টাস্কানির পথে-গ্যালিলিও থেকে মাইকেলাঞ্জেলো

সময়টা ২০০৮ সাল। এক ভ্রমণদিনে স্ত্রী শিরিন চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে এসে পৌঁছেছিলাম ইতালির টাস্কানিতে—প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, মধ্যযুগের ইতিহাস, রেনেসাঁর শিল্প আর আধুনিক বিজ্ঞানের উন্মেষ যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি পথ হেঁটেছে। কিছু জায়গার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় সেখানে পা রাখারও অনেক আগে। বইয়ের পাতায়, ছবির ফ্রেমে, কিংবা কারও বলা গল্পে একটু একটু করে তার একটি মানচিত্র আঁকা হয়ে যায় মনের ভেতর। তাই সেখানে পৌঁছে মনে হয় না, প্রথমবার এলাম; বরং মনে হয়, বহুদিনের চেনা কোনো জায়গায় ফিরে এলাম। টাস্কানি আমার কাছে ছিল তেমনই এক ফিরে পাওয়া ভূখণ্ড।

সেই কল্পনার প্রথম দৃশ্যটি ছিল পিসা। দূর থেকে চোখে পড়েছিল পৃথিবীর বিস্ময়কর স্থাপত্যগুলোর অন্যতম হেলে পড়া শ্বেতমর্মর মিনার—সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চিরাচরিত নিয়মকে যেন অগ্রাহ্য করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একদিকে নত হয়ে আছে। তার পাশে ক্যাথেড্রাল ও ব্যাপ্টিস্ট্রি, আর শহরের বুক দিয়ে নীরবে বয়ে চলেছে আরনো নদী। এই পিসার সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন গ্যালিলিও-মানুষের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করে প্রকৃতির কাছে উত্তর খোঁজার এক অসাধারণ প্রতীক।

আরও পড়ুন

কিন্তু টাস্কানির গল্প পিসাতেই শেষ হয় না। সেই আরনোই আরও উজানে ছুঁয়ে গেছে ফ্লোরেন্সকে-রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান জন্মভূমি। সেখানে ব্রুনেলেস্কির ‘ডুওমো ক্যাথেড্রাল’ আকাশ ছুঁয়েছে, মাইকেলাঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ পাথরের মধ্যে মানুষকে নতুন মর্যাদায় দাঁড় করিয়েছে, আর ‘উফিজি’ গ্যালারির দেয়ালে আজও বেঁচে আছে রেনেসাঁর রং ও কল্পনা। এই দুই শহরের বাইরে ছড়িয়ে আছে টাস্কানির ঢেউতোলা পাহাড়, আঙুরখেত, জলপাইবাগান, সাইপ্রেসের সারি আর পোড়ামাটির ছাদের ছোট ছোট জনপদ। সেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সৃষ্টি যেন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—একই ছবির দুটি অংশ।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আজ এত বছর পরে ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, সেদিনের ভ্রমণ শুধু দুটি শহর দেখা ছিল না। পিসায় আমরা দেখেছিলাম মানুষের প্রশ্ন করার সাহস, ফ্লোরেন্সে তার সৃষ্টিশীলতার দীপ্তি, আর টাস্কানির পথে-প্রকৃতি ও সভ্যতার এক অপূর্ব সহাবস্থান।

ফ্লোরেন্স-রেনেসাঁর আলোয় একটি শহর

টাস্কানির কথা বলতে গেলে ফ্লোরেন্সের কাছে এসে যেন একটু থামতেই হয়। আরনো নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহর শুধু টাস্কানির রাজধানী নয়—ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান জন্মভূমি। চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য ও মানবতাবাদী চিন্তার যে নবজাগরণ ইউরোপের মননকে বদলে দিয়েছিল, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠেছিল এই ফ্লোরেন্সেই।

শহরের আকাশরেখায় প্রথমেই চোখ টেনে নেয় ‘সান্তা মারিয়া দেল ফিওরে’ (Santa Maria del Fiore)-ফ্লোরেন্সের বিখ্যাত ক্যাথেড্রাল—যাকে সবাই সহজভাবে ‘ডুওমো’ (Duomo) বলে। সবুজ, গোলাপি ও সাদা মার্বেলের বিশাল স্থাপত্যের মাথায় নির্মিত সেই অসাধারণ লালচে গম্বুজ। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এত বিশাল গম্বুজ কীভাবে নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছিল, সেটিই একসময় ছিল প্রকৌশলের বিরাট চ্যালেঞ্জ। আজও দূর থেকে ডুওমোর দিকে তাকালে মনে হয়, ফ্লোরেন্স যেন তার সমস্ত ইতিহাস একটি গম্বুজের নিচে ধরে রেখেছে।

আরও পড়ুন

আর এই শহরেই জন্ম নিয়েছিল মার্বেল পাথরের শরীরে রেনেসাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিস্ময়-মাইকেলাঞ্জেলোর ‘ডেভিড’। ১৫০১ থেকে ১৫০৪ সালের মধ্যে একটি বিশাল মার্বেলখণ্ড থেকে তিনি যে অসাধারণ এক মানবমূর্তি সৃষ্টি করেছিলেন, সেখানে শুধু শরীরের নিখুঁত গঠন নয়, ধরা আছে আত্মবিশ্বাস, সতর্কতা এবং মানুষের নিজের শক্তির প্রতি বিশ্বাস। মূল ‘ডেভিড’ আজ সংরক্ষিত ‘গ্যালেরিয়া দেল আকাডেমিয়া’-তে এবং ‘দেল্লা সিনিয়রিয়া স্কোয়ার’-এ তার প্রতিরূপ দাঁড়িয়ে আছে।

তারপর ‘উফিজি গ্যালারি’ (Uffizi Gallery)-শুধু একটি শিল্প জাদুঘর নয়, যেন রেনেসাঁর স্মৃতির এক বিশাল ভাণ্ডার। সান্দ্রো বোটিচেলি-র ‘দ্য বার্থ অব ভেনাস ও প্রিমাভেরা (বসন্ত)’, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ৫০০-৫৫০ বছরের অসাধারণ সব পেইন্টিং, রাফায়েল, মাইকেলাঞ্জেলো, টিশিয়ান-এক ছাদের নিচে ইউরোপীয় শিল্পের কয়েক শতাব্দীর অসাধারণ যাত্রা। সেখানে ছবি শুধু দেয়ালে ঝুলে থাকে না; মনে হয়, একটি যুগ তার সৌন্দর্যবোধ নিয়ে দর্শকের সামনে আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্যারিসের ‘লুভর’ ও সেন্ট পিটার্সবার্গের ‘হার্মিটেজে’ শিল্পের যে বিপুল ভুবন একদিন আমাকে মুগ্ধ করেছিল, ফ্লোরেন্সের ‘উফিজি’ গ্যালারিতে এসে যেন আবার প্রবেশ করলাম তেমনই এক বিস্ময়কর শিল্পজগতে।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির কাছে শিল্প ও বিজ্ঞান ছিল না দুটি পৃথক জগৎ। মানুষের মুখ আঁকতে গিয়ে তিনি ত্বকের নিচের পেশি খুঁজেছেন, দেহের ভঙ্গি বুঝতে খুলে দেখেছেন অস্থি ও সন্ধির বিন্যাস, আর জীবনের স্পন্দন বুঝতে ব্যবচ্ছেদ করেছেন হৃদ্‌যন্ত্র। তিনি শল্যচিকিৎসক ছিলেন না, কিন্তু মানবদেহ নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান ছিল একজন শারীরস্থানবিদের মতোই গভীর। তাঁর তুলিতে তাই সৌন্দর্য শুধু দেখা দেয়নি—তার ভেতরে ছিল পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও বিজ্ঞানের অনুসন্ধিৎসা। সম্ভবত রেনেসাঁর মর্মও এখানেই: শিল্পী যখন বিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন, আর বিজ্ঞানীর চোখেও পৃথিবী হয়ে ওঠে এক অনন্ত শিল্পকর্ম। তাই ফ্লোরেন্সকে দেখে মনে হয়—রেনেসাঁ এখানে শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; ডুওমোর গম্বুজে, ডেভিডের দৃষ্টিতে, উফিজির ছবিতে, পন্তে ভেক্কিওর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মানুষের পদধ্বনিতে—সে আজও যেন জীবন্ত।

