পরবাসে রমজান–১২: চীন
চীনে রমজানের অভিজ্ঞতা: ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন
‘দূর পরবাস’–এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশ, যেখানে বহু জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে। আনুষ্ঠানিকভাবে চীনে ৫৬টি জাতিগত গোষ্ঠী রয়েছে, যেমন হান, ঝুয়াং, হুই, উইঘুর, তিব্বতি, মঙ্গোল, ইয়াও, মিয়াও, তংসহ অন্য জাতিগত গোষ্ঠী। তাদের মধ্যে হান হলো চায়নিজ বৃহত্তম গোষ্ঠী। ৯১ দশমিক ৬০ শতাংশ হান চায়নিজ গোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ৫৬টি জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে ১০টি মুসলিম জাতিগত গোষ্ঠী রয়েছে, যেমন হুই, উইঘুর, কাজাখ, ডংশিয়াং, কিরগিজ, সালার, তাজিক, উজবেক, বনান ও তাতার। ইসলাম চীনে একটি প্রাচীন ধর্ম এবং চীনের মুসলিম সম্প্রদায় পবিত্র রমজান মাসকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে। চীনে পবিত্র রমজানের অভিজ্ঞতা শুধু ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মেলবন্ধন।
চীনের পটভূমি অন্যান্য দেশ থেকে কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় এখানে পবিত্র রমজানের অভিজ্ঞতাও আলাদা হয়ে থাকে। চীনের মুসলমানরা প্রধানত শিনচিয়াং, নিংশিয়া, গানসু ও ছিংহাই প্রদেশ এবং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বসবাস করে। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছোট ছোট মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে। এ ছাড়া বড় শহরগুলোর মধ্যে বেইজিং, সাংহাই, গুয়াংজু ও শেনজেনেও মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বর্তমানে প্রায় দুই কোটি মুসলমান রয়েছে, যাদের অধিকাংশই উইঘুর জাতিগোষ্ঠীর এবং তারা শিনচিয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বসবাস করে।
চীনের মুসলমানরা পবিত্র রমজানের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুতি নেয়। পবিত্র রমজানের আগে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, রান্নার উপকরণ সংগ্রহ করা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো একটি সাধারণ প্রথা। স্থানীয় বাজারে পবিত্র রমজানের জন্য বিশেষ খাবার ও মিষ্টান্নের সমারোহ দেখা যায়। মুসলিম পরিবারগুলো ইফতার ও সাহ্রির জন্য বিশেষ খাবার প্রস্তুত করে, যা স্থানীয় সংস্কৃতি ও স্বাদের প্রতিফলন ঘটায়।
চীনের মুসলমানরা পবিত্র রমজানে ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করে, যা তাদের স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামি রীতির মিশ্রণ। জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলমানরা পোলাও, কাবাব, নানরুটি ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন ইফতারে পরিবেশন করে। নিংশিয়া অঞ্চলে হুই মুসলমানরা গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস ও স্থানীয় সবজি দিয়ে তৈরি খাবার পছন্দ করে। সাহ্রিতে সাধারণত পুষ্টিকর ও হালকা খাবার খাওয়া হয়, যেমন দুধ, ফল ও রুটি। তা ছাড়া জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলমানরা তাদের ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে পবিত্র রমজানের আনন্দ প্রকাশ করে। নিংশিয়া অঞ্চলে হুই মুসলমানরা স্থানীয় ভাষায় ধর্মীয় আলোচনা ও কোরআন তিলাওয়াত করে। চীনের মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংস্কৃতির উপাদানকে একীভূত করে একটি অনন্য পবিত্র রমজান অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
চীনে পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে প্রদেশভিত্তিক ইফতার আয়োজনে দেখা যায় নানা বৈচিত্র্য। মসজিদে সুবিন্যস্ত টেবিলে রোজাদারদের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। মাগরিবের আজানের সময় মোনাজাত করে কেবল খেজুর, চা ও একপ্রকার স্যুপ খেয়ে রোজা ভাঙেন মুসল্লিরা। এরপর সবাই নামাজে অংশ নেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্যও নামাজের ব্যবস্থা থাকে। নামাজের পর মুরগি ও গরুর মাংসের পাশাপাশি নুডলসসহ মসজিদ থেকে নানা পসরা পরিবেশন করা হয় মুসল্লিদের জন্য। মসজিদের ইফতারে চীনা মুসলিম নাগরিকদের সঙ্গে যোগ দেন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ অন্য দেশের মুসলমানরাও। চীনের মসজিদগুলো পবিত্র রমজান মাসে বিশেষভাবে সজ্জিত হয় এবং মুসল্লিদের ভিড়ে পরিপূর্ণ থাকে। বিশেষ করে তারাবিহর নামাজে মুসলমানরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। চীনে পবিত্র রমজান পালন করার কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন বেশির ভাগ চীনা অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোজার সময় কোনো বিশেষ ছুটি বা সুবিধা দেওয়া হয় না। অনেক মুসলমানকে ক্লাস বা কর্মস্থলে নিয়মিত সময়সূচি অনুসরণ করতে হয়, যা রোজা রাখা অবস্থায় কিছুটা কঠিন হতে পারে।
