সুশিক্ষার কারিগর: বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন প্রয়োজনীয়
শিক্ষা একটি জাতির ভিত্তি। উন্নত জাতি গঠনের প্রধান শর্ত হলো মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা, যা শুধু বই পড়ানো নয়, বরং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা তৈরি করে। তবে প্রশ্ন হলো, আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কি শিক্ষার্থীদের সেই প্রস্তুতি দিচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, শিক্ষার মূল চালিকা শক্তি—শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন; তিনি পথপ্রদর্শক, ভবিষ্যৎ নির্মাতা এবং জাতি গঠনের মূল কারিগর। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষকদের জন্য এমন কোনো বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় নেই, যেখানে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের দক্ষ করে তোলা সম্ভব।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় শিক্ষকদের জন্য পৃথক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যা শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড, জাপান ও জার্মানির মতো দেশগুলোয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক এবং তা নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। আমাদের দেশেও শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
শিক্ষার চার স্তর এবং শিক্ষকের ভূমিকা
একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গঠনের জন্য শিক্ষাকে চারটি স্তরে ভাগ করা যায়—
১. প্রাথমিক শিক্ষা
২. মাধ্যমিক শিক্ষা
৩. কলেজ শিক্ষা
৪. বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা
এই প্রতিটি স্তরে শিক্ষকদের ভূমিকা আলাদা এবং সেই অনুযায়ী তাঁদের প্রশিক্ষণও ভিন্ন হওয়া প্রয়োজন।
প্রাথমিক শিক্ষা: ভিত্তি তৈরির সময়
শিশুর শৈশবই তার ভবিষ্যতের ভিত্তি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মূলত অনুকরণ ও অনুসরণের মাধ্যমে শেখে। ফলে তাদের শেখার পরিবেশ হতে হবে ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণাদায়ক।
একজন প্রাথমিক শিক্ষককে হতে হবে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞানসম্পন্ন, ধৈর্যশীল ও শিশুবান্ধব। শিশুর বিকাশে তাঁর পরিবার ও সামাজিক প্রভাব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষকের ভূমিকাও সমানভাবে জরুরি।
প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের কি এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়?
মাধ্যমিক শিক্ষা: দিকনির্দেশনার সময়
মাধ্যমিক স্তর শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয় পরিবর্তন ঘটে এবং শিক্ষার্থীরা আত্মপরিচয়ের সন্ধানে থাকে।
এ সময়ে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পাঠদান নয়, বরং তাঁকে হতে হবে একজন পরামর্শদাতা, পথপ্রদর্শক এবং শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের সহায়ক।
বর্তমানে শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল দুনিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় কাটাচ্ছে, যা তাদের মনঃসংযোগ ও চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করছে। ফলে শিক্ষককে অবশ্যই জানতে হবে, কীভাবে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, কীভাবে শিক্ষার্থীদের ভার্চ্যুয়াল আসক্তি থেকে সরিয়ে সৃজনশীল শিক্ষার দিকে ধাবিত করা যায়। এ জন্য মাধ্যমিক শিক্ষকদের লার্নিং বাই ডুইং, লার্নিং ফ্রম লার্নার এবং অন দ্য জব ট্রেনিং পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন।
কলেজ শিক্ষা: ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি
কলেজজীবন শিক্ষার্থীদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এ সময় তারা জীবন সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান বুঝতে চেষ্টা করে, ভবিষ্যতের লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং বাস্তব দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা যেমন আত্মনির্ভরশীল হতে শেখে, তেমনি সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক সময় বিপথগামী হয়।
একজন কলেজশিক্ষকের উচিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, তাদের মেন্টর হিসেবে গাইড করা এবং ক্যারিয়ারের জন্য বাস্তবমুখী দিকনির্দেশনা দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে আমাদের কলেজশিক্ষকদের কি সেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে?
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা: শেষ প্যাকেজিং ও বাস্তব জীবনের প্রস্তুতি
বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষার চূড়ান্ত স্তর, যেখানে একজন শিক্ষার্থীকে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
এ পর্যায়ে শিক্ষকদের ভূমিকা শুধু পাঠদান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা শেখানো, তাদের গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শুধু একাডেমিক শিক্ষায় দক্ষ হলেই হবে না, বরং তাঁদের লিডারশিপ, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ বিষয়ে দক্ষ হতে হবে।
বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা
আমাদের শিক্ষকদের দক্ষতার উন্নয়নে বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
এ বিশ্ববিদ্যালয় হবে শিক্ষকদের জন্য গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের কেন্দ্র।
এখানে শিক্ষকেরা শিখবেন—
কীভাবে তাঁরা শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষে উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রয়োগ করবেন
কীভাবে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও ইতিবাচক শেখার পরিবেশ তৈরি করবেন
কীভাবে শিক্ষার মাধ্যমে নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং বাস্তবজীবনের দক্ষতা গড়ে তুলবেন
শিক্ষকদের জন্য যদি যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা না হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষিত হবে, কিন্তু প্রকৃত দক্ষ নাগরিক হয়ে উঠবে না।
সময়ের দাবি: শিক্ষকদের মানোন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে এখনই
একজন দক্ষ শিক্ষক মানেই একটি দক্ষ জাতি এবং দক্ষ জাতিই একটি উন্নত দেশের মূল চালিকা শক্তি। তাই এখনই সময় শিক্ষকদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া। এই বিশ্ববিদ্যালয় হবে শিক্ষকদের দক্ষতার কেন্দ্র, শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণের মডেল এবং একটি উন্নত জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া সুশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আর সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নত জাতি গঠনও সম্ভব নয়। শিক্ষকদের হাতে যদি যথাযথ দক্ষতা ও জ্ঞান তুলে দেওয়া যায়, তাহলেই তাঁরা হবেন প্রকৃত অর্থে সুশিক্ষার কারিগর।
লেখা: রহমান মৃধা, লেখক