দূরে থেকেও মা সব সময় কাছে

সিলেটের লালাখালে বাবা-মায়ের সঙ্গে আমি। ছবিটি সম্ভবত ২০১৩ সালে তোলা। ছোটবেলার কোনো ছবি নেই, তাই বড়বেলার ছবি

প্রথম আলোর নাগরিক সংবাদে ‘লেখা আহ্বান’ বিজ্ঞপ্তিটি চোখে পড়তেই মনের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করল। ভাবলাম, মাকে নিয়ে কিছু লিখি। কিন্তু মাকে নিয়ে লিখতে বসে বুজলাম, একজন মায়ের ভালোবাসা শব্দে প্রকাশ করা কত কঠিন। তবু চেষ্টা করছি আমার মনের কিছু অনুভূতি তুলে ধরতে।

অনেক খোঁজাখুঁজির পরও শুধু মায়ের সঙ্গে আমার কোনো ছবি খুঁজে পেলাম না, দলগত ছবি আছে। ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ খুব বেশি ছিল না। তখন তো আজকের মতো মুঠোফোন বা ক্যামেরার এত সহজ ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু ছবি কম থাকলেও মায়ের ভালোবাসার স্মৃতিগুলো আজও হৃদয়ে স্পষ্ট হয়ে আছে। তবে এবার দেশে ফিরেই সবার আগে মায়ের সঙ্গে একটা ছবি তুলব।

আমাকে নিয়ে মায়ের একটা স্মৃতির কথা বলি। আমি মায়ের কাছে শুনেছি, আমি আমাদের চার ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। আমি তখন খুব ছোট—১ কিংবা ২ বছর বয়স হবে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তখন দিদি আর আমি ছিলাম, ছোট বাকি দুজনের তখনো জন্ম হয়নি। দিদি আমার থেকে দুই বছরের বড়, তাই দিদিও তখন ছোট। মা আমাকে বিছানায় শুইয়ে রেখে রান্নাঘরে রান্না করছিলেন। দিদিকে আমার পাশে রেখে বলে গিয়েছিলেন, ‘মণি, মনাকে একটু দেখিস। আমাদের এলাকায় ছোট ছেলে মেয়েদের আদর করে মনা ও মণি বলে ডাকে। তখন আমার হালকা জ্বর ছিল, তাই মাথার পাশে একটা নাপা সিরাপ রাখা ছিল। মাঝেমধ্যে যখন আমি কান্না করছিলাম, তখন আমার কান্না থামানোর জন্য দিদি আমাকে নাপা সিরাপ খাইয়ে দিচ্ছিল। এভাবে পুরো এক বোতল সিরাপ আমাকে খাইয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর মা এসে দিদিকে বলল, ‘মণি, কিছু হইছে নাকি, মনার কোনো শব্দ নেই, শুধু ঘুমাচ্ছে?’ দিদি বলল, ‘মা, মনা খুব সুন্দর করে ওষুধ খাচ্ছিল, তাই আমি পুরোটা খাইয়ে দিয়েছি।’ এ কথা শুনে মা শুধু ঠাকুমাকে ডেকে বলল, মণিকে একটু দেখেন, আমি বাজারে যাচ্ছি। মা আমাকে কোলে নিয়ে এক দৌড়ে বাজারে আমাদের দোকানে নিয়ে এলেন। বাবা আমাকে দেখে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। ভাগ্য ভালো ছিল বলে সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলাম। এটা ১৯৮৩–৮৪ সালের কথা, তখন রাস্তাঘাট ভালো ছিল না, মোবাইল ছিল না। এখন এ রকম হলে হয়তো আরও দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব।

