি? কীভাবে এই অচেনা জায়গায় এলাম? সেই কথাটাই আমি একদম ভুলে গেছি!

আমার কেবল আবছা মনে পড়ছিল যে এই শহরে আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা করার কথা ছিল। কিন্তু কাজটা কী, তা কিছুতেই আর মনে করতে পারলাম না। ঘরের ভেতরটা এক অদ্ভুত হলদেটে আলো-আঁধারিতে ভরে আছে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই এমন গোধূলির মতো অন্ধকার নেমে এল কীভাবে? এই মনমরা গোধূলিবেলাটা আমার ভেতরে এক তীব্র অস্বস্তি ও আতঙ্ক তৈরি করতে লাগল।

আমি মেঝের ওপর পড়ে থাকা জিনিসগুলোকে খুঁটিয়ে দেখে চেনার চেষ্টা করলাম। নিজের চারপাশটা একটু চিনে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। কারণ, আমার মনের এক কোণে বারবার মনে হচ্ছিল, আমি তো আগেও বহুবার এখানে এসেছি, এই জায়গাটা তো আমার নিজের বাড়ির মতোই পরিচিত হওয়ার কথা ছিল! কিন্তু আমার স্মৃতিগুলোকে কিছুতেই এক সুতোয় সাজাতে পারলাম না।

ঠিক কেমন অনুভূতি হচ্ছিল জানেন? ওই যে—কোনো অতি পরিচিত নাম, কোনো শব্দ বা অভিব্যক্তি, যা আপনি জীবনে হাজারবার ব্যবহার করেছেন, সেটা হুট করে ভুলে গেলে যেমন হয়। মনে হয় এই তো জিবের ডগায় চলে এসেছে, কিন্তু কিছুতেই তা মুখে আনা যায় না!

একটু এগোতেই দেখলাম শক্ত ও উঁচু পিঠওয়ালা চেয়ারের এক দীর্ঘ সারি। আধো-অন্ধকারের গভীরে একটা পুরোনো পিয়ানো তার সাদা-কালো চাবিগুলো নিয়ে যেন দাঁত খিঁচিয়ে তাকিয়ে আছে। আমি কৌতূহলবশত সেটার কাছে গেলাম, চাবিগুলোতে আঙুল ছুঁইয়ে কয়েকটা সুর তুলতে চাইলাম। কিন্তু পিয়ানোর রিডগুলো থেকে একটা টুঁ শব্দও বের করতে পারলাম না; চাবিগুলোর ওপর ধুলার এক মোটা আস্তরণ পড়ে আছে।

হঠাৎ নজরে এল, পিয়ানোর ওপর একটা পুরোনো, ধুলাবালু মাখা ‘টপ হ্যাট’ (লম্বা টুপি) রাখা আছে। কী হাস্যকর! টুপিটার ভেতরের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম—সেখানে আমার নামের আদ্যক্ষর লেখা রয়েছে! আমি টুপিটা আরও ভালো করে দেখলাম। আরে, এটা তো আমারই টুপি! এই তো সেদিন আমি ‘ফ্রেডসগাটান’ রাস্তা থেকে এটা কিনেছিলাম। কিন্তু ওটা এখানে কীভাবে এল? আর এত অল্প সময়ে ওটা এতটা পুরোনো আর সেকেলে হয়ে গেল কীভাবে? টুপিটার ওপরের দিকটা সরু হয়ে গেছে এবং এর চওড়া কিনারাগুলো দেখতে বড্ড অদ্ভুত লাগছিল। আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল, ইচ্ছা হলো মন খুলে একটু কেঁদে ফেলি।

লিয়াকত হোসেনের স্বপ্নে দেখা অদ্ভুত প্রাসাদে তাঁর স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেছে; বাস্তবতার অনুভূতি ঝাপসা হয়ে রয়েছে।

—কিন্তু চুপ! দূরে কোথাও যেন কেউ একজন আমার নাম ধরে ডাকছে!

