৩২ বছরের সংসার, ভালোবাসার চেয়েও বেশি কিছু
হঠাৎ এক প্রশ্ন: ৩২ বছরের বেশি সময় একই নারীর সঙ্গে সংসার করার রহস্য কী?
প্রথম দিন সে ঠিক।
দ্বিতীয় দিনও সে ঠিক।
আর তৃতীয় দিন…ভুলটা আমার!
অবশ্যই, এটা নিছকই একটি রসিকতা। আমার নিজের ৩২ বছরের বেশি সময়ের দাম্পত্য জীবনের পুরো চিত্র নিশ্চয়ই এমন নয়। তবে এত দীর্ঘ সময় একসঙ্গে পথ চলার পর একটা কথা শিখেছি, শুধু ভালোবাসা দিয়ে এতটা পথ পাড়ি দেওয়া যায় না। এর পেছনে নিশ্চয়ই আরও কিছু থাকে।
আমি একজন দূর প্রবাসী। বহু বছর ধরে নিজের জন্মভূমি থেকে দূরে, অন্য একটি দেশে বসবাস করছি। আর দূর প্রবাসে দীর্ঘদিন বসবাস করতে করতে হয়তো একটি বিষয় অন্য অনেকের চেয়ে একটু বেশি বুঝেছি, একজন মানুষ বহু বছর একটি দেশে বসবাস করলেও কোনো না কোনো অর্থে সে তার নিজের সংস্কৃতি, অভ্যাস ও পরিচয়ের কিছু অংশ সঙ্গে নিয়েই বেঁচে থাকে।
ভাষা, সংস্কৃতি, পারিবারিক অভ্যাস, চিন্তার ধরন, জীবনযাপন, এমনকি ভালোবাসা প্রকাশের পদ্ধতিতেও পার্থক্য থাকতে পারে। তারপরও আমার সহধর্মিণী ও আমি ৩২ বছরের বেশি সময় ধরে একসঙ্গে পথ চলছি এবং সেই পথচলা এখনো চলছে। তবে পরিচয়ের শুরুতেই উভয় পক্ষের বাবা-মায়ের আশীর্বাদ ছিল, ছিল ভালোবাসার স্পর্শ এবং বিয়ে। কোনো এক মনীষীর কথা সেদিন মনে পড়েছিল, ‘বিয়ে করো, ভাগ্য ভালো হলে সুখী দাম্পত্য জীবন হবে, আর সেটা না হলে দার্শনিক হবে।’ তাই পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি শুধু ভালোবাসা নয়।
ছিল সহমর্মিতা। ছিল ধৈর্য। ছিল একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা। ছিল ভুলকে ক্ষমা করার মানসিকতা। ছিল একে অন্যের স্বাধীনতাকে সম্মান করার শিক্ষা। ছিল প্রয়োজনের সময় পাশে থাকার দায়িত্ববোধ। আর সবচেয়ে বড় কথা, ছিল একসঙ্গে থাকার ইচ্ছা।
ভালোবাসা হয়তো বিয়ের দরজা খুলে দেয়, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে ৩২ বছর পাশাপাশি হাঁটতে হলে ভালোবাসার সঙ্গে আরও অনেক কিছু দরকার।
আমার মনে হয় দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সুখের সময় নয়, কঠিন সময়। সুখের সময় সবাই ভালো থাকতে পারে। যখন দুজনের মত এক, অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো, সন্তানেরা ভালো আছে, শরীর-স্বাস্থ্য ভালো, ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় কোনো চিন্তা নেই, তখন একে অন্যকে ভালোবাসা খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু মতের অমিল হলে? অভিমান হলে? কেউ ভুল করলে? কেউ মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে? অর্থনৈতিক চাপ এলে? পরিবারে সমস্যা হলে? দুজনের জীবনদর্শন এক না হলে? সেখানেই আসল সম্পর্কের পরীক্ষা।
বিবাহ কোনো প্রতিযোগিতা নয়, যেখানে একজনকে জয়ী হতে হবে আর অন্যজনকে পরাজিত। বিবাহ হলো এমন একটি যাত্রা, যেখানে দুজন মানুষ একই নৌকায় বসে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করে। একজন যদি প্রতিদিন প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকে যে সে-ই সঠিক, তাহলে নৌকাটি হয়তো একদিন ঠিকই ডুবে যাবে।
তাই কখনো কখনো শান্তির জন্য নিজের অহংকারকে একটু পাশে রাখতে হয়। কখনো বলতে হয়, ‘ঠিক আছে, তুমি ঠিক।’ আবার কখনো বলতে হয়, ‘আমি ভুল করেছি।’ আর কখনো হয়তো দুজনকেই বলতে হয়, ‘আমরা দুজনেই একটু ভুল করেছি।’ এই জায়গাটিই আমার কাছে ভালোবাসার পরিণত রূপ।
কারণ, ভালোবাসা শুধু একে অন্যের প্রতি আকর্ষণ নয়। ভালোবাসা হলো একজন মানুষের দুর্বলতাকে দেখেও তাকে গ্রহণ করতে পারা। তার ভুলকে বুঝতে চেষ্টা করা। তার রাগের পেছনে থাকা কষ্টটুকু দেখতে পারা। তার নীরবতার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা।
আর সহমর্মিতা হলো, ‘তুমি আমার মতো কেন নও?’ এই প্রশ্ন না করে, ‘তুমি এমন কেন, সেটা কি আমি একটু বুঝতে পারি?’ এই প্রশ্ন করা।
