ক্যালেন্ডার বদলায়, বাংলাদেশ কি বদলাবে?

প্রথম আলো ফাইল ছবি

আরেকটি নতুন বছর এসেছে। দেয়ালে ঝুলে থাকা ক্যালেন্ডারের পাতায় বদল এসেছে—তারিখ বদলেছে, বছর বদলেছে। কিন্তু প্রশ্নটা একই থেকে গেছে; এই পরিবর্তন কি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি আমাদের চিন্তা, চর্চা ও দায়িত্ববোধেও তার প্রতিফলন ঘটবে? নতুন বছর আমাদের সামনে শুধু সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয় না, আয়না ধরেও দাঁড় করায়। সেখানে আমরা দেখি, আমাদের অর্জন, আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের অনিচ্ছা আর আমাদের ভীরুতা। প্রশ্ন হলো—এই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কি সত্যটা স্বীকার করার সাহস দেখাব?

বাংলাদেশ বারবার প্রমাণ করেছে, সম্ভাবনার দিক থেকে আমরা দরিদ্র নই। তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। রয়েছে পরিশ্রমী মানুষ, রয়েছে উদ্যোক্তা হওয়ার অদম্য আগ্রহ, ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। তবু প্রতিবার নতুন বছর এলেই আমরা একই হতাশার মুখোমুখি হই, কেন প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ব্যবধান এত দীর্ঘ হয়? কেন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি না?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হয় নিজেদের দিকেই। আমরা দুর্নীতিকে অভিশাপ বলে গালি দিই, কিন্তু নিজের স্বার্থে সেটার সঙ্গে আপস করতেও দ্বিধা করি না। আমরা বেকারত্ব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করি, কিন্তু দক্ষতা অর্জন, সময়ানুবর্তিতা কিংবা পেশাগত সততা গড়ে তোলাকে অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি, কিন্তু ভিন্নমতকে সহ্য করার সংস্কৃতি এখনো গড়ে তুলতে পারিনি।

প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি সমস্যার সমালোচক হয়েই থাকতে চাই, নাকি সমাধানের অংশ হতে প্রস্তুত? আমরা কি শুধু রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাইব, নাকি নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্বটুকু পালন করব? নতুন বছর মানে কেবল শুভেচ্ছাবিনিময় নয়, ক্যালেন্ডারে লাল দাগ দেওয়া কিছু ছুটির দিনও নয়। নতুন বছর মানে আত্মসমালোচনার সুযোগ। রাষ্ট্র যেমন নাগরিকের কাছে জবাবদিহি চাইবে, নাগরিককেও তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি সৎ হতে হবে। আইনের শাসন কেবল আদালত আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিষয় নয়—এটি আমাদের দৈনন্দিন আচরণ, অফিসের কাজ, রাস্তার শৃঙ্খলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথাবার্তার মধ্যেও প্রতিফলিত হওয়া দরকার।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্ন তোলার সাহস চাই, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার মূল্যায়ন চাই, রাজনীতিতে সহনশীলতা চাই, আর সর্বোপরি সামাজিক জীবনে নৈতিকতার চর্চা চাই। এগুলো কোনো একক সিদ্ধান্তে বা এক বছরের মধ্যেই অর্জিত হবে না, তবে শুরুটা হতে পারে আজ থেকেই, এই নতুন বছরে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসলে অবকাঠামোতে নয়, নীতিতে নয়—আসতে হবে মানসিকতায়। ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা। শর্টকাট নয়, পরিশ্রম ও সততার পথে এগোনোর মানসিকতা। নীরব দর্শক হয়ে থাকার নয়, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার মানসিকতা।

২০২৬ সাল (বা যে নতুন বছরই হোক) যদি সত্যিই আগের বছরগুলোর চেয়ে আলাদা কিছু হয়ে উঠতে চায়, তবে আমাদের সাহস দেখাতে হবে, নিজেদের বদলানোর সাহস। কারণ, ক্যালেন্ডার তো প্রতিবছরই বদলায়, সরকারও বদলায়, নীতিও বদলায়। কিন্তু দেশ বদলায় তখনই, যখন মানুষ বদলায়। নতুন বছরে বাংলাদেশ কি সেই সাহস দেখাতে পারবে? উত্তরটা সময় দেবে। তবে ইতিহাস বলে, বড় পরিবর্তনের সূচনা হয় ছোট কিন্তু দৃঢ় সিদ্ধান্ত থেকে। আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।