ফটিকের মামী
আগামীকাল ঈদ। রাত বেশ হয়েছে। শেষবারের মতো দিয়া চারপাশে চোখ বুলিয়ে সব ঠিকঠাক কি না, দেখে নিল। এবারের ঈদে ধীরস্থিরভাবে সব গুছিয়ে করার চেষ্টা করছে। গত বছর ঈদে ওদের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছিল। এবার তেমন কিছু ঘটেনি; বরং ওদের আচমকা কিছু প্রাপ্তিও হয়েছে। বলা যায়, অলৌকিক উপায়ে সেই প্রাপ্তি।
গত বছরে কোরবানি ঈদের আগে দুই সপ্তাহের জন্য বেড়াতে এসেছিলেন দিয়ার মামিশাশুড়ি। ঈদের আগের দিন ঘটল দুর্ঘটনা। কিরণের মামি আর দিয়ার মামিশাশুড়ি হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে বা যাকে ইংরেজিতে বলে হার্ট ফেল করে মারা গেলেন। রবীন্দ্রনাথের ফটিক যেমন মামির কাছে উটকো এক ঝামেলা ছিলেন, তেমনি ভাগনে বউ দিয়ার কাছে শুরুতে এই মামি ছিলেন অনাকাঙ্ক্ষিত, অনাহূত। তবে ভাগনে কিরনের কারণে তার বউ দিয়ার এই মনোভাবের বাহ্যিক প্রকাশ ঘটেনি। যদি দিয়া তেমন কিছু করত তবে আজ খারাপ লাগত খুব।
মামিকে ফটিকের মামি বলার চিন্তা দিয়ার মাথা থেকে আসেনি। মামি এসে পৌঁছানোর আগেই এক বান্ধবী যখন দিয়ার কাছে মামি সম্বন্ধে তার কষ্ট ও বিরক্তির কারণগুলো শুনছিল, তখন সে বলেছিল—
‘বাহ্ ইনি দেখছি রবীন্দ্রনাথের “ছুটি” গল্পের ফটিকের মামি!’
‘জানিস মামি বিষয়ে কিরন তেমন কিছু বলেনি কোনো দিন। তবে আমি যখন জানলাম কিরন স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে গিয়েও মামার কাছে দু–এক দিনের থাকার জায়গা পায়নি তাতেই মনে হয়েছে মহিলা জাঁদরেল আর আত্মকেন্দ্রিক। জানিস ওর ছাত্রজীবনের প্রথম দিকে কষ্টের কথা শুনলে খুব খারাপ লাগে।’
যে মামির কাছ থেকে স্নেহ বা সহানুভূতি তেমন কিছুই পায়নি কিরন তারপরও সেই মামিরই আগমনে সাধ্যানুযায়ী আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখল না। মামা অবশ্য ফোন করে খোঁজখবর রাখতেন ওদের। মামা মারা যাওয়ার পর সেটুকুও বন্ধ হয়ে গেল। তিন বছর পর মামির ফোন এল। প্রথমবার মামির ফোন। কিরনদের দেখতে অস্ট্রেলিয়া আসতে চান। দিন পনেরো ওদের সঙ্গে থেকে জাপান ঘুরে বাংলাদেশে যাবেন।
‘মামি ছিল তখন আমেরিকাতে! তারপরও প্রথম গিয়ে দুই দিনের জন্যও মামার বাসায় জায়গা হয়নি?’
কিরন ঠান্ডা গলায় বলেছিল—
‘দেখ যে ব্যবহারে আমি কষ্ট পেয়েছি সে রকম ব্যবহার আমি কারও সঙ্গে কখনো করতে চাই না। আশা করি তুমিও মামির সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করবে দিয়া।’ কিরনের কথায় দিয়া সতর্ক হলো।
মামি এলেন। গাম্ভীর্য ও আভিজাত্যের মিশেলে এক মহিলা। দিয়া বিছানার জন্য নতুন চাদর-বালিশ কিনল। বাথ টাওয়েল, হ্যান্ড টাওয়েল, ফেস টাওয়েল তো কিনলই আরও বাথরুম চপ্পল, কার্পেট চপ্পলও কিনতে ভুলল না।
সবকিছুই কিরনের মামি খেয়াল করলেন। খুব স্বস্তির সঙ্গে কার্পেট চপ্পল পা দিয়ে বললেন, ‘কিরন তোমার বউ খুব কেয়ারিং পারসন দেখছি!’
