চা আর শিঙাড়ার গল্প

ফাইল ছবি

চায়ের সঙ্গে শিঙাড়ার সখ্য কবে থেকে শুরু, জানি না। আমার সঙ্গে এই চা-শিঙাড়ার পরিচিতি কবে, তা–ও মনে নেই, সম্ভবত থাকার কথাও না। শুধু বিচ্ছিন্নভাবে মনে পড়ে চা-শিঙাড়ার সঙ্গে মিশে থাকা দিনগুলো। এই ডুবো তেলে ভাজা বাদামি চৌহদ্দির মধ্যে আলুর সঙ্গে সঙ্গে কতশত স্মৃতিও যে ঘাপটি মেরে ছিল, তা একা একা চা-শিঙাড়া খেতে খেতে সেদিন উপলব্ধি করলাম। প্রতি কামড়ে ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সময়গুলোও যেন ভেসে উঠতে লাগল চোখের সামনে।

একটা সময় নিয়মিত খিলগাঁওয়ে ডাস্টবিনের বিপরীতে রাস্তার কোনায় থাকা রেস্তোরাঁয় দুই টাকার ছোট আকারের শিঙাড়া খাওয়া হতো। দাভাই টিউশন করিয়ে ফেরত আসার পথে নিয়ে ফিরত, কখনো বাবা আনত, আবার কখনো শুক্রবারে বাসায় আসা আত্মীয়ের হাতে থাকত সেই শিঙাড়া। রেস্তোরাঁর বিপরীতে ডাস্টবিন থাকায় ‘ডাস্টবিনের দোকানের শিঙাড়া’ হিসেবেও এর খ্যাতি ছিল। মা রাগ করত দুপুরবেলা ওসব খেয়ে পেট ভরিয়ে নিয়ে ভাত না খেতে পারার জন্য। বিকেলে দুধ-চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য রেখে দিতে বলত। লোভী জিহ্বার নাগাল থেকে কদাচিৎ দু-একটা শিঙাড়া বেঁচে থাকতও, আর খাওয়া হতো চায়ের সঙ্গে। বাঙালি হয়ে চা-শিঙাড়ার জমজমাট উপাখ্যান ব্যাখ্যা করার আবশ্যকতা আছে বলে মনে হয় না।

শিঙাড়া খাওয়া হতো গ্রামের বাড়িতে গেলেও। হোক কাছের গ্রামের বাজার, কিংবা খানিকটা দূরের উপজেলার দোকান—শিঙাড়া ছিল সঙ্গী। প্রায় যেন নিয়মই হয়ে গেছিল। উপজেলায় ভাইয়েরা সদলবলে গেলে কোনোবারই দোকানে বসে শিঙাড়া খাওয়ার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কয়েক মাইল হেঁটে গিয়ে গরম গরম শিঙাড়া-চা, আর কখনো সঙ্গে বাড়তি পাওনা রসগোল্লা—এর স্বাদ অনন্য। গেলে জেঠুর সঙ্গে দেখা হতো, আর উনি আমাদের দেখামাত্র শিঙাড়া আনানোর আদেশ দিতেন। উনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে ওই রাস্তার দিকে তাকিয়ে আমরা ভাইয়েরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তাম। কত মানুষ চলে যায়, কিন্তু যাত্রাপথের এক সাধারণ রাস্তার মোড়ে আজন্ম স্মৃতির জন্ম দিয়ে যায়।

শিঙাড়ার প্রতি ভালোবাসা কমেনি বুয়েটে পড়তে এসেও। প্রতিদিন বিকেলে ‘হালকা’ খাবারের নামে হলের ক্যানটিনে যা খেতাম, তা ওজন কিংবা ক্যালরি—কোনো হিসাবেই হালকা ছিল না। খাবারের মান ভালো না হলেও উপায় ছিল না। তাই আলুর চপ, ছোলা, চিকেন চপ প্রভৃতি খাবারের সঙ্গে তালিকায় থাকত শিঙাড়া আর দুধ-চা। এরও আগে কলেজের কথা আর না-ই বলি। ব্রেক শুরু হওয়ার এক মিনিটের মধ্যে দৌড়ে ক্যানটিনে পৌঁছাতে পারলেও শিঙাড়ার দেখা মিলত না। আমার দৃঢ় ধারণা ছিল, শিঙাড়া খাওয়ার লোভে কিছু ছাত্র ব্রেকের আগের ক্লাসটা করত না। তবু ধাক্কাধাক্কির মধ্যে কখনো কখনো শিঙাড়া খাওয়ার সুযোগ মিলত। আহ, পরিশ্রমের পরে পাওয়া শিঙাড়ার সে কী স্বাদ!

