মধ্যপ্রাচ্যে রেমিট্যান্স বাড়াতে প্রয়োজন আরবি ভাষা শিক্ষা
আরবি ভাষা আমাদের কাছে একটি বিদেশি ভাষা। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আরবি ভাষা বিশ্বের প্রায় ২৮টি দেশের মাতৃভাষা। ২৫ কোটি মানুষ আরবিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। এ ভাষার অনেক গুরুত্ব থাকার কারণে ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আরবি ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ইউনেস্কো ২০১২ সালে ১৮ ডিসেম্বরকে আরবি ভাষা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে। ২০১৩ সালে ইউনেস্কোর উপদেষ্টা পরিষদ আরবি সংস্কৃতি তুলে ধরার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আফ্রিকান ইউনিয়ন, ওআইসিসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিশিয়াল ভাষা আরবি। শুধু তা–ই নয়, ব্যবসায়িক ভাষা (Trade Language) হিসেবে-এ ভাষা অনারব দেশের প্রায় প্রতিটি পণ্যের মোড়কে শোভা পায়। পণ্যের গুণগত মান ও বিজ্ঞাপনসংবলিত আরবি লেখা আমাদের দেশের ৫ টাকার বিস্কুটের প্যাকেট লক্ষ করা যায়। এতে অতি সহজেই আমাদের কাছে আরবি ভাষার মর্যাদা, গুরুত্ব ও এ ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুমিত হয়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে আরবি চর্চা হয়। অমুসলিমরা আরবির চর্চা করে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কিংবা ইসলামকে জানার জন্য। আর মুসলমানরা আরবি শেখে ধর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগন ধর্মীয় কারণ ছাড়াও অর্থনৈতিক কারণে আরবি ভাষাকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি হচ্ছে রেমিটেন্স আর এই রেমিটেন্সের সিংহভাগ আসে আরব বিশ্ব থেকে। বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২০ সালে সব অধিবাসীরা ২১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার রেমিটেন্স বাংলাদেশে পাঠায়। এই বিপুলসংখ্যক রেমিটেন্সের ৭৩% আসে গালফভূক্ত অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের এ বিশাল শ্রমবাজারের প্রধান অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা এবং তা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকার আরও উদ্যোগী হবে।
প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ জীবিকার তাগিদে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন আরব-বিশ্বে। অথচ আরবি ভাষার সঙ্গে তাঁদের পূর্ব কোনো সম্পর্ক থাকছে না। তাঁরা পেশাগতভাবে আরবি ভাষায় দক্ষ না হওয়ায় যথাযোগ্য বেতন–ভাতা ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিশাল শ্রমশক্তি আরবি ভাষায় সুদক্ষ না হওয়ায় যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছেন না। বিশিষ্ট গবেষক মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কাজের ক্ষেত্রে একসময় ভাষাগত দক্ষতা না থাকলেও তেমন সমস্যা হতো না, কিন্তু বর্তমানে বিদেশি কোম্পানিগুলো আরবি ভাষা জানা শ্রমশক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভারত, চীন, জাপান, কম্বোডিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো আমাদের দেশেও যদি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিদেশগামী শ্রমশক্তিকে ভাষাগত দক্ষ করে প্রেরণ করা যেত, তাহলে আরবিভাষী দেশগুলোতে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত ও সুদৃঢ় করতে পারত এবং দেশের আরও অধিক পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আসত। এ সব বিবেচনায় জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে দক্ষ ও পারদর্শী জনশক্তি তৈরি করার নিমিত্তে আরবি ভাষা শিক্ষা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি আরবের প্রাক্তন ইকোনমিক কাউন্সিলর ও মিনস্টার মোহাম্মদ আবুল হাসান ‘মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও দেশের রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে আরবি ভাষা শিক্ষা অপরিহার্য’ শীর্ষক সেমিনার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘আমরা আরবি ভাষা শিখি ধর্মীয় কারণে, কিন্তু দুনিয়ার কারণে আরবি ভাষা শেখে ফিলিপিন, চাইনিজ, শ্রীলঙ্কা ও ভারতীয়রা। আমি পুরো আরবি ভাষায় বক্তৃতা শুনেছি রিয়াদের চাইনিজ অ্যাম্বাসেডর ও শ্রীলঙ্কান অ্যাম্বাসরকে। আমার দেখা বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা যেমন হজ কাউন্সিলর, জেদ্দা, ডিফেন্স অ্যাটাচে, রিয়াদ, সৌদি আরব, ডেপুটি চিপ অব মিশনে রয়েছেন, যারা আরবিতে অনর্গল কথা বলেছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ভাষা শিক্ষা ও শিখানোর ব্যাপারে তৎপর। আরবি ভাষায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কান্ট্রিজের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট প্রস্তুত রয়েছে। আমরা ওয়াইআইসির ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে অনলাইনে প্রশিক্ষণ অনায়াসে চালু করতে পারি। তাদের অফিশিয়াল ভাষা হলো আরবি ও ফার্সি। আমাদের চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের আরব–বিশ্বে চাকরির পথ সুগম করতে দ্রুত অনলাইনে আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা যেতে পারে। সাধারণ শিক্ষার পাঠ্যক্রমে আরবিকে অন্তর্ভুক্ত করায় সরকারকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। তার সঙ্গে এই ব্যবহারিক আরবি শিক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশর সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
দেশে রেমিটেন্স অর্জনের ক্ষেত্রে আরবি ভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কারণ, দেশের বৈদেশিক রেমিটেন্স অর্জনের শতকরা ৮০ ভাগ আসে আরবি ভাষাভাষী দেশ থেকে। অর্থনৈতিক এ গুরুত্ব বিবেচনা করে ভারত দেশে আরবি ভাষাকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। আরব বিশ্বে জনশক্তি রপ্তানির জন্য তাদের আরবি ভাষায় দক্ষ করে তোলে। একইভাবে পাকিস্তানও সে দেশের নাগরিকদের আরবি ভাষায় প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। অথচ আমরা আরবি ভাষাকে অবহেলার কারণে সৌদি আরবে অধিকাংশ বাঙালি নিম্ন পর্যায়ের কাজ করতে দেখা যায়। আরবি ভাষার অদক্ষ হওয়ার কারণে তাঁরা অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে শ্রমিকের মর্যাদা পায়। অপরপক্ষে আরবিতে দক্ষ হওয়ার কারণে ভারত এবং পাকিস্তানের শ্রমিকদের অফিশিয়াল বিভিন্ন কাজে নিয়োগ পেতে দেখা যায়। একটি সমীক্ষায় দেখ যায়, সৌদি আরব থেকে হাজারো বাংলাদেশি যে রেমিটেন্স পাঠান, তার চেয়ে বেশি পাঠান ডেনমার্কের মাত্র ৩০০ জন সৌদিতে কর্মরত ডেনিস নাগরিক।’
সৌদি আরবের কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয় অনারবদের আরবি ভাষা পাঠদান পদ্ধতি এ বিষয়ে মাস্টার্স করার সুবাদে ফিল্ড ওয়ার্ক করতে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ছোটখাটো ব্যবসা করতে যে সমস্যা আমি বাস্তবে দেখেছি, তা হচ্ছে, বাংলাদেশিরা বাকালা বা ছোট মুদি দোকান খুলেন কিংবা নানা প্রকার ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িত হন, ফলে তার এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালাতে হলে তাঁকে একজন সুদানি না হয় মিশরীয়কে রাখতে হয়। যাঁরা দৈনিক পত্রলাপ বা যোগাযোগ অথবা আইনগত কার্যদি সম্পন্ন করার জন্য তাঁদের বিশাল অংকের একটি অর্থ প্রদান করতে হয়। যদি ওই বাঙালি ভালো করে আরবি জানত, তাহলে তার এই বিশাল অংকের অর্থ অপচয় হতো না। তাই আরব বিশ্বের ভালো মানের চাকরির বা ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবহারিক আরবি শিক্ষা করা আবশ্যক। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এই ভাষা শিক্ষায় যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তা একেবারে অপ্রতুল।
*লেখক: তাজুল ইসলাম কাউসার, কিং সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ, সৌদি আরব