কথাটা আরামদায়ক চপ্পলের জন্য নাকি দিয়া যে ওনাকে আয়েশ করে বসার জন্য কাউচ পিল এগিয়ে দিল তার জন্য বোঝা গেল না।
লম্বা দোহারা গড়নের ফরসা গায়ের রং মামির কান পর্যন্ত ছোট চুল। চশমার কারণে তার চোখে কী বোধ খেলা করছে বোঝা যায় না। বিস্ময় না নির্লিপ্তি, আন্তরিকতা না উদাসীনতা ধরা যায় না।
খাওয়াদাওয়ার পর মিন্ট টি খেতে খেতে এক ব্যাগভর্তি নানা গিফট কিরনের ছেলে অয়নকে দিলেন। হাতব্যাগ খুলে ছোট্ট একটি বাক্স কিরনকে দিলেন। তারপর নিজের আঙুল থেকে বড় পাথর বসানো আংটি খুলে দিয়াকে দিয়ে বললেন:
‘আংটি বেশ পুরোনো তবে তোমার জন্যই এটা শুভ হবে।’
একটু থেমে বললেন:
‘বহু বছর আগে এক জিপসি মহিলার কাছ থেকে কিনেছিলাম। ওই মহিলা বলেছিল যাকে প্রথম দেখাতে আমার ভালো লেগে যাবে, তাকে যদি আংটিটা দিই তবেই ম্যাজিক ঘটবে, দেখ কী ম্যাজিক ঘটে। তবে তোমার জন্য অন্য গিফটও আছে, লাগেজে।’
পুরোনো জিনিসে অনীহা থাকলেও আংটিটা আঙুলে দিয়ে দিয়া যেই মামির পা ছুঁয়ে সালাম করতে গেল অমনি সবাইকে বিস্মিত করে মামি গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে দিয়াকে চট করে তুলে ধরে ওর কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালেন।
এদিকে কিরন ছোট্ট বাক্সের ঢাকনা খুলে বিস্ময় নিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে মামির দিকে তাকিয়ে বলল:
‘ওমা! মামি আপনি কী করে আমার মনের ইচ্ছা টের পেলেন, আমারও এক সময়ে এটা কেনার ইচ্ছা হয়েছিল কিন্তু সে সময়ে…’
‘দেখি দেখি কী।’
বলে দিয়া সাগ্রহে তাকাল। মামিই উত্তরটা দিলেন।
‘কিরনের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটির লোগো বসানো আংটি।’
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আজমেরী ওয়াহেদ কিরন-দিয়ার ছিমছাম সংসারে স্বস্তি ও শান্তি খুঁজে পেলেন যেন। ওদের ছেলে ছয় বছরের অয়ন একই সঙ্গে ফট ফট করে বাংলা ইংরেজি দুটি ভাষাই বলে দেখে অবাক উনি। নিজের বাচ্চাদের বাংলা শেখানো হয়নি। ওদের নিয়ে স্বামীর কাছে আমেরিকা পৌঁছেছিলেন। নিজেও তত ভালো ইংরেজি তখন জানতেন না বলে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছিল। বিদেশিরা নয়, চোস্ত ইংরেজি বলা বাঙালিদের কত টীকাটিপ্পনী শুনেছেন। দিয়ার মতো বিদ্যাশিক্ষা, সংস্কৃতি সচেতনতা ছিল না বলে শক্ত হাতে বাচ্চাদের দুই ভাষা ও দুই সংস্কৃতি বিষয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে তুলতে পারেননি। বরং বাচ্চাদের সঙ্গে বলে বলে নিজের ইংরেজি বলাটা পোক্ত করতে সচেষ্ট ছিলেন। যাঁরা একসময়ে তাঁর ইংরেজি বলার খুঁত ধরত, উনিও পরে সুযোগ পেলে তাঁদের নাস্তানাবুদ করতে ছাড়েননি। তাঁর নীতি ছিল কেউ ইট মারলে তাকে পাটকেল ছুড়তে হবে। স্বামী তাঁর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। অর্থবিত্ত ভালোই ছিল তাঁদের। তাঁর বাচ্চাদের নামীদামি স্কুলে পড়িয়েছেন। নিজেও কলেজে ভর্তি হয়ে কিছু বিদ্যা অর্জন করতে চেষ্টা করেছেন। নিজের বাচ্চাদের বাংলা ভাষা, বাঙালিয়ানা থেকে দশ হাত দূরে রেখেছেন। তার সন্তান দুজনই সফল পেশায় আছে। সমাজ ও ব্যক্তিজীবনেও তাঁরা ভালো আছেন। তবে ওদের সমাজ কোন সমাজ, তা এখনো বুঝে উঠতে পারেননি আজমেরী। ছেলের বউ তুরস্কের আর মেয়ের জামাই পোল্যান্ডের। আজমেরী নিজেই ওদের জীবনে বেমানান এখন।
কিরনকে ছাত্রজীবনে নিজের বাড়িতে মাঝেমধ্যে খাওয়ানো ছাড়া থাকতে বলেননি কখনো। ওকে উটকো এক ঝামেলা মনে হতো তাঁর। কিরন মেধার গুণে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে এসেছিল তাদের শহরে। আর্থিক সাহায্য ওর দরকার ছিল না। তবে মামির কাছে স্নেহ মমতা পাওয়ার আকঙ্ক্ষা হয়তো ছিল। আজ এত বছর মনে হলো ক্ষেতমার্কা মনে করে দূরে সরিয়ে না রেখে কিরনকে কাছে টানলেই ভালো হতো।
কিরন পাণ্ডিত্য দেখায়নি বা চালিয়াতি করেনি কোনো দিন। সহজ সাবলীল ছিল চলনে–বলনে। একবার তার ছেলে সেজান ওকে বলেছিল:
‘Why do you speak bangla with mom? She can speak English.’