আমার মনে হয়, পৃথিবীর বহু বিবাহ আজ এই জায়গাটিতেই সমস্যায় পড়ছে।
বিবাহবিচ্ছেদ কোনো ছোট বিষয় নয়। দুটি মানুষের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কই শেষ হয় না। অনেক সময় সন্তান, পরিবার, অর্থনীতি, মানসিক নিরাপত্তা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ জীবন, সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়ে। তাই বিবাহবিচ্ছেদকে কখনোই হালকাভাবে দেখা উচিত নয়।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
তবে এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো মূল্যে একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হবে। যেখানে নির্যাতন, সহিংসতা, গুরুতর প্রতারণা, নিরাপত্তাহীনতা বা মানুষের মর্যাদা ধ্বংস হওয়ার মতো পরিস্থিতি রয়েছে, সেখানে বিচ্ছেদ কখনো কখনো প্রয়োজনীয় এবং সঠিক সিদ্ধান্তও হতে পারে। সংসার টিকিয়ে রাখার নামে অন্যায় সহ্য করাকে আমি ভালোবাসা মনে করি না।
কিন্তু যে সম্পর্ক সামান্য ভুল–বোঝাবুঝি, অহংকার, রাগ, অভিমান, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক হস্তক্ষেপ বা ‘আমি কেন আগে ক্ষমা চাইব?’ ধরনের মানসিকতার কারণে ভেঙে যেতে পারে, সেখানে হয়তো একটু থামা দরকার। একটু কথা বলা দরকার। একটু শোনা দরকার। একটু সময় দেওয়া দরকার। আর কখনো কখনো শুধু একজনকে নয়, দুজনকেই বদলাতে হয়।
বাংলাদেশের মতো সমাজে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নারীর জন্য একটি বিবাহ ভেঙে যাওয়ার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে গভীর হতে পারে। আবার পুরুষের ওপরও এর মানসিক ও সামাজিক চাপ কম নয়। তাই বিবাহবিচ্ছেদকে শুধু ‘মেয়ের সমস্যা’ বা ‘ছেলের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে সমস্যাটিকে খুব ছোট করে দেখা হবে।
আমাদের বরং প্রশ্ন করা উচিত, কেন এত সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে? আমরা কি একে অন্যকে যথেষ্ট শুনছি? আমরা কি ভালোবাসাকে অধিকার হিসেবে ব্যবহার করছি? আমরা কি সঙ্গীর ব্যক্তিত্বকে সম্মান করছি? আমরা কি ভুল স্বীকার করতে পারছি? আমরা কি ক্ষমা করতে পারছি? আমরা কি রাগের মুহূর্তে এমন কথা বলে ফেলছি, যার ক্ষত অনেক বছর পরও শুকায় না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমরা কি মনে রাখছি যে একজন মানুষকে বিয়ে করা মানে শুধু তার ভালো দিকগুলোকে গ্রহণ করা নয়, তার অসম্পূর্ণতাগুলোকেও গ্রহণ করার প্রস্তুতি নেওয়া?
৩২ বছর একসঙ্গে থাকার পর আমি মনে করি, ভালোবাসা একটি সম্পর্ক শুরু করতে পারে, কিন্তু শুধু ভালোবাসা একটি সম্পর্ককে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখে না। তার সঙ্গে দরকার ধৈর্য। দরকার শ্রদ্ধা। দরকার সহমর্মিতা। দরকার ক্ষমা। দরকার যোগাযোগ। দরকার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সম্মান। দরকার একসঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ার মানসিকতা।
কারণ, মানুষ ২০ বছর বয়সে যেমন থাকে, ৪০ বছর বয়সে তেমন থাকে না। ৫০ বছর বয়সে আবার অন্য রকম হয়। জীবন, কাজ, সন্তান, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, পরিবার, সমাজ, সবকিছু মানুষকে পরিবর্তন করে।
তাই ৩০ বছরের পুরোনো সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে হলে ৩০ বছর আগের মানুষ দুজনকে ধরে রাখলে হবে না। দুজনকেই সময়ের সঙ্গে নতুন করে একে অন্যকে চিনতে শিখতে হয়।
আমার নিজের অভিজ্ঞতায় আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে, সেটি হলো সংস্কৃতির পার্থক্যকে শত্রু না বানিয়ে সম্পদ হিসেবে দেখা। আমি বিদেশি। আমার স্ত্রীও আমার মতো করে পৃথিবীকে দেখেন না। কিন্তু হয়তো সেই পার্থক্যই আমাদের একে অন্যের কাছ থেকে শিখতে সাহায্য করেছে।
দুজন মানুষ যদি সব বিষয়ে একই রকম হয়, তাহলে হয়তো মতবিরোধ কম হবে। কিন্তু দুজন ভিন্ন মানুষ একসঙ্গে থেকে যদি একে অন্যকে বুঝতে শেখে, তাহলে সম্পর্কটি আরও গভীর হতে পারে।
সংসারে তাই সব সময় একই মত থাকা জরুরি নয়। একই মানুষ হওয়া জরুরি নয়, একই সম্পর্কের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়াটাই জরুরি।
৩২ বছর পর আমি এটাও বুঝেছি, সংসারে ‘আমি’ শব্দটি যত বড় হয়, সম্পর্ক তত ছোট হতে থাকে। আর ‘আমরা’ যত বড় হয়, সম্পর্ক তত গভীর হয়।
তবে ‘আমরা’ মানে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা নয়। বরং দুজন স্বাধীন মানুষ নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও একটি যৌথ জীবন তৈরি করতে পারে।
হয়তো এটাই পরিণত ভালোবাসা।
আর সেই ভালোবাসার মধ্যে হাসিও থাকতে হয়। কারণ, সংসার যদি শুধু দায়িত্ব, হিসাব আর সমস্যা নিয়ে চলে, তাহলে জীবন খুব ভারী হয়ে যায়।
তাই মাঝে মাঝে বলতে হয়, ‘তুমি ঠিক।’ ‘হ্যাঁ, তুমিও ঠিক।’ ‘আচ্ছা, তাহলে আমি কোথায়?’ ‘তুমি? তুমি ভুল!’
৩২ বছর পর এই কথায় রাগ না করে যদি দুজন একসঙ্গে হাসতে পারেন, তাহলে হয়তো সেটিও একটি সাফল্য।
কারণ, দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের রহস্য কোনো জাদু নয়। এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত। রাগের সময় একটু চুপ থাকা। অন্যজনের কথা শেষ পর্যন্ত শোনা। ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া। অন্যজন ভুল করলে ক্ষমা করা। অভিমান হলে কথা বলা। কষ্ট হলে লুকিয়ে না রাখা। সঙ্গীর সাফল্যে আনন্দিত হওয়া। ব্যর্থতার সময় পাশে দাঁড়ানো। আর প্রতিদিন মনে রাখা, মানুষটি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আপনার সঙ্গী।
আমি জানি না আমাদের ৩২ বছরের সংসারকে অন্যদের জন্য কোনো আদর্শ বলা যায় কি না। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা আমাকে অন্তত একটি কথা শিখিয়েছে: দীর্ঘ বিবাহিত জীবন শুধু ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিন একটু ধৈর্য, একটু সহমর্মিতা, একটু ক্ষমা, একটু শ্রদ্ধা এবং অনেকটা মানবিকতা প্রয়োজন।
আর হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একে অন্যকে হারিয়ে ফেলার আগে একবার থেমে প্রশ্ন করা, ‘আমরা কি সত্যিই আলাদা হয়ে যেতে চাই, নাকি আমরা শুধু এই মুহূর্তের রাগটাকে সত্যি বলে মনে করছি?’
কারণ, রাগ চলে যায়। অভিমানও একদিন কমে যায়। কিন্তু কিছু সিদ্ধান্তের পর ফিরে আসার পথ আর থাকে না।
তাই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার অর্থ সব সময় একসঙ্গে থাকা নয়। বরং সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আগে যতটা সম্ভব বোঝার চেষ্টা করা, কথা বলা, ভুল স্বীকার করা এবং একে অন্যকে আরেকটি সুযোগ দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত ৩২ বছরের অভিজ্ঞতায় আমার কাছে বিবাহের সবচেয়ে বড় শিক্ষা খুব সাধারণ: ভালোবাসা মানুষকে কাছে আনে। সহমর্মিতা মানুষকে বুঝতে শেখায়। ধৈর্য মানুষকে একসঙ্গে রাখে। ক্ষমা সম্পর্ককে বাঁচায়। আর শ্রদ্ধা সেই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে।
হয়তো দীর্ঘ দাম্পত্যের আসল রহস্য কাউকে হারানো নয়, দুজনের একসঙ্গে হার না মানা।
আর যদি কখনো প্রশ্ন আসে, ‘৩২ বছর কীভাবে একই নারীর সঙ্গে কাটালেন?’ আমি হয়তো আবারও বলব, প্রথম দিন সে ঠিক ছিল। দ্বিতীয় দিনও সে ঠিক ছিল। তৃতীয় দিন আমি ভুল ছিলাম। তারপর ৩২ বছর কেটে গেল।
শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, হয়তো সংসারে সব সময় কে ঠিক আর কে ভুল, সেটিই আসল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো ৩২ বছর পরও আমরা কি একে অন্যের পাশে আছি?
আমার উত্তর, হ্যাঁ।
আর সেই ‘হ্যাঁ’-এর মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে ৩২ বছরের ভালোবাসার চেয়েও বড় সত্য।