শ্বেতমর্মরের প্রাঙ্গণে

পিসার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্যসমষ্টি Piazza dei Miracoli—অর্থাৎ ‘অলৌকিকতার প্রাঙ্গণ’। নামটির মধ্যে হয়তো কিছু অতিশয়োক্তি আছে, কিন্তু সেখানে দাঁড়ালে মনে হয়, মানুষের সৃষ্টিশক্তির সামনে ‘অলৌকিক’ শব্দটিও কখনো কখনো যথার্থ হয়ে ওঠে। সবুজ ঘাসের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ওপর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে পিসা ক্যাথেড্রাল, ব্যাপ্টিস্ট্রি এবং সেই বিখ্যাত ক্যাম্পানিলে—একধরনের বিশেষ ঘণ্টাঘর—যাকে পৃথিবী চেনে Leaning Tower of Pisa (পিসার হেলানো মিনার) নামে।

প্রথম দর্শনে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছিল পাথরের শুভ্রতা। আলো যখন সাদা ও ধূসর মার্বেলের গায়ে এসে পড়ে, তখন স্থাপনাগুলো নিছক পাথরের তৈরি বলে মনে হয় না; মনে হয় আলো নিজেই যেন স্থাপত্যের রূপ ধারণ করেছে। দূর থেকে ক্যাথেড্রালের গম্ভীর শরীর এবং তার পাশে হেলে থাকা টাওয়ারটির দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল—একটি স্থিরতার প্রতীক, অন্যটি অস্থিরতার; অথচ দুটিই শত শত বছর ধরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের জীবনও কি এমন নয়? আমরা সোজা হয়ে চলতে চাই, অথচ সময় আমাদের কত দিকে হেলিয়ে দেয়। তবু হেলে যাওয়া মানেই পতন নয়—পিসার টাওয়ার যেন তারই এক পাথুরে প্রমাণ।

যে ভুলই হয়ে উঠল সৌন্দর্য

পিসার টাওয়ার নির্মাণ শুরু হয়েছিল দ্বাদশ শতকে। এটি মূলত ক্যাথেড্রালের ঘণ্টাঘর। নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই নরম ও অসম ভূমির কারণে ভিত্তির একদিক বসে যেতে শুরু করে। যে স্থাপত্যকে সোজা হয়ে আকাশের দিকে ওঠার কথা ছিল, সে ধীরে ধীরে হেলে গেল। স্থপতির দৃষ্টিতে সেটি ছিল বিপর্যয়। কিন্তু ইতিহাসের কী অদ্ভুত পরিহাস—মানুষের সেই ব্যর্থতাই একদিন পৃথিবীর বিস্ময় হয়ে উঠল।

আমরা টাওয়ারটির সামনে দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। চারপাশে পর্যটকের ভিড়। কেউ ছবি তুলছে, কেউ এমন ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়েছে যেন টাওয়ারটিকে পড়ে যাওয়া থেকে ঠেকিয়ে রেখেছে। আমিও সেই চিরচেনা পর্যটকসুলভ কৌতুক থেকে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি—হাত বাড়িয়ে দিলাম টাওয়ারটিকে ঠেকাতে গিয়ে। ছবিতে মনে হয়, আমার হাতের ওপরেই যেন তার শতাব্দীপ্রাচীন ভার!

শিরিন পাশে দাঁড়িয়ে হাসছিল। আজ এত বছর পরে সেই ছবি দেখলে মনে হয়, মানুষ আসলে কত অল্প সময়ের জন্যই কোনো স্থানের সামনে এসে দাঁড়ায়। টাওয়ারটি আমার জন্মের বহু শতাব্দী আগে সেখানে ছিল; আমার পরে আরও কত প্রজন্ম এসে তার সামনে দাঁড়াবে। আমরা ছবির মধ্যে একটি মুহূর্তকে আটকে রাখি, অথচ স্থাপত্যটি নীরবে আমাদের ক্ষণস্থায়িত্বের সাক্ষ্য দিয়ে যায়।