কিরন উত্তর দিয়েছিল:
‘I am not like you, I can handle both language too.’
আজমেরীর পয়সা ছিল তাই একেক সময়ে একেক ধরনের গ্লাসে জুস পরিবেশন করতেন। কে একজন তাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছিল এত ধরনের গ্লাস ব্যবহার নিয়ে। শুনে শ্লেষ ঢেলে আজমেরী বলেছিলেন, ‘পয়সা থাকলে তো জুস দেওয়ার জন্য নানা ধরনের গ্লাস কিনবে আর জুস দেবে’। পরে ওনার দেখাদেখি কেউ কেউ শ্যাম্পেন ও ওয়াইনের গ্লাসে জস বা শরবত পরিবেশন করত। কারও বাড়িতে এটা দেখে কিরন আস্তে নিচু গলায় বলেছিল:
‘শ্যাম্পেনের গ্লাসে জুস, শরবত মানায় না।’
কিরন যে টিটকারী মারেনি সত্যি কথা বলেছে, তা উনি বুঝেছিলেন। সহজ কথা সরলভাবে বলত ছেলেটা। কোনো একদিন তার বাড়িতে সালাদ খেয়ে বলেছিল
‘মামি আপনার রাশান সালাড খুব মজা হয়েছে! কোথায় শিখলেন এটা?’
‘এক রাশান মহিলার কাছে।’
‘Very good learner আপনি।’
আজমেরী কিরনদের দেখতে আসবেন ভাবেননি। আজ ওদের দেখে মনে হচ্ছে তার নিজের বাচ্চাদের জিদের বশে বাংলা ভাষাটা না শিখিয়ে, নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় না করিয়ে ঠিক করেননি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবেন এখন আর তা শুধরানোর কোনো উপায় নেই। রাতে শুতে এসে দিয়া আংটিটা নিতান্ত অবহেলায় অর্নামেন্ট বক্সে ছুড়ে দিল। কিরন নিজের আংটিটা নেড়েচেড়ে দেখছিল। তা দেখে দিয়া বলল, ‘আংটি এতই পছন্দ হয়েছে!’
‘শোন আমার গ্র্যাজুয়েশন নাইটে মামি যাননি, মামা গিয়েছিলেন। আমি যখন ওইখানে আগ্রহ নিয়ে আংটিটা দেখছিলাম মামা আমাকে ওটা কিনে দিতে চাইলেও আমি রাজি হইনি। আর আজ আচমকা আংটিটা পেয়ে গেলাম তা–ও মামির কাছ থেকে!’
কিরন বলল:
‘মনে হয় মামি অয়নের মুখে বাংলা, ইংরেজি দুটি ভাষা শুনে অবাক হয়েছেন কিছুটা।’
দিয়া জানতে চাইল:
‘আচ্ছা, মামি কেন নিজের বাচ্চাদের নিজের ভাষা শেখানো বা বলানো বাদ দিয়েছিলেন?’