আমি আবার সামনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। ঘরের পর ঘর পার হচ্ছি তো হচ্ছিই...এর কি কোনো শেষ নেই? এই গোলকধাঁধার শেষ মাথায় কি কখনো পৌঁছানো যাবে না? এখান থেকে বের হওয়ার কি কোনো পথ নেই?

আবার আমার নাম ধরে ডাকল কেউ! এবার শব্দটা খুব কাছাকাছি মনে হলো, মনে হলো এই ঘরের মেঝের ঠিক নিচ থেকেই আওয়াজটা আসছে। আমি দ্রুত পা চালালাম, দৌড়াতে চাইলাম; কিন্তু আমার পা দুটো যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। কিছুতেই নড়াতে পারলাম না, নিজেকে টেনেহিঁচড়ে কোনোমতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চললাম।

অবশেষে আমি প্রাসাদের একেবারে শেষ ও সবচেয়ে ভেতরের ঘরটিতে এসে পৌঁছালাম। ঘরটি গোল কিংবা অষ্টভুজাকার—এটি একটি টাওয়ারের ভেতরের ঘর। কিন্তু এখানে এসে আমার বুকটা দমে গেল, কারণ এই ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার আর কোনো দরজা নেই! তার মানে, আমাকে আবার ওই একই খালি ঘরগুলোর ভেতর দিয়ে পেছনের দিকে ফিরে যেতে হবে।

ঠিক তখনই তৃতীয়বারের মতো আমার নাম ধরে ডাক শোনা গেল! কে ডাকছে? ওখান থেকে কে ডাকছে আমাকে?

ঘরের ঠিক কোনার দিকে চোখ যেতেই আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। গোধূলির আবছা অন্ধকারের মাঝে, ভারি পর্দা ঝোলানো একটা চওড়া বিছানা পাতা রয়েছে সেখানে। আর সেই বিছানায় শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। তাঁর মুখটা মোমের মতো সাদা আর ফ্যাকাশে। তিনি কাচের মতো চকচকে, নিস্তেজ আর শূন্য চোখ মেলে সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন!

এই বৃদ্ধ লোকটা এখানে এত একা, সবার অলক্ষ্যে আর বিস্মৃতির মাঝে শুয়ে আছেন কেন? কেন তিনি এভাবে মরে থাকার মতো পড়ে আছেন?

হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার শরীরের প্রতিটি জয়েন্ট যেন শক্ত হয়ে জমে গেছে। আমি পুরোপুরি অবশ হয়ে গেলাম। সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ক্ষমতাও আমার আর রইল না। এমনকি বিছানার যে ভারী পর্দাটা আমি আমার বাঁ হাত দিয়ে সরিয়ে ধরেছিলাম, সেই হাতটা নামিয়ে নেওয়ার শক্তিও আমার ছিল না।

আমি মনে মনে ভাবলাম—আমি তো যুবক, আর উনি তো বৃদ্ধ। আমি হলাম আমি, আর উনি হলেন উনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও...এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর সত্য আমার মাথায় আঘাত করল—উনার আর আমার মাঝে কোনো তফাত নেই! বিছানায় শুয়ে থাকা ওই মৃতপ্রায় বৃদ্ধ মানুষটা আর কেউ নয়, স্বয়ং আমি! ওটা আমিই!

আর এক অনন্তকালের জন্য আমি যেন সেই বিছানার পাশে পায়ে পেরেক ঠোকা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে, নিজেরই সেই জরাজীর্ণ রূপের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলাম।

হুট করেই স্বপ্নের দৃশ্যটা বদলে গেল। এবার নিজেকে আবিষ্কার করলাম এক উন্মুক্ত প্রান্তরে।

চারপাশে ফ্যাকাশে সবুজ মাঠের একটা কুয়াশাচ্ছন্ন ধূসর ল্যান্ডস্কেপ। মাঠের ফসল বা শস্যগুলো যেন কোনো বাতাস ছাড়াই নিজে নিজেই মন্থর গতিতে দুলছে। কারণ, আমি নিশ্চিত ছিলাম যে সেখানে বিন্দুমাত্র বাতাস বইছিল না; চারপাশটা রাতের মতোই স্তব্ধ ও থমথমে।