আমি চীনে সাত বছর ধরে আছি। চীনের ৩৪টি প্রদেশ, স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল ও বিশেষ পৌরসভার মধ্যে ২৬টিতে ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। আমি চীনে প্রায় ২০০টির বেশি গ্রাম ও শহর ঘুরেছি। চীনের মুসলিম সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইফতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কার্যক্রম। স্থানীয় মসজিদগুলো বিনা মূল্যে ইফতার ও সাহ্রি বিতরণ করে এবং বিদেশি মুসলমানদের জন্য এটি একটি মিলনমেলার মতো হয়ে ওঠে, বিশেষ করে শুক্রবারে জুমার দিন। চীনের ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ইফতারির আইটেমও পাওয়া যায়।
চীনের অধিকাংশ বাংলাদেশি প্রবাসী শিক্ষার্থী, তবে চাকরিজীবীর পাশাপাশি রয়েছে অনেক ব্যবসায়ীর বসবাস। চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বছরে দুবার শীতকালীন আর গ্রীষ্মকালীন ছুটি পেলেও বাংলাদেশের মতো পবিত্র রমজান মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছুটি কিংবা হাফ অফিস থাকে না। কোনো ঈদের ছুটি নেই, জুমার দিনও অনেকের ক্লাস থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল ডরমিটরিগুলোয় বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীদের বসবাস।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও আরবের দেশ বাদে মুসলমানদের সংখ্যা হাতে গোনা। তাই ডরমিটরিগুলোয় রাতের রান্না ও সাহ্রি খাওয়ার সময় গভীর রাতে বেশ সাবধানেই কাজ করতে হয়। কারণ, অন্যের ঘুম যাতে নষ্ট না হয়। চীনে প্রতিটি প্রদেশে বা বড় শহরগুলোয় মসজিদ আছে, যা সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থিত। কিন্তু অনেক শহরে মসজিদ নেই। তাই অনেক দূর থেকে গিয়ে জুমা আদায় করতে হয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তারাবিহর জামাত ছাত্ররা রুমে অথবা ডরমিটরির ছাদেই সাবধানতার সঙ্গে আদায় করে থাকেন। মসজিদে আজান হলেও দূরবর্তী স্থানে হওয়ায় দেশের মতো মসজিদ থেকে ভেসে আসে না কোনো আজানের ধ্বনি। সাহ্রির জন্যও কোনো মাইকের আওয়াজ ভেসে আসে না। তাই নিজ দায়িত্বে পবিত্র রমজান মাসের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা নিজেকেই করতে হয়।
ঝেংঝু ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত পিএইচডি শিক্ষার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান ছয় বছর ধরে চীনে। পবিত্র রমজান পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, পবিত্র রমজান পালনের অভিজ্ঞতা বেশ ভালোই এবং এটি চীনে তাঁর চতুর্থ রমজান। খুব ভোরে উঠে সাহ্রি করার বিশেষ মুহূর্তটির মধ্যে দিনের শুরু হয়। গবেষণা ও ল্যাবের কাজের ফাঁকে নামাজ পড়ি ও ইফতার করি। ইফতারে সাধারণত ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি ও বিভিন্ন ফলমূল খাওয়া হয়। তা ছাড়া বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে মাঝেমধ্যে ইফতার করা, গল্প করা এবং একে অপরের সঙ্গে সময় কাটানো হয়।
পবিত্র রমজান পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হচ্ছিল চীনে এক্সপোর্ট ও ইমপোর্ট ব্যবসায়ী মো. রেদওয়ানুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি চায়নায় ২০১৯ সাল থেকে বাস করছি। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রোজা চায়নাতে পালন করছি। প্রথমে ভার্সিটিতে পড়াশোনা চলাকালে বাঙালি কমিউনিটির সঙ্গে একসঙ্গে পবিত্র রমজান পালন ও ঈদ উদ্যাপন করতাম। বর্তমানে আমার বাস ইয়ু শহরে। এখানে চায়নিজ, ভারতীয়, পাকিস্তানি, অ্যারাবিয়ান, আফ্রিকানসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার করি। ইয়ু শহরে অনেক দেশের ব্যবসায়ী বসবাস করার কারণে এখানে বিভিন্ন দেশের বাহারি রকমের ইফতারির স্বাদ নিতে পারি। মাঝেমধ্যে আমরা বাঙালিরা মিলেও ইফতার পার্টির আয়োজন করি। অমুসলিম দেশে বসবাস করেও সুন্দরভাবে মসজিদে নিয়মিত ইফতার ও তারাবিহর নামাজ আদায় করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত।’
সাবরিনা সুলতানা লিজা বর্তমানে জিয়াংনান বিশ্ববিদ্যালে স্কলারশিপ নিয়ে মাস্টার্স ইন ফার্মেসিতে অধ্যয়ন করছেন। চীনে পবিত্র রমজান পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি জানান, ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১০ বাংলাদেশি আছে। আমি ২০২৪ সালে স্কলারশিপ নিয়ে অধ্যয়ন করতে চীনে এসেছি। এর আগে চায়না থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি ২০২২ সালে শেষ করেছি। আমি দ্বিতীয়বারের মতো মা–বাবা ও পরিবারকে ছাড়া পালন করছি। দেশে থাকতে মা–বাবা, ভাই–বোন ও বন্ধুদের সঙ্গে ইফতার করতাম। কিন্তু চীনে এসে সেটা মিস করি। পরিবারকে সবচেয়ে বেশি মিস করি।’
পরিশেষে বলব, চীনে পবিত্র রমজানের অভিজ্ঞতা ধর্মীয় ভক্তির পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অপূর্ব সমন্বয়। এটি চীনের মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্থানীয় ঐতিহ্যের মধ্যে গভীর সংযোগের প্রতিফলন। চীনে পবিত্র রমজান শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং এটি মানবিক মূল্যবোধ, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
লেখক: মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম, চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওভারসিজ এডুকেশনে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষক ও গবেষক।