কিরন বলে গেল সে কাহিনি। ঘটনা হলো আজমেরী ওয়াহেদ আমেরিকা পৌঁছেই বাচ্চা দুজনকে চাইল্ড কেয়ার সেন্টারে দিয়ে নিজেও কনভারসেশনাল ইংরেজি শিখতে কোথায় যেন ভর্তি হয়েছিলেন। চারের নিচে বয়স তার দুই বাচ্চা বাংলাও গুছিয়ে বলতে শেখেনি। ওই সেন্টারে একজন বাংলাদেশি মহিলাও কাজ করতেন। আজমেরী ভেবেছিলেন দেশি যেহেতু তার বাচ্চারা তার কাছে আদর পাবে। ওমা দেখা গেল ঘটনা উল্টো। সে মহিলা বাঙালি কমিউনিটিতে বলে বেড়াচ্ছেন ‘বাচ্চাগুলো ইংরেজি জানে না পানি পানি বলে কাঁদছিল কেয়ারার তো বুঝেনি। ডাক্তার সাহেবের উচিত ছিল বউ–বাচ্চাকে ইংরেজি শিখিয়ে এ দেশে আনা।’
এসব নানা মন্তব্য শুনে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে আজমেরী বাচ্চাদের সঙ্গে সময় দিতে মনস্থির করলেন। বইপত্র ঘেঁটে, খেলনাপাতি দিয়ে খেলে, টিভি, কার্টুন ব্যবহার করে বাচ্চাদের ইংরেজি শেখানোর পাশাপাশি নিজেও খুব তাড়াতাড়ি ভাষাটা রপ্ত করলেন। নিজের বাচ্চাদের সঙ্গেও বাংলা আর বলতেন না। ওই বাঙালি কেয়ারারের ওপর রাগ তার যায়নি। অনেক দিন পর কোনো এক জায়গায় ওই মহিলার দেখা পেতেই খুব অবজ্ঞা নিয়ে বললেন:
‘ওমা আপনি এখনো বাচ্চা রাখার কাজই করেন!’
কিরনের মুখে সব শুনে দিয়া বলল:
‘তাতে কী হয়েছে বল তো? বাচ্চা দেখার কাজকে তোমার মামি এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেন কেন?’
‘একসময়ে ওই মহিলা মামির বাচ্চারা ইংরেজি জানত না বলে হেয় করেছিল; মামিও তাকে হেয় করতে ছাড়লেন না।’
‘তারপরও বিষয়টা শোভন নয় কিরন।’
এ ঘটনা শুনে দিয়া মামির ওপর খুশি হতে পারল না।
মামির বয়স হলেও বেশ শক্ত এবং চটপটে। দিয়া প্রথম যেদিন মামিকে একা বাসায় রেখে কাজে গেল ফিরে এসে অবাক!
খাবার টেবিল সাজানো–গোছানো। তিন রকমের স্যান্ডউইচ, সালাদ। ডেজার্ট হিসেবে ফল, আইসক্রিমও রেখেছেন। গাজর-স্প্রিং অনিয়ন স্যান্ডউইচ, সস, অ্যাভোকাডো স্যান্ডউইচ, অ্যাভোকাডো-চিকেন-টমেটো স্যান্ডউইচ।
খাবারগুলো অন্য রকম তবে খুব সুস্বাদু লাগল খেতে। সালাদ দেখে কিরন খুব খুশি। বলল:
‘দিয়া এটা মামির রাশান সালাদ, মামির কাছ থেকে শিখে রেখো।’
আজমেরী বললেন:
‘রাশান সালাদের কথা মনে রেখেছ কিরন! এখনো তোমার খেতে ভালো লাগছে, দিয়াকে রেসিপি দিয়ে যাব।’
দিয়া শান্ত গলায় বলল।
‘মেয়োনেজ দিয়েছেন তবু মিষ্টি লাগছে না।’
‘রাশান সালাদে ক্রাফটের মেয়োনেজ দিলে ঠিক স্বাদ আসে না। আমেরিকান SW নামের মেয়োনেজ ও অন্য আরেকটা মেয়োনেজ তাতে সুগার নেই।’
মামি সস্নেহে দিয়াকে বললেন:
‘দেখে বলত এই সালাদে কটা জিনিস আছে?’
দিয়ার মনে হলো মামি যেন এখন আদরকাড়া মামি হয়ে উঠেছেন। ও উৎসাহ নিয়ে দেখতে দেখতে বলল:
‘আলু, মাংস, ডিম সেদ্ধ, মটরশুঁটি, পেঁয়াজপাতা, সামান্য গাজরকুচি আর এটা কি মামি স্বচ্ছ সবুজ টক নুনতা?’
‘গেরকিন।’
‘ওহ্ তাই তো ম্যাগডোনালের বার্গারেও দেয় এটা।’
‘দেখ দিয়া মামি সব জিনিস কি সুন্দর কিউব কিউব করে কেটেছেন!’