আমি শূন্য মনে হেঁটে যেতে যেতে মাঠ থেকে একটা খড় তুলে মুখে নিয়ে চিবোতে লাগলাম। মাথাটা একদম ফাঁকা, কিচ্ছু ভাবছিলাম না। মাঠের মাঝখান দিয়ে একটা সাদা, সরু রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে। রাস্তার দুপাশে স্তূপ করে রাখা কাটা শস্যের আঁটি।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

হঠাৎ করেই শুনলাম, আশেপাশেই কোথাও কেউ একজন তীব্র যন্ত্রণায় কাঁদছে। আমার বুকের ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল, আবার একধরনের উদাসীনতাও কাজ করল। আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমি আসলে কিছুই শুনিনি, এটা হয়তো আমার মনের ভুল।

কিন্তু সেই হাহাকার আর কান্নার আওয়াজ কমল না, বরং আরও বাড়তেই লাগল। এখন মনে হলো শব্দটা একদম আমার গায়ের কাছে চলে এসেছে। আমি আর এক পা-ও এগোতে পারলাম না, আমার পা দুটো আমাকে বইবার শক্তি হারিয়ে ফেলল।

আমার মনে এক অদ্ভুত কু ডাকল—কেমন যেন মনে হলো অত্যন্ত লজ্জাজনক বা বিব্রতকর কোনো পরিস্থিতি আমার জন্য অপেক্ষা করছে, যা আমি অনেক অনেক দিন আগেও একবার অনুভব করেছিলাম।

আমি রাস্তার ধারের শস্যের স্তূপগুলো সরিয়ে ভেতরে উঁকি দিলাম। দেখলাম, সেখানে এক বৃদ্ধ লোক মাটিতে শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন এবং হাত-পা ছুড়ছেন। আমি প্রথম দেখায় তাঁকে চিনতে পারলাম না, আগে কখনো দেখেছি বলেও মনে পড়ল না। আমি দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে কাঁধের নিচে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে একটু বসাতে সাহায্য করলাম।

একমুহূর্তের জন্য তিনি শান্ত হয়ে আমার কোলে মাথা নিচু করে বসে রইলেন, তাঁর চোখ দুটো ছিল স্থির। কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি এক বুকফাটা, কান ফাটানো ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে উঠলেন—এবং আমার হাত থেকে ছিটকে গিয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলেন। মাটিতে পড়ার পর তাঁর শরীরটা কাঠের মতো শক্ত আর ভারী হয়ে গেল।

আমি হতভম্ব হয়ে চারদিকে তাকিয়ে লক্ষ করলাম, এই নির্জন মাঠে আমি একা নই! আমার চারপাশ ঘিরে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে এবং তারা সবাই একযোগে হাসছে! তাদের মাঝে এক মোটা বৃদ্ধ ভদ্রলোক, যাকে দেখতে বেশ স্বাস্থ্যবান আর হাসিখুশি লাগছিল, তিনি মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে এমনভাবে হাসছিলেন যে হাসতে হাসতে তাঁর পুরো মুখটা লাল হয়ে উঠেছিল।

আমি চরম হতবাক এবং রাগে ফেটে পড়লাম। আমি কিছুতেই মাথায় ঢোকাতে পারছিলাম না যে একটা মানুষের এই করুণ অবস্থা দেখে এরা কেন এমন পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে! কেন এরা এভাবে হাসছে?

তারপর আমি আবারও মাটিতে পড়ে থাকা সেই মৃত লোকটার দিকে তাকালাম। শক্ত আর ভারী হয়ে মাটিতে শুয়ে থাকা সেই দেহটির কাচের মতো নিষ্প্রাণ চোখ দুটো আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।

আর তখনই আমি চিনতে পারলাম...মাটিতে মরে পড়ে থাকা ওই মানুষটা অন্য কেউ নয়—ওটা ছিলাম আমি, আমি এবং শুধুই আমি! সমাপ্ত

(সুইডিশ লেখক হ্যালমার সোডারবার্গ এর ///////////Mardröm///////////// গল্পের অনুবাদ)