পিসার হেলানো মিনারের ছায়ায়-গ্যালিলিওর একটি প্রশ্ন

পিসায় এসে প্রথমেই মনে হয়, কোনো কোনো শহর তার আয়তনের চেয়ে ইতিহাসে অনেক বড়। পর্যটনের এই আনন্দময় কোলাহলের মধ্যেও আমার মনে তখন অন্য এক মানুষ এসে দাঁড়ালেন-গ্যালিলিও গ্যালিলেই। কারণ পিসার এই মিনার শুধু স্থাপত্যের বিস্ময় নয়; বিজ্ঞানের ইতিহাসের একটি বিখ্যাত কাহিনিও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

এই শহরেই ১৫৬৪ সালে জন্মেছিলেন গ্যালিলিও—যাঁর অনুসন্ধিৎসু মন প্রকৃতিকে বুঝতে চেয়েছিল প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে। কথিত আছে, পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময় তিনি এই মিনারের ওপর থেকে ভিন্ন ভরের দুটি গোলক একই সঙ্গে নিচে ফেলেছিলেন। তাঁর সামনে ছিল বহু শতাব্দী ধরে প্রতিষ্ঠিত অ্যারিস্টটলের ধারণা-ভারী বস্তু হালকা বস্তুর তুলনায় দ্রুত নিচে পড়ে। গ্যালিলিও প্রশ্ন তুলেছিলেন, প্রকৃতি কি সত্যিই তা-ই বলে?

চার শ বছরেরও বেশি আগে কোনো প্রতিষ্ঠিত মতকে এভাবে প্রশ্ন করার জন্য প্রয়োজন ছিল স্বাধীন চিন্তার সাহস। গ্যালিলিওর বৈজ্ঞানিক জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য এখানেই—তিনি প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের বক্তব্যের চেয়ে প্রকৃতির নিজের সাক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে এটুকুও বলা প্রয়োজন—গ্যালিলিও সত্যিই পিসার এই মিনার থেকে দুটি গোলক ফেলেছিলেন কি না, তার অকাট্য প্রমাণ নেই। তিনি নিজে তাঁর রচনায় ঘটনাটির স্পষ্ট বিবরণ রেখে যাননি; বহু পরে তাঁর শিষ্য ও জীবনীকার ‘ভিনচেঞ্জো ভিভিয়ানি’ ঘটনাটির কথা লিখেছিলেন। ফলে এটি ইতিহাস ও কিংবদন্তির সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অসাধারণ কাহিনি।

কাহিনিটি সত্য হোক বা পরবর্তীকালের অলংকরণ-পতনশীল বস্তু সম্পর্কে গ্যালিলিওর অনুসন্ধান সত্য এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে যুগান্তকারী। তাঁর আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ঢালু তলের পরীক্ষা। গোলককে ঢালু পথে গড়িয়ে তিনি পতনের গতি ধীর করে সময় ও অতিক্রান্ত দূরত্বের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। সেখান থেকে ক্রমে স্পষ্ট হয়েছিল-সমত্বরণে অতিক্রান্ত দূরত্ব সময়ের বর্গের সমানুপাতিক।

আজকের পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় আমরা জানি, বায়ুশূন্য পরিবেশে বা বায়ুর প্রতিরোধ নগণ্য হলে একই স্থানে বিভিন্ন ভরের বস্তু একই মহাকর্ষীয় ত্বরণে নিচে পড়ে। বাতাসে পালক ও লোহার বলের পতনে যে পার্থক্য দেখি, তার প্রধান কারণ তাদের ভরের পার্থক্য নয়, বায়ুর প্রতিরোধের আপেক্ষিক প্রভাব। বায়ুশূন্য পরিবেশে সেই পার্থক্য প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।

মিনারটির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়েছিল—আশ্চর্য, একটি হেলে থাকা স্থাপত্য কীভাবে মানুষের সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করার ইতিহাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে! বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথ বোধ হয় এমনই। সেখানে পূর্বসূরিদের প্রতি শ্রদ্ধা আছে, কিন্তু অন্ধ আনুগত্য নেই; অর্জিত জ্ঞান আছে, কিন্তু সেই জ্ঞানকে প্রশ্ন করার অধিকারও আছে। অ্যারিস্টটল ছিলেন মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। তবু প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর একটি বক্তব্য ভুল হতে পারে। আর সেই ভুল সংশোধিত হতে পারে পরবর্তী যুগের কোনো অনুসন্ধিৎসু মানুষের পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও পরীক্ষায়।