এরও আগে যখন সরকারি স্কুলে পড়তাম, তখন টিফিনে সপ্তাহে এক দিন বা দুই সপ্তাহে এক দিন আসত শিঙাড়া। সে কী খুশি ছিল আমাদের!

বরিশাল অঞ্চলে শিঙাড়ার মধ্যে বোম্বাই মরিচ দেওয়ার প্রচলন দেখেছি। হয়তো অন্যান্য কিছু জায়গাতেও দেয়, জানি না, তবে ঢাকায় বেশির ভাগ জায়গাতেই দিতে দেখিনি। সেই বোম্বাইয়ে ঝাল কমবেশি যা–ই হোক, ঘ্রাণ ছিল অসামান্য। আর সেই স্বাদ-ঘ্রাণের পাল্লায় পড়ে একের পর এক শিঙাড়া চলে যেত মুখের অতল গহ্বরে। অ্যাসিডিটির সমস্যা হবে তো পরে দেখা যাবে! অ্যাসিডিটির পাল্লা ভারী করতে সঙ্গে দুধ-চায়ের চেয়ে ভালো আর কী আছে! বাড়ি থেকে ফেরার দিন বরিশাল শহরে আত্মীয়দের বাসায় কিংবা মাঝেমধ্যে বিখ্যাত সকাল-সন্ধ্যা রেস্তোরাঁতেও শিঙাড়া ছিল পছন্দের তালিকার প্রথম দিককার খাবার। একবার সোনা মামার বাসার কথা মনে পড়ে। সকালে ভরপেট পরোটা-ভাজি খেয়েও খানিক পরে শিঙাড়া হাজির হওয়ায় ভরা পেটকে বুক পর্যন্ত ভরাতে খেয়ে নিয়েছিলাম গোটা দুয়েক বড় শিঙাড়া। নোয়া মামা এসেছিল সেদিন বাসায়, এটাও স্পষ্ট মনে পড়ে। নোয়া মামা নেই তা–ও প্রায় ১১ বছর। কত স্মৃতি, কত কথা মনে নেই, অথচ হাজার হাজার শিঙাড়া খাওয়ার মাঝে এই স্মৃতি আজও টিকে আছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

কলেজ/ভার্সিটির ক্যানটিনে, রেস্তোরাঁয় একা বা দল বেঁধে চা-শিঙাড়ার বিকল্প পাওয়া মুশকিল। তাই তো বোধ হয় বাঙালির অজস্র স্মৃতির মাঝে আড্ডার প্রতীক হিসেবে টিকে থাকে এই চা আর শিঙাড়া।

দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে চলে আসায় অনেক খাবার পাওয়াই কঠিন হয়ে ওঠে। টাটকা শিঙাড়ার মতো নানান খাবারের জন্য মন আইঢাই করলেও তা ধামাচাপা দেওয়া শিখতে হয়। মাসির বাসায় বেড়াতে গেলে ঘরে বানানো শিঙাড়া খাওয়া হলেও নিয়মিত খাওয়ার সুযোগ তো হয়ে ওঠে না। তবে গত বছর থেকে সেই দুঃখ লাঘব হয় মূল ক্যাম্পাসের কাছে এই ভারতীয় রেস্তোরাঁর আবির্ভাব ঘটায়। নিয়মিত খদ্দের হয়ে উঠতে দেরি হয়নি। মোটামুটি যুক্তরাষ্ট্রে আমার প্রিয় শিঙাড়ার (যদিও ওদের ভাষ্যমতে সমুচা) তালিকায় এটা এখন পর্যন্ত এক নম্বরে আছে। চা-শিঙাড়ার এই প্যাকেজ সবাই মিলে গিয়ে বা একা গিয়েও অসংখ্যবার খেয়েছি।

প্রতি কামড় যেন কয়েক বছর করে পিছিয়ে নিয়ে যায়। স্বাদ বদলায়, দাম বদলায়, স্থান বদলায়, কিন্তু এ সবকিছু কীভাবে যেন আটক রাখে সঙ্গের সময়টাকেও।

মাত্র দুই টাকার (এখন ডলারের) শিঙাড়া আর দুধ-চা পরম যত্নে এত স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, কে জানত!

*লেখক: অংকন ঘোষ দস্তিদার, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন