জাপানে প্রবাসজীবনে পয়লা বৈশাখ—স্মৃতি, শিকড় আর নতুন আশার গল্প

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ইওয়াতে, জাপানে বসবাসকারী বাংলাদেশি ভাইবোনেরা। দূরপ্রবাসের ব্যস্ত জীবন, ক্লান্তিকর কর্মঘণ্টা আর নীরব একাকিত্বের মাঝেও তাঁরা সবাই একত্র হন এক টুকরো দেশের টানে। যেন সেই মুহূর্তে জাপানের কোনো প্রান্ত নয়, বরং হৃদয়ের গভীরে জেগে ওঠে বাংলাদেশ—প্রিয় জন্মভূমির উষ্ণতা, ভালোবাসা আর আপনজনের স্নেহভরা এক অনুভবছবি: লেখকের পাঠানো

১ বৈশাখ—এই দিনটি যেন শুধু বর্ষপঞ্জির একটি তারিখ নয়, বরং বাঙালির আত্মার এক গভীর স্পন্দন, এক নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রতিশ্রুতি। পুরোনো বছরের সব ব্যর্থতা, না–পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, জমে থাকা কষ্ট আর অব্যক্ত বেদনার ভার আমরা যেন এই দিনের প্রভাতের আলোয় ধুয়ে ফেলতে চাই। ভোরের প্রথম সূর্যের কিরণ যখন নতুন বছরের বার্তা নিয়ে আসে, তখন মনে হয়—জীবন আবার নতুন করে শুরু করার সুযোগ পেলাম, যেন সব ভুল শুধরে আবার পথচলা শুরু করা যায়।

বাংলা নববর্ষ—সব জরাজীর্ণতাকে পেছনে ফেলে, কবিগুরুর সেই অমর গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গেয়ে, নতুন উদ্যমে ভালো কিছু করার প্রত্যয় হৃদয়ে ধারন করে, নতুন প্রত্যাশায় এবং প্রার্থনায় নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর দিন। এই দিনে ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক হয়ে যায় এক অদ্ভুত আনন্দের বন্ধনে। এটি যেন বাঙালির মহামিলনের দিন। চারদিকে লাল-সাদা পোশাকের রঙিন ছটা, মুখে হাসি, হৃদয়ে আনন্দ—সব মিলিয়ে এক অবর্ণনীয় উৎসবের আবহ তৈরি হয়। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই মেলার কোলাহল, পান্তা-ইলিশের ঘ্রাণ, আর লোকসংগীতের সুর যেন জীবনের প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে পড়ে। ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে—নতুন জামার গন্ধ, মায়ের হাতের রান্না, পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় মুহূর্ত—সবকিছু যেন আজও হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে আছে। সেই স্মৃতিগুলোই আজ প্রবাসজীবনের একাকিত্বে নীরব সঙ্গী হয়ে থাকে, মাঝেমধ্যে চোখের কোণে জল এনে দেয় অজান্তেই।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

কিন্তু প্রবাসজীবনের বাস্তবতা অনেক সময় এই আনন্দকে দূর থেকে দেখার মতো করে তোলে। যখন দেশের বাইরে, এক অপরিচিত পরিবেশে দাঁড়িয়ে এই দিনটি আসে, তখন বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভূত হয়। নেই সেই চেনা কোলাহল, নেই প্রিয়জনদের উষ্ণতা, নেই মাটির গন্ধ। চারপাশে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও কোথাও যেন একটা অপূর্ণতা থেকে যায়। তবু মন মানে না—সে বারবার ছুটে যায় সেই প্রিয় দেশের দিকে, যেখানে প্রতিটি বৈশাখ ছিল আনন্দ আর ভালোবাসায় ভরপুর।

এমন সময় জাপানের মাটিতে, ইওয়াতে বাংলাদেশ এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ১৮ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যায় ইওয়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের ছাত্রাবাসের কমন রুমে আয়োজিত বৈশাখী অনুষ্ঠান যেন এক টুকরো স্বদেশ হয়ে উঠেছিল। সেই মুহূর্তগুলোতে মনে হচ্ছিল, আমরা আর প্রবাসে নেই—আমরা যেন ফিরে গেছি আমাদের চেনা বাংলাদেশে। সবার আন্তরিকতা, একসঙ্গে থাকার আনন্দ, আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এই অনুষ্ঠানটিকে করে তুলেছিল ভীষণ প্রাণবন্ত ও আবেগময়। অপরিচিত মানুষগুলোও যেন হয়ে উঠেছিল খুব কাছের, খুব আপন।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী দুই খুদে গর্বিত বাংলাদেশি, সুসুমু চান ও মাহ্দী কুন (জাপানিজরা মেয়ে বাচ্চাদের আদর করে চান ও ছেলে বাচ্চাদের কুন ডাকে)। তাদের নিষ্পাপ হাসি কৌতূহলী চোখ আর উচ্ছল উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। যেন তাদের মধ্যেই নতুন প্রজন্মের বাঙালিয়ানা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে—দূরপ্রবাসেও শিকড়ের সঙ্গে এক নীরব বন্ধন গড়ে উঠছে
ছবি: লেখকের পাঠানো

খাবারের টেবিলে পান্তা–ইলিশের সেই চেনা স্বাদ শুধু জিবেই নয়, ছুঁয়ে গিয়েছিল হৃদয়ের গভীরতাকেও। বেগুনভর্তা, আলুভর্তা, শুঁটকিভর্তা, বাদামভর্তা, মাছভর্তা, ডাল—প্রতিটি খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শিকড়ের টান, মায়ার স্পর্শ, আর হাজারো স্মৃতির গন্ধ। প্রতিটি কণা যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল—আমরা যত দূরেই যাই না কেন, আমাদের শিকড় সব সময় একই জায়গায় থেকে যায়।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতিটি পরিবেশনা যেন ছিল হৃদয়ের একেকটি প্রকাশ। গান, আবৃত্তি, নৃত্য—সবকিছুতেই মিশে ছিল দেশের প্রতি ভালোবাসা আর না-পাওয়ার এক মৃদু বেদনা। যখন সবাই একসঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইল, তখন মনে হচ্ছিল এই দূরদেশেও আমরা একসঙ্গে, এক হৃদয়ে বাঁধা, এক পরিচয়ে গর্বিত—আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশ।

খাবার এখানে শুধু আহার ছিল না—ছিল স্মৃতি, শিকড় আর আবেগের এক গভীর প্রকাশ। ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পদে সাজানো ভোজ যেন মুহূর্তেই সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় দেশের মাটিতে। প্রতিটি স্বাদে লুকিয়ে ছিল মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ, শৈশবের উৎসবের উচ্ছ্বাস আর ফেলে আসা দিনের নীরব ভালোবাসা। এই আয়োজনটি তাই শুধুই একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না; ছিল প্রবাসে দাঁড়িয়ে নিজের শিকড়কে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার এক পূর্ণ অনুভব
ছবি: লেখকের পাঠানো

পয়লা বৈশাখ আমাদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালায়, নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। কিন্তু জীবনের পথ সবার জন্য সমান নয়। অনেকেই আছে, যারা ব্যর্থতা আর কষ্টের ভারে পথ হারিয়ে ফেলে। এই নতুন বছর যেন তাদের জীবনেও একটুখানি আলো, একটুখানি শান্তি আর নতুন করে শুরু করার সাহস এনে দেয়—এই প্রার্থনাই করি অন্তরের গভীর থেকে।

নতুন বছরের এই শুভক্ষণে সবার জীবনে আসুক অশেষ আনন্দ, ভালোবাসা আর শান্তি। হাসিতে ভরে উঠুক প্রতিটি দিন, পূর্ণ হোক সকল স্বপ্ন। ভালো থেকো প্রিয় বাংলাদেশ—ভালোবাসি তোমাকে, তোমার মাটি, তোমার মানুষ, তোমার প্রতিটি অনুভূতিকে। দূরপ্রবাসে থেকেও হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে তুমি রয়ে যাও চিরদিন।

লেখক: ড. সঞ্জয় সরকার, অধ্যাপক, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে প্রাণী গবেষণা সেন্টার, ইওয়াতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানে কর্মরত