আমি পদার্থবিদ নই, তবে বিজ্ঞানের একজন ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে এই ভাবনাটি আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছিল। শ্রেণিকক্ষে আমরা শিক্ষার্থীদের কত তত্ত্ব, সূত্র আর প্রতিষ্ঠিত সত্য শেখাই। কিন্তু শিক্ষার সবচেয়ে বড় সার্থকতা বোধ হয় তখনই, যখন একজন ছাত্র কোনো একদিন শিক্ষকের কথাকেও প্রশ্ন করতে শেখে—অসম্মান থেকে নয়, সত্যকে আরও ভালো করে জানার আকাঙ্ক্ষা থেকে। কারণ, বিজ্ঞান বিশ্বাসের উত্তরাধিকার নয়; বিজ্ঞান হলো প্রশ্ন, প্রমাণ এবং সংশোধনের এক অন্তহীন যাত্রা।

ক্যাথেড্রাল-পাথরে লেখা প্রার্থনার মতো

হেলানো মিনারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শ্বেতমর্মরের ক্যাথেড্রালটি মিনারেরও প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো। ১০৬৩ সালে যার নির্মাণ শুরু, সেই গির্জা প্রায় এক হাজার বছর ধরে পিসার আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছে—মানুষের প্রার্থনা, শিল্পের বিবর্তন এবং ইতিহাসের অসংখ্য উত্থানপতনের নীরব সাক্ষী হয়ে। তবে, টাওয়ারের আকর্ষণ এত প্রবল যে অনেক পর্যটক তার পাশের ৯৬৩ বছরের পুরোনো পিসা ক্যাথেড্রালের দিকে যথেষ্ট সময় নিয়ে তাকান না। অথচ আমার কাছে ক্যাথেড্রালটির সৌন্দর্য কোনো অংশে কম মনে হয়নি। সাদা ও ধূসর মার্বেলের স্তর, অর্ধবৃত্তাকার খিলান, সূক্ষ্ম অলংকরণ, স্তম্ভের ছন্দ—সব মিলিয়ে স্থাপনাটি যেন পাথরে রচিত কোনো দীর্ঘ সংগীত। এর স্থাপত্যে রোমানেস্ক ঐতিহ্যের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরীয় নানা প্রভাবের মিলন ঘটেছে।

আমি ও শিরিন কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ক্যাথেড্রাল ও টাওয়ারকে একই দৃষ্টিসীমায় দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, মানুষ তার ক্ষণস্থায়ী জীবনকে অতিক্রম করার জন্যই বুঝি এমন স্থাপত্য নির্মাণ করে। নির্মাতা চলে যান, রাজা চলে যান, ধর্মযাজক চলে যান, পর্যটকের দল আসে ও হারিয়ে যায়—কিন্তু পাথর থেকে যায়। তবু পাথরও তো অমর নয়। বৃষ্টি তাকে ক্ষয় করে, বাতাস তার শরীরে দাগ কাটে, মাটি সরে যায়, ভিত্তি বসে যায়। তাহলে স্থায়িত্ব কাকে বলব? হয়তো স্থায়িত্ব কোনো বস্তুতে নয়-মানুষের স্মৃতি ও উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতায়।

