কানাডার আলবার্টার ঐতিহাসিক গণভোট: সচ্ছলতা ও জাতীয় ঐক্যের বার্তায় ‘না’ ভোট দিলেন ভোটাররা
কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টায় বহুল আলোচিত গণভোটে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন সেখানকার জনগণ। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দেওয়া এই ভোটাভুটিতে বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছে ক্যানাডার মূল ভূখণ্ডে থেকে যাওয়ার পক্ষের সমর্থকেরা। ফলাফলের পর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে আলবার্টাবাসী চরম রাজনৈতিক বিভাজন ও স্বাধীনতার ঝুঁকিপূর্ণ পথের চেয়ে কানাডীয় ঐক্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।
ভোটের সংখ্যা ও সামগ্রিক চিত্র
ইলেকশনস আলবার্টার (Elections Alberta) দেওয়া সর্বশেষ গণনার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, প্রায় ১৩ লাখেরও বেশি জমা পড়া ব্যালটের মধ্যে প্রায় ৭৬ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁরা আলবার্টাকে কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে বা পরবর্তী বাধ্যবাধকতামূলক স্বাধীনতা গণভোটের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে চান না। অন্যদিকে মাত্র ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার স্বপক্ষে মতামত প্রকাশ করেছেন।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ক্যালগারি ও এডমন্টনের মতো জনবহুল এবং বাণিজ্যিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় শহরগুলোতে ‘কানাডায় থাকার’ পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ার দেখা গেছে। যদিও প্রদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গ্র্যান্ড প্রেইরির (Grand Prairie) মতো কিছু গ্রামীণ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদের পক্ষে তুলনামূলক বেশি ভোট পড়েছিল, কিন্তু সার্বিক ফলাফলে তা প্রভাব ফেলতে পারেনি।
উল্লেখ্য, স্বাধীনতা ছাড়াও মূল ভোটাভুটির সঙ্গে ইমিগ্রেশন ও সংবিধানে প্রাদেশিক ক্ষমতা জোরদার করা–সংক্রান্ত আরও ৯টি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। ইমিগ্রেশন ও প্রাদেশিক অধিকার–সংক্রান্ত অন্যান্য প্রশ্নগুলোতে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বললেও, দেশকে টুকরা করার বিষয়ে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়েছেন।
কেন ‘না’ বললেন আলবার্টাবাসী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আলবার্টার নাগরিকেরা আবেগের চেয়ে বাস্তবধর্মী হিসাব-নিকাশকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যে প্রধান কারণগুলোর জন্য মানুষ বিচ্ছিন্নতাবাদকে না বলেছে:
১. অর্থনৈতিক ও মুদ্রাগত ঝুঁকি: একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল। নিজস্ব নতুন মুদ্রা তৈরি, ব্যাংক ও ট্রেড চুক্তি পুনর্গঠন এবং ফেডারেল সুযোগ-সুবিধা হারানোর যে আশঙ্কা ছিল, তা কোনো সাধারণ ব্যবসায়ী বা নাগরিক গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না।
২. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সীমান্ত জটিলতা: মার্কিন সীমান্তে শুল্ক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নতুন আন্তর্জাতিক সীমানা তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মক ধসে পড়ত।
৩. বিপুল খরচের ক্ষোভ: প্রায় ১৩০ মিলিয়ন (১৩ কোটি) ডলার ব্যয় করে এই ‘গণভোটের ওপর গণভোট’ আয়োজন নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম অসন্তোষ ছিল। জনস্বাস্থ্য ও মৌলিক নাগরিক পরিষেবা ছেড়ে এই অর্থে ভোটাভুটি করাকে মানুষ অর্থের অপচয় বলেই মনে করেছেন।
৪. ফার্স্ট নেশনস (আদিবাসী) সংহতি: প্রদেশের আদিবাসী গোষ্ঠী বা ফার্স্ট নেশনস লিডাররা ঐতিহাসিকভাবে কানাডা রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের চুক্তি (Treaties) বজায় রাখার পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন, যা বিপুলসংখ্যক ভোটকে ঐক্যের পক্ষে টেনে আনে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব
গণভোটের এই ঐতিহাসিক ফল আলবার্টার ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ খাত থেকে অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে দিয়েছে বলে স্বস্তি প্রকাশ করেছে কানাডার বাণিজ্যিক মহল। বহু বছর ধরে চলা অটোয়া (কেন্দ্রীয় সরকার) বনাম আলবার্টার দ্বন্দ্বের ইতিহাস পুরোপুরি শেষ না হলেও, এই রায় প্রমাণ করল—অভিযোগ-অনুযোগ সত্ত্বেও কানাডার জাতীয় ঐক্য অক্ষুণ্ণ রাখতেই আলবার্টাবাসী সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।