‘আর গাজর ও সবুজ পেঁয়াজপাতা কুচি করে দেওয়াতে দেখতেও ভালো লাগছে।’
‘এই কোল্ড সালাদ বানিয়ে ফ্রিজ রাখতে পার গরমে খেতে পারবে।’
দিয়া ভেবেছিল রেসিপি পেলে ঈদে বানাবে। মেহমানরা মজা করে খাবে। রেসিপি পাওয়ার আগেই মামি হঠাৎ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। ওনার সন্তানেরা এত কম সময়ের মাঝে কেউ আসতে পারল না।
কিরনই সব বন্দোবস্ত করে মামির শেষ কাজ করল। মৃতদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হলো।
সুস্থ সবল মহিলার হঠাৎ মৃত্যু ও তার সন্তানদের উদাসীন, আন্তরিকতাশূন্য আচরণ নরম স্বভাবের দিয়াকে শুধু ব্যথিত নয় ক্ষুব্ধ করেছিল।
পরে এক সময়ে মামির জিনিসপত্র গুছিয়ে ওনার মেয়ের কাছে পাঠাতে গিয়ে তার হ্যান্ডব্যাগে রাশান সালাদের রেসিপি লেখা কাগজটা পেল। দিয়া কাগজটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে কিছু সময় বসে রইল। কাগজটা মেলে ধরে দেখল মেয়োনেজ লিখে ব্র্যাকেট দিয়ে লিখেছেন আমেরিকান sw বা হল্যান্ডের রিয়েল মেয়োনেজ ব্যবহার করতে হবে।
দিয়া একদিন নিজেদের জন্য রেসিপি দেখে স্যালাড বানাল। খেতে খেতে কিরন বলল:
‘জান আমার মামির বিষয়ে কী মনে হয়।’
‘কী মনে হয়?’
‘মামি এমন কড়া মেজাজ ও নাক উঁচু ভাব নিয়ে চলার পেছনে কারণ হচ্ছে একসময়ে কিছু মানুষ তাকে অবজ্ঞা, অবহেলা করেছে, ইনফিরিওর ভাবত তাই পরে মামিও সুযোগ পেয়ে সে অবহেলা অপমানের বদলা নিয়েছে, নিজের সুপিরিওরিটি ফলাতে পিছপা হননি। অর্থবিত্ত ছিল মানুষ তোষামোদ করত মামিকে।’
‘আমার সঙ্গে মামি ভালো ব্যবহার করছেন অবশ্য।’
‘কারণ তুমি ওনাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখিয়েছ তাই তুমিও তাঁর কাছ থেকে স্নেহ ও সম্মান পেয়েছ। মামি হচ্ছেন সে ধরনের, যারা যেমন কুকুর তেমন মুগুর দেওয়া নীতিতে বিশ্বাসী।’
আবারও মামির প্রসঙ্গ তাদের মাঝে ফিরে এল। এবার তারা এত আনন্দিত হলো যে মনে হলো কী এক ম্যাজিক মামি রেখে গেছেন তাদের জন্য। ব্যাপারটা জানল তখন যখন ইনস্যুরেন্স করানোর জন্য সব গয়নাগাটি নিয়ে একদিন ভ্যালুয়ারের কাছে গিয়েছিল। গয়নার পুঁটলিতে মামির দেওয়া আংটিটিও ছিল। দিয়া ওই আংটিটাও ভ্যালুয়ারকে দিয়েছিল যাচাই করতে।
ভ্যালুয়ার আংটির সম্ভাব্য যে দাম বলল তাতে বিস্ময়ে ওরা কথা হারিয়ে দুজনে চোখ চাওয়াচাওয়ি করল শুধু। ভ্যালুয়ার বলল:
‘গিফট হিসেবে পেয়েছ বোধ হয় দাম জানো না তাই না? অকশন হাউসে দিয়ে দেখতে পার কত দাম ওঠে।’
ওরা সত্যি অকশন হাউসে আংটি দিল। রুদ্ধশ্বাসে অকশন দেখছিল। যখন আংটির দাম কেউ একজন নব্বই হাজার দিতে চাইল তখনো অকশিনিয়ার থামল না। কিরন আর দিয়ার বিস্ময়ে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার অবস্থা প্রায়। দাম আরও উঠল। শেষ পর্যন্ত এক শ চল্লিশ হাজারে//////////////////////////// আংটিটা অকশনে বিক্রি হলো।
জানা হয়নি মামি কত দিয়ে আংটিটা জিপসি মহিলার কাছ থেকে কিনেছিলেন? জিপসি মহিলাই–বা কেন এমন কথা বলেছিল। মামিরই–বা কেন দিয়াকে প্রথম দেখাতে ভালো লেগে গেল?
পৃথিবীতে কখনোবা কিছু কিছু ঘটনা ঘটে, যার কোনো ব্যাখ্যা কেউই জানে না।