টাস্কানির পথে

পিসা টাস্কানির একটি অংশ মাত্র, অথচ ‘টাস্কানি’ নামটির মধ্যেই যেন ইতালির এক বিশেষ সৌন্দর্যের প্রতিশ্রুতি লুকিয়ে আছে। পথের দুপাশে ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করা সবুজ পাহাড়, দূরে আঙুরখেত ও জলপাইবাগান, আর সরু পথের পাশে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা গাঢ় সবুজ সাইপ্রেস। পাহাড়ের মাথায় হঠাৎ চোখে পড়ে শতাব্দীপ্রাচীন কোনো গ্রাম-পাথরের বাড়ি, পোড়ামাটির রঙের ছাদ, পাশে ছোট গির্জার চূড়া। কোথাও বিস্তীর্ণ আঙুরখেত দিগন্তে গিয়ে মিলিয়েছে, কোথাও সবুজের মধ্যে একাকী দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো কোনো খামারবাড়ি। মনে হয়, এখানে মানুষ প্রকৃতিকে জয় করতে চায়নি; বরং তার পাশে নিজের জন্য সামান্য জায়গা করে নিয়ে সহাবস্থান করতে শিখেছে।

টাস্কানির সৌন্দর্য জাঁকজমকের নয়-তার সৌন্দর্য সংযমের, আলো-ছায়ার এবং প্রশান্তির। বিশেষ করে বিকেলের আলো যখন তির্যক হয়ে পাহাড়ের গায়ে পড়ে, সবুজ মাঠ ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে আসে, দূরের বাড়িগুলো নরম ছায়ায় মিশে যায়—তখন গোটা ভূদৃশ্যটিই যেন একটি রেনেসাঁ চিত্রকর্ম। মনে হয়, কোনো শিল্পী একটু আগেই শেষ তুলির আঁচড়টি দিয়ে রংতুলি নামিয়ে রেখেছেন।

এই ভূখণ্ডেই পাশাপাশি বেড়ে উঠেছে পিসা, ফ্লোরেন্স, সিয়েনার মতো ঐতিহাসিক শহর। এখানকার মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলাঞ্জেলো ও গ্যালিলিওর স্মৃতি; ফ্লোরেন্স হয়ে উঠেছিল রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। শিল্প, বিজ্ঞান ও মানবতাবাদের যে নবজাগরণ একসময় ইউরোপের চিন্তার জগৎ বদলে দিয়েছিল, তার অনেক পদচিহ্ন ছড়িয়ে আছে এই টাস্কান ভূমিতেই।

ফিরে এসে যা রয়ে গেল : ভ্রমণের বহু বছর পরে ছবি খুললে বিস্ময়কর একটি ব্যাপার ঘটে। ছবিতে আমরা একই বয়সে থেকে যাই। আমাদের পেছনে টাওয়ারটি হেলে আছে ঠিক আগের মতো, ক্যাথেড্রালের মার্বেলে আলো পড়েছে, ঘাস সবুজ, আকাশে মেঘ। শুধু ছবির বাইরে সময় এগিয়ে গেছে।

আজ বুঝি, ভ্রমণের আসল সম্পদ স্থান দেখা নয়—সময়কে স্মৃতিতে রূপান্তর করা। আমরা যখন কোনো দূরদেশে যাই, কিছুদিন পরে সেই দেশ থেকে ফিরে আসি; কিন্তু দেশটির সামান্য অংশ আমাদের ভেতরে থেকে যায়। পিসার শ্বেতমর্মর, আরনোর জল, টাস্কানির আকাশ—সব মিলিয়ে সেই ২০০৮ সালের দিনটি এখন আমার জীবনেরই একটি অনুচ্ছেদ। পিসার টাওয়ার আমাকে আর-একটি কথাও মনে করিয়ে দেয়—নিখুঁত হওয়াই সৌন্দর্যের একমাত্র শর্ত নয়।

টাওয়ারটি যদি সম্পূর্ণ সোজা হতো, হয়তো এত মানুষ তাকে দেখতে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসত না। তার অসম্পূর্ণতাই তার পরিচয়, তার দুর্বলতাই তার বিস্ময়। মানুষের জীবনও কতটা এমন! আমাদেরও কোথাও না কোথাও হেলে যাওয়া আছে—ব্যর্থতা আছে, ভুল আছে, অসমাপ্ত স্বপ্ন আছে, সময়ের কাছে পরাজয়ের চিহ্ন আছে। অথচ সেই অসম্পূর্ণতাগুলো বাদ দিলে আমাদের জীবনের গল্পটিও হয়তো আর আমাদের থাকে না।

  • লেখক: অধ্যাপক রাশিদুল হক: সাবেক সহ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়