জাপানের হিরোশিমা পিস পার্কের এ-বোম্ব ডোমের সামনে। এটি ২০১৯ সালের ছবি।

মাকে নিয়ে আমার হাজারো স্মৃতি আছে। আমাদের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলায়। এখানের বাজারে বর্ষাকালে আগে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। আমাদের বাড়ি থেকে মেঘনা ১০-১২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় মেঘনায় জেলেদের জালে ধরা মাছে সয়লাব হয়ে যেত বাজার। তখন হাট ছিল সপ্তাহে দুই দিন—সোম ও শুক্রবার। বাজারে বর্ষাকালে প্রচুর ইলিশ মাছ উঠত বলে আমাদেরও এই দুই দিন ইলিশ মাছ কেনা হতো। বাবার আর আমার ইলিশ মাছ খুব পছন্দ ছিল বলে অন্তত বর্ষাকালে অন্য কোনো মাছ কেনা হতো না। সন্ধ্যায় বাবা বাজার করে আমাকে দিয়ে মাছের ব্যাগ বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। বাড়িতে এসে মাছ কাটা থেকে রান্না করা পর্যন্ত মায়ের পাশে বসে থাকতাম। মা মাছ কেটে, ধুয়ে, ভেজে দুই ভাগ করে এক ভাগ আমার সামনে একটা গামলায় রাখতেন। গামলা ভর্তি ইলিশ মাছ খেতাম পেট না ভরা পর্যন্ত। কত যে ইলিশ খেয়েছি এই জীবনে। আমার সেই ইলিশ খাওয়া দেখতে মায়েরও নাকি খুব ভালো লাগত। বাড়িতে এখনো ইলিশ মাছ আনলে মা ফোন দিয়ে বলে, ‘তুই বাড়ি থাকলে তো খেতে পারতি, কবে আসবি বাড়ি?’ আমার মায়ের ইলিশ মাছ খুব একটা পছন্দ নয়, কিন্তু খেতেন। এখন একদমই খান না। কারণ, আমি যে বিদেশে ইলিশ মাছ খেতে পারি না তাই। সেই গামলা এখনো মা রেখে দিয়েছেন, এখন মাঝেমধ্যেই খুব ইচ্ছা করে দেশে গিয়ে মায়ের হাতে ভাজা ইলিশ মাছ সেই গামলায় আবার খাই। কত দিন যে ইলিশ খাওয়া হয়নি।

আমার ছোট ভাইয়ের বিয়েতে, ২০২২ সালে। বাবা-মায়ের মাঝখানে বসা আমার মেয়ে সুসুমু সরকার, পাশে আমার ছোট বোনের ছেলে স্বপ্ন বিশ্বাস।

মাকে ছেড়ে স্বার্থপরের মতো বিদেশ পড়ে আছি। প্রতিদিন সময় করে মাকে ফোন দিই, মাঝেমধ্যে দেওয়া হয় না, তখন মা-ই ফোন দেন। মা ফোন চালাতে পারেন না, অন্যকে বলতে হয়—বড় মনাকে একটা ফোন দেও তো। ফোনের প্রথম কথা, ‘মনা, ভালো আছিস, ভাত খেয়েছিস?’ প্রতিদিন একই কথা, কোনো ব্যত্যয় নেই।

এক বছর ধরে মায়ের শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। দূরে থেকে তাঁর জন্য কিছু করতে না পারার কষ্ট আমাকে সব সময় নাড়া দেয়। আমার ছোট ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ সর্বদা বাবা-মায়ের কাছে থাকার জন্য। কিন্তু মায়ের পাশে থাকতে আমারও খুব ইচ্ছা করে, ইচ্ছা করে মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে, ‘আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি মা, অনেক। আর আপনাদের ছেড়ে দূরে থাকার জন্য সরি।’

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আমার এই পর্যন্ত আসার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মায়ের। মায়ের ত্যাগ, ভালোবাসা আর আর্শিবাদ ছাড়া জীবনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আর আমার মায়ের মঙ্গল কামনা করে সব সময় ঈশ্বরকে বলি, হে ভগবান, তুমি আমার মাকে সুস্থ ও ভালো রাখো।

লেখক: সঞ্জয় সরকার, অধ্যাপক, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বর্তমানে প্রাণী গবেষণা সেন্টার, ইওয়াতে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানে কর্মরত