লস অ্যাঞ্জেলেসের উডলি পার্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আনন্দমুখর এক দিন
সিলেটের লোকগানের পরিচিত সুরে মিশে থাকে আপনজনের কাছে ফেরার টান। তেমনি প্রবাসে থাকা সিলেটের মানুষজনের পরস্পরের প্রতি টান যেন অটুট।
সেই টানেই গ্রীষ্মের এক রৌদ্রোজ্জ্বল সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের উডলি পার্কে বসেছিল সিলেটের প্রবাসীদের বার্ষিক বনভোজনের আসর।
দুপুরের সোনারোদে পার্কের সবুজ মাঠে চারদিকে ছিল নানা খাবারের আয়োজন। পরিবারের সদস্য আর পুরোনো বন্ধুদের আড্ডায় অনেকেই মেতেছিলেন।
শিশুদের ছোটাছুটি, হাসি আর খেলাধুলায় মুখর হয়ে উঠেছিল চারপাশ। মূলত সিলেটের প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে এই বনভোজন আয়োজন করা হয়েছিল। তবে এই মিলনমেলায় যোগ দিয়েছিলেন বিভিন্ন এলাকার প্রবাসী বাংলাদেশিরাও।
গত রোববার (২৩ আগস্ট) জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্যোগে এই বনভোজন আয়োজন করা হয়। চলে বেলা ১টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বনভোজনে প্রায় ৮০০ প্রবাসী অংশ নেন। পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে আসা মানুষগুলো দীর্ঘদিন পর পরিচিতজনদের কাছে পেয়ে যেন ফিরে গিয়েছিলেন ফেলে আসা অতীতে। ব্যস্ত প্রবাসজীবনের বাইরে কয়েক ঘণ্টা সবাই মেতে উঠেছিলেন অনাবিল আনন্দ, আড্ডাসহ নানা আয়োজনে।
উৎসবের আমেজ
বেলা ১টার পর থেকেই উডলি পার্কে বাড়তে থাকে প্রবাসীদের ভিড়। চমৎকার আবহাওয়ায় পার্কের বিভিন্ন অংশে গোল হয়ে বসে খাবার উপভোগ করেন প্রবাসীরা। খাবারের পাশাপাশি চলে কুশল বিনিময়, ফেলে আসা দিনের স্মৃতিচারণা।
কাজের ও পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে সারা বছর যাঁদের সঙ্গে দেখা হয় না, এমন আয়োজনে পুরোনো বন্ধু, পরিচিতদের কাছে পেয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন অনেকেই। কেউ পুরোনো দিনের গল্পে মেতেছেন। কেউবা নতুন পরিচিতদের সঙ্গে আলাপ জমিয়েছেন।
বনভোজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নানা ধরনের খেলাধুলা। শিশুদের জন্য ছিল চকলেট দৌড় ও সাধারণ দৌড়। বড়দের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল মোরগ লড়াই, বস্তা দৌড়, রশি টানাটানিসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা।
নারীদের অংশগ্রহণে পিলো পাসিং (বালিশ বদল) খেলায় তৈরি হয়েছিল বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য। গান চলার সঙ্গে সঙ্গে একে অপরের হাতে বালিশ দেওয়ার এই খেলায় ছিল দারুণ উত্তেজনা। কখন গান থেমে যায় আর কার হাতে বালিশ থাকে—তা নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের পাশাপাশি দর্শকদের করতালি, উৎসাহে চারপাশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
খেলার মাঠের বাইরেও ছিল গান ও আড্ডার আসর। কেউ সুরে সুরে মেতেছেন, কেউবা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন প্রবাসজীবনের গল্প। আড্ডায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে বাংলাদেশ ও সিলেটের নানা স্মৃতি।
অনেকেই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে ফ্রেমবন্দী করেছেন সুন্দর মুহূর্তগুলো। দিনের আয়োজনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে র্যাফেল ড্র পর্ব। পুরস্কার পাওয়ার আশায় সবার মাঝেই ছিল বাড়তি কৌতূহল। একেকটি নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়েন বিজয়ীরা।
শেকড়ের সন্ধানে নতুন প্রজন্ম
আয়োজনে শিশু-কিশোরদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য এটি ছিল নিজেদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক দারুণ সুযোগ। খেলাধুলার পাশাপাশি তারা নিজেদের বয়সী অন্যদের সঙ্গে মিশেছে, তৈরি করেছে নতুন বন্ধুত্ব। তাদের কলকাকলি আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসে বনভোজনের পরিবেশ পেয়েছিল আলাদা মাত্রা।
যাঁদের উদ্যোগে আয়োজন
সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আবদুল মুনিম ও সাধারণ সম্পাদক লায়েক আহমেদের নেতৃত্বে আয়োজিত এই বনভোজনে নানা শ্রেণি-পেশার প্রবাসীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার নেতা ও অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ নাসির জেবুল, মইনুল হক, মুশফিকুর চৌধুরী, বদরুল আলম মাসুদ, আবদুল বাসেত, লোকমান হোসেন, মাহতাব আহমেদ, ইলিয়াস সিকদার, খান মুহাম্মদ আলী, শিপার চৌধুরী, বদরুল এ চৌধুরী, এম ওয়াহিদ রহমান, মোর্শেদ আলম, আবুল হাসনাত রায়হান, নজরুল আলম প্রমুখ।
এ ছাড়া সাংবাদিক কাজী মশহুরুল হুদা, লস্কর আল মামুনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বিকেল ৬টায় বনভোজনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। তবে প্রবাসীদের আড্ডা চলে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। যাওয়ার সময় অনেকেই একে অপরকে বিদায় জানিয়েছেন। শেষবারের মতো তুলেছেন দলীয় ছবি। পরের কোনো অনুষ্ঠানে আবার দেখা হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে ফিরেছেন সবাই।
ব্যস্ত প্রবাসজীবনের এই কয়েক ঘণ্টা কেবল একটি বনভোজন ছিল না; ছিল পরিচিত মুখগুলোকে আবার কাছে পাওয়া, নতুন সম্পর্ক তৈরি করা এবং পরিজন নিয়ে আনন্দে সময় কাটানোর এক অনবদ্য উপলক্ষ।
উডলি পার্কের সেই আনন্দঘন দিনটি শেষে সবাই ফিরেছেন যার যার ঠিকানায়। সঙ্গে নিয়ে গেছেন হাসি, আড্ডা আর একসঙ্গে কাটানো সুন্দর এক দিনের স্মৃতি। সিলেটের টানে, আপনজনের গানে-উডলি পার্কে এভাবেই কেটে গেল আনন্দমুখর এক দিন।