বিয়ে করেছি সংসার করতে, স্যাক্রিফাইস করতে নয়

বিয়ে মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এটি শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়, বরং দুটি মানুষের মধ্যে একটি মানসিক, নৈতিক ও মানবিক বন্ধন। এই বন্ধনের ভিত্তি হওয়ার কথা বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহানুভূতি ও ভালোবাসা। কিন্তু যখন সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে ভালোবাসা বা শ্রদ্ধার জায়গা দখল করে নেয় একতরফা ত্যাগ, তখন সেই সম্পর্কের ভেতরেই অদৃশ্য এক শূন্যতা জন্ম নেয়।

মানুষ বিয়ে করে একসঙ্গে জীবন গড়ে তোলার জন্য। একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। সুখে দুঃখে সঙ্গী হওয়ার জন্য। কিন্তু অনেক সময় সংসার এমন এক কাঠামোতে আটকে যায়, যেখানে একজন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে সে আর সম্পর্কের অংশীদার নয়, বরং শুধু দায়িত্ব পালনকারী একজন মানুষ। তখন বিয়ে আর সম্পর্ক থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে একটি দীর্ঘস্থায়ী দায়িত্বের বোঝা।

পাশ্চাত্যের সমাজে যখন সম্পর্কের ভেতর থেকে ভালোবাসা, সম্মান বা সমতা হারিয়ে যায়, তখন অনেকেই বিচ্ছেদের পথ বেছে নেয়। তারা মনে করে, যে সম্পর্ক মানুষের আত্মসম্মান বা মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়, সেই সম্পর্ক ধরে রাখার কোনো মানে নেই। তাই সেখানে বিচ্ছেদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। অনেকেই এটিকে পারিবারিক ভাঙন হিসেবে দেখেন, আবার অনেকে এটিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো সমাজে বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষ অনেক সময় নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন, এমনকি আত্মসম্মান পর্যন্ত বিসর্জন দেয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক চাপ, পারিবারিক সম্মান, সন্তানের ভবিষ্যৎ, এসব মিলিয়ে অনেক মানুষ এমন সম্পর্কের মধ্যেও থেকে যায় যেখানে ভালোবাসা বহু আগেই নিভে গেছে। বাইরে থেকে সংসার টিকে থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সম্পর্কটি অনেক আগেই ভেঙে যায়।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এই দুই সমাজের পার্থক্য আসলে শুধু অর্থনীতি বা সংস্কৃতির পার্থক্য নয়। এটি মানুষের মানসিক স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সম্পর্কের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। যেখানে একজন মানুষ জানে যে তার বেঁচে থাকার জন্য একটি সম্পর্কের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হবে না, সেখানে সে নিজের সম্মান ও সুখের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পায়। কিন্তু যেখানে জীবনযাত্রার নিরাপত্তা সীমিত, সেখানে মানুষ প্রায়ই সম্পর্কের ভাঙনকে নিজের জীবনের ভাঙন হিসেবেই দেখতে বাধ্য হয়।

তবু প্রশ্নটি রয়ে যায়। সংসার কি শুধুই ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?

ত্যাগ অবশ্যই সম্পর্কের একটি অংশ। ভালোবাসার সম্পর্কেও মানুষ অনেক সময় নিজের স্বার্থ ছেড়ে দেয়, অন্যের জন্য কিছু করে। কিন্তু সেই ত্যাগ যদি একতরফা হয়, যদি তা অভ্যাসে পরিণত হয়, যদি সম্পর্কের ভেতর থেকে শ্রদ্ধা ও যত্ন হারিয়ে যায়, তাহলে সেই ত্যাগ আর ভালোবাসার প্রকাশ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে নীরব কষ্টের আরেক নাম।

একটি সুস্থ সংসার এমন একটি জায়গা, যেখানে দুজন মানুষই নিজেদের মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারে। যেখানে কেউ কাউকে ছোট করে না, কেউ কারও স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না। যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু একসঙ্গে থাকা নয়, বরং একে অন্যকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ বিয়ে করে বাঁচার জন্য, ভালোবাসার জন্য, একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করার জন্য। শুধু ত্যাগ করে বেঁচে থাকার জন্য নয়।

সংসার যদি শুধু স্যাক্রিফাইসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেখানে হয়তো সম্পর্ক টিকে থাকে, কিন্তু সুখ টিকে থাকে না। আর সুখ ছাড়া সংসার শুধু একটি কাঠামো, একটি সামাজিক ব্যবস্থা, কিন্তু তা আর জীবনের আনন্দ হয়ে উঠতে পারে না।

হয়তো তাই আজ নতুন করে প্রশ্ন করা দরকার। আমরা কি বিয়ে করছি শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য, নাকি সত্যিই মানবিকতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান, সহনশীলতা, বোঝাপড়া, আবেগ, নিষ্ঠা, সহমর্মিতা ও মমতার সমন্বয়ে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য?

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে কয়েকটি কথা বলতে চাই। আমি ট্রেডিশনাল রীতিনীতির গণ্ডি ভেঙে শুধু পারস্পরিক ভালোবাসার আকর্ষণে এবং উভয়ের বাবা মায়ের সম্মতিতে ভিন্ন কালচার, ভাষা, বর্ণ, এমনকি ধর্মীয় পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আজ থেকে ৩২ বছর আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম। এই দীর্ঘ পথচলায় কোথাও কোনো স্যাক্রিফাইসের বোঝা নিয়ে সংসার করিনি। মতপার্থক্য এসেছে, দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা থেকেছে, তবু পরস্পরের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা ধরে রেখেই আমরা সংসার করে যাচ্ছি। কারণ বিয়ে করেছিলাম তো সংসার করতে, স্যাক্রিফাইস করতে নয়।

বিয়ে ছিল ভালোবাসার বন্ধন, এবং বিয়ের মধ্যে আজও রয়েছে শুধু ভালোবাসা।

আরও পড়ুন

পরিশেষে, রমাদান আত্মশুদ্ধি, সংযম, আত্মপর্যালোচনা ও নৈতিক জাগরণের মাস। এই মাসে আমরা নিজেদের আচরণ, সম্পর্ক এবং সিদ্ধান্তের দিকে মনোযোগ দিই, ভাবি কীভাবে আরও ভালো মানুষ হওয়া যায়। একইভাবে, বিবাহের কথাও এ সময়ে নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। বিবাহ কেবল সামাজিক বন্ধন নয়, বরং একটি নৈতিক ও মানবিক অঙ্গীকার। ইসলামের শিক্ষায় বিবাহকে বলা হয়েছে পারস্পরিক শান্তি, মমতা ও দয়ার সম্পর্ক। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে যুগল করেছেন, যাতে তারা একে অপরের মধ্যে শান্তি খুঁজে পায় এবং তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করা হয়েছে। এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিবাহ কোনো একতরফা ত্যাগের পথ নয়, বরং পারস্পরিক দায়িত্ব, সম্মান, সহমর্মিতা এবং বোঝাপড়ার পথ।

রমাদানের এই সময়ে দাম্পত্য জীবন নিয়ে ভাবছেন, নতুনভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন বা নিজের সম্পর্ককে নতুন করে দেখার চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই মানুষ হিসেবে সম্মানিত হবেন, একে অপরের অধিকার রক্ষা করবেন এবং ভালোবাসাকে দায়িত্ব, সহনশীলতা, আবেগ, নিষ্ঠা ও মমতার সঙ্গে মিলিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবেন। যদি এই উপলব্ধি থেকে বিবাহের বন্ধন তৈরি হয়, তবে তা শুধু দুইজন মানুষের জীবন নয়, পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি ইতিবাচক ও মানবিক দিকনির্দেশনা হয়